আবহাওয়া ও জলবায়ু : এদের উপাদান ও নিয়ামক | Weather and Climate

আবহাওয়া (weather): যে কোন এলাকা বা স্থানের বায়ুর তাপ, বায়ুর চাপ, বায়ু প্রবাহ, বায়ুর আর্দ্রতা, মেঘ, বৃষ্টিপাত প্রভৃতির স্বল্প সময়ের সামষ্টিক অবস্থাকে আবহাওয়া (weather) বলে। সাধারণত আবহাওয়া যে কোন এলাকার প্রতি ঘণ্টা বা কয়েক ঘণ্টা বা প্রতি দিন বা কয়েক দিনের বায়ুমণ্ডলীয় প্রাকৃতিক ঘটনার সামষ্টিক অবস্থা। তবে সাত দিনের বেশি সময়ের জন্য কোন এলাকার আবহাওয়া নির্দেশ করা হয় না।

জলবায়ু (climate): যে কোন এলাকা বা স্থানের দীর্ঘ সময়ের বা বহু বছরের আবহাওয়ার সাধারণ অবস্থাকে জলবায়ু (climate) বলে। সাধারণত জলবায়ু  যে কোন এলাকার কয়েক বছরের বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনাগুলোর সামষ্টিক অবস্থা। তবে ২০ থেকে ৩০ বছরের আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে যে কোন এলাকার জলবায়ুগত অবস্থা জানা যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন (climate change): বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ পরিবেশগত নানা প্রতিকূল কারণে কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের বায়ু তাপ, বায়ু চাপ, বায়ু প্রবাহ, বায়ু আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি আবহাওয়া-জলবায়ুর উপাদানসমূহের মৌলিক অবস্থার দীর্ঘমেয়াদে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা হ্রাস-বৃদ্ধিকে জলবায়ু পরিবর্তন (climate change) বলা হয়।


আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান
(Components of Weather and Climate)

আবহাওয়া বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনাসমূহের স্বল্পকালীন অবস্থা। জলবায়ু বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনাসমূহের দীর্ঘকালীন অবস্থা। বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনাসমূহের সময়ের ব্যাপ্তির ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করে আবহাওয়া ও জলবায়ুকে আলাদা করা হয়। তবে উভয়ের উপাদান এক এবং অভিন্ন। অর্থাৎ যেগুলো আবহাওয়ার উপাদান, আবার সেগুলোই জলবায়ুর উপাদান। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান উল্লেখপূর্বক নিম্নে আলোচনা করা হল।

ক. বায়ু তাপ (wind temperature): আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রধান উপাদান হল বায়ু তাপ। সূর্য হল বায়ু তাপের মূল উৎস। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য বায়ু তাপের পরিমাণের উপর নির্ভর করে। কোন স্থানের বায়ুর অধিক তাপমাত্রা- উষ্ণ, কম তাপমাত্রা- শীতল  এবং মধ্য তাপমাত্রা- নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও জলবায়ু প্রকাশ করে।

খ. বায়ু চাপ (wind pressure): বায়ু চাপ প্রধানত বায়ু তাপের উপর নির্ভরশীল। কোন স্থানের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সে স্থানের বায়ুতে নিম্নচাপ এবং তাপমাত্রা কমে গেলে বায়ুতে উচ্চচাপ বিরাজ করে। তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে বায়ুমণ্ডল জুড়ে ছোট বড় অসংখ্য  চাপ বলয় বিরাজ করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য সৃষ্টি করে।

গ. বায়ু প্রবাহ (wind flow): বায়ু প্রবাহ হল আবহাওয়া ও জলবায়ুর অন্যতম উপাদান। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল জুড়ে বিরাজমান ছোট বড় অসংখ্য চাপ বলয় বায়ু প্রবাহ সৃষ্টিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। বায়ু সাধারণত উচ্চচাপ  অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। নিম্নচাপ অঞ্চলের বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে উপরের দিকে  প্রবাহিত হলে উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এরূপে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বায়ুর ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় থাকার মাধ্যমে আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য সৃষ্টি করে।

ঘ. বায়ু আর্দ্রতা (wind moisture): বায়ুর আর্দ্রতা হল আবহাওয়া ও জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বায়ু তাপের প্রভাবে পুকুর, হৃদ, নদ-নদী, সাগর, মহাসাগর প্রভৃতির পানি বাষ্পে পরিণত। বায়ুতে এ বাষ্পীয় পানি বা জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিকে বায়ু আর্দ্রতা বলা হয়। সাধারণত উত্তপ্ত বায়ু কোন জলাশয়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলীয়বাষ্প আহরণ করে উর্ধ্বাকাশে উত্থিত হয়।

ঙ. অধ:ক্ষেপণ (precipitation): উত্তপ্ত বায়ু উর্ধ্বাকাশে উত্থিত হওয়ার সময় জলীয়বাষ্প ক্রমে তাপ হারিয়ে শীতল ও ঘণীভূত হতে থাকে। আরও ঘণীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। মেঘ থেকে বৃষ্টি, তুষার, শিশির প্রভৃতি রূপে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। উর্ধ্বাকাশ থেকে বৃষ্টি, তুষার, শিশির প্রভৃতি ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হওয়াকে একত্রে অধ:ক্ষেপণ বা বারিপাত বলে। অধ:ক্ষেপণ বা বারিপাত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য সৃষ্টি করে থাকে।


আবহাওয়া ও জলবায়ুর নিয়ামক
(Factors of Weather and Climate)

পৃথিবীর সর্বত্র আবহাওয়া ও জলবায়ু সব সময় একই রকম থাকে না। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রকারের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিরাজ করে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদানগুলোকে প্রভাবিত করার জন্য কতিপয় প্রাকৃতিক নিয়ামক দায়ী। আবহাওয়া ও জলবায়ুর বৈচিত্র্যতার জন্য দায়ী এ নিয়ামকসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হল।

ক. অক্ষাংশগত অবস্থান (latitude position): অক্ষাংশগত অবস্থানের কারণে আবহাওয়া ও  জলবায়ুর তারতম্য ঘটে। সূর্য খাড়া বা লম্বভাবে কিরণ দেয়ার কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলে উষ্ণ আবহাওয়া ও জলবায়ু বিরাজ করে। সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেয়ার কারণে উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে বা মেরু অঞ্চলের দিকে আবহাওয়া ও জলবায়ু শীতল হয়। ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রায় ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলেও মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে।

খ. উচ্চতাগত অবস্থান (elevation position): পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভূ-ভাগের উচ্চতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। কোন স্থানের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে। প্রতি ১ কিলোমিটার বা ১০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.8° সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এমনকি উচ্চতার তারতম্যের কারণে একই অক্ষাংশে অবস্থিত দুই অঞ্চলের তাপমাত্রার মধ্যেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

গ. ভূমির ঢাল (land slope): কোন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ু তারতম্যের জন্য ভূমির ঢালের ভূমিকা রয়েছে। ভূমির ঢাল বরাবর সুর্যালোক লম্বভাবে পতিত হলে উষ্ণ এবং তীর্যকভাবে পতিত হলে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে। সূর্যকিরণ উঁচু স্থানের ঢাল বরাবর লম্বভাবে পড়লে ভূমি উত্তপ্ত হয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। আবার ঢালের বিপরীত দিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় না।

ঘ. ভূ-খণ্ডের অবস্থান (location of the land): ভূ-খণ্ডের অবস্থান কোন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ু উপাদানগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। কোন স্থানের উঁচু পর্বতে বায়ুপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে সে স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ পর্বতের প্রতিবাত ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অনুবাত ঢালে খুব কম বৃষ্টিপাত হয়। যেমন-  মৌসুমী বায়ু প্রবাহ হিমালয় পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিবাত ঢালের দেশ বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

ঙ. সমুদ্রের অবস্থান (location of the sea): যে কোন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ু উপর সমুদ্রের অবস্থানের প্রভাব রয়েছে। সমুদ্র থেকে স্থানের দূরত্বের তারতম্যে কারণে বায়ু আর্দ্রতার বিভিন্নতা সৃষ্টি হয়। সমুদ্র নিকটবর্তী স্থানের বায়ুতে গ্রীষ্মকালে আর্দ্রতা ও শীতকালে মৃদু উষ্ণতা বিরাজ করে।

চ. সমুদ্রস্রোত (ocean currents): সমুদ্রস্রোতের কারণে উপকূলবর্তী এলাকার আবহাওয়া ও জলবায়ুতে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। শীতল সমুদ্রসোতের প্রভাবে গ্রীষ্মকালে কোন স্থানের উপকূল অঞ্চলে মৃদু শীতল বা সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করে। উষ্ণ সমুদ্রসোতের প্রভাবে শীতকালে কোন স্থানের উপকূল অঞ্চলে মৃদু উষ্ণতা বিরাজ করে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রসোত ’এল নিনো’র প্রভাবে উপকূলবর্তী দেশগুলোতে দীর্ঘ খরা বিরাজ করতে দেখা যায়।

ছ. বায়ুপ্রবাহের দিক (Wind direction):সমুদ্র থেকে প্রবাহিত জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু যে সব অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়, সে সব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। কিন্তু স্থলভাগ থেকে প্রবাহিত শুষ্ক বায়ুপ্রবাহে জলীয়বাষ্প কম থাকায় তেমন বৃষ্টিপাত  হয় না।

জ. বনভূমির অবস্থান (forest location): বনভূমি যে কোন স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ু উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। গাছের প্রস্বেদন ও বাষ্পীভবন বায়ুকে আর্দ্র করে। জলীয়বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র বায়ু ক্রমে ঘনীভূত হয়ে মেঘ এবং মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বনভূমিতে গাছপালার ঘনত্বের কারণে কোন কোন স্থানে সূর্যালোক মাটিতে পড়ে না, ফলে ঐ সকল স্থানে শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে। তাছাড়া বনভূমি ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো প্রভৃতির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে আবহাওয়া ও জলবায়ুর রূপ বদলে দিতে পারে।

ঝ. মাটির বিশেষত্ব (soil properties): কোন স্থানের মাটির বিশেষত্বের উপর আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য হতে পারে। বেলেমাটির বিশেষত্ব হল- এ মাটি যত দ্রুত উষ্ণ হয়, আবার তত দ্রুত শীতল হয়। এ তুলনায় এঁটেল বা এঁটেলযুক্ত পলিমাটি দ্রুত উষ্ণ হয় না,  উষ্ণ হলেও শীতল হতে অনেক সময় নেয়।

ঞ. বায়ুমণ্ডলের উপাদান (components of Atmosphere): বায়ুমণ্ডলের উপাদান পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সিএফসি, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি গ্যাসীয় উপাদানসহ ধুলাবালি বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখে। এসব গ্যাসীয় উপাদান বৃদ্ধি পেলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায়। ফলে বায়ুপ্রবাহ, বায়ু আর্দ্রতা, বারিপাতের মত আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদানের উপর নানা রকমের বিরূপ প্রভাব পড়ে।


লেখক: [মো. শাহীন আলম]


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *