আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন মুসলমানরাই (প্রথম পর্ব)

কলম্বাস প্রকৃতপক্ষে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অংশবিশেষ আবিষ্কার করেছিলেন – আমেরিকা তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবিষ্কার করেন নি। তা সত্ত্বেও এই দুই মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বেশ ঘটা করে দিবসটি পালন করে থাকে। কেবল তাই নয়। আমেরিকার মিসিসিপি জর্জিও, অহিও, ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে কলম্বাস নামের কয়েকটি শহরও রয়েছে। কলম্বাস সম্পর্কে আমাদের অনেক অজানা তথ্য উদঘাটন করেছেন মারিয়াম ডেভিস নামক একজন মার্কিন মহিলা। কলম্বাসের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে যেহেতু পৃথিবী গোলাকার তাই পশ্চিম দিকে জাহাজ পরিচালনা করলে মার্কোপোলো বর্ণিত প্রাচ্যের দেশগুলোতে দ্রুত এবং সরাসরি পৌঁছানো যাবে। মারিয়াম একথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, কলম্বাসের উদ্দেশ্য ছিল এটাই যে বাণিজ্য হতে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জেরুজালেম পুনরায় জয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করা। মূলত এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য কলম্বাস তার অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং জ্যোতির্বিদ্যা মানচিত্র প্রণয়ন বিদ্যা সম্পর্কে পড়াশুনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বাইবেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু ইতোমধ্যে বাইবেলে অনেকখানি বিকৃতি এসে গিয়েছিলো। তাই কলম্বাসের হিসেবে গরমিল ছিল।
প্রথমত কলম্বাসের সামনে যে প্রশ্নটি ছিল তা হচ্ছে পৃথিবীর আকার এবং এর পরিধি দৈর্ঘ্য কত? কলম্বাসের অনুমিত দৈর্ঘ্যটি ছিল প্রকৃত দৈর্ঘ্যের এক-চতুর্থাংশ। ১৪৯২ সালে প্রথম অভিযাত্রায় মানুষ ছিল মাত্র ৯০ জন। আধুনিক মানের প্রেক্ষিতে জাহাজগুলো ছিল ক্ষুদ্রাকার টেনিস কোর্টের চেয়েও ছোট এবং প্রস্থ ৩০ ফুট। এরকম শান্তামারিয়া জাহাজের ৪০ জন, পিনটা জাহাজ ২৬ জন এবং নিনা জাহাজে ছিল ২৪ জন ক্রু। জাহাজের বাহিনীতে চারজন ছিল অপরাধী। একজন ছিল শাস্তিপ্রাপ্ত হত্যাকারী। ঝগড়াকালে সে একজনকে হত্যা করেছিল। অন্য তিনজন ছিল ওই হত্যাকারীদের জেল থেকে পালানোর চেষ্টায় সাহায্যকারী।

১৪৯২ সালের ২ আগস্ট তারা জাহাজ যাত্রা শুরু করে। একই বছরের ১১ অক্টোবরে উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের সন্ধান লাভ করেন। গুনাহটি নামের একটি দ্বীপে তারা অবতরণ করেন। পরে কলম্বাস দ্বীপটির নামকরণ করেন সান সালভেদর। স্থানীয় আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের সাথে দেখা হয় তাদের। সেসব অধিবাসীদের অনেকেই কলম্বাসের লোকদের হাতে ধরা পড়ে। তাদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করেন কলম্বাস। কলম্বাসের ধারণা হয়েছিল তারা পৌঁছে গেছেন এশিয়ায়। আর ঠিক এ কারণেই তিনি দ্বীপের নামকরণ করেন ইন্ডিজ এবং এর অধিবাসীদের ইন্ডিয়ানা বলে অভিহিত করেন। এ সময় বিশেষত সোনাদানা লুট করার উদ্দেশ্যে আশেপাশের দেশগুলোতে ব্যাপক অভিযান চালানোর সময় কলম্বাসের ক্রু এর দল হিসপানিওয়ালা দ্বীপসমূহ (বর্তমানে হাইতি এবং ডোমিনিয়ন রিপাবলিকে বিভক্ত) কিউবা এবং আরো অনেক ছোট ছোট দ্বীপে ভ্রমণ করে সমুদ্রযাত্রা হতে ফেরার পথে সান্তামারিয়া ডুবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং অন্যদিকে পিনটা জাহাজের ক্যাপ্টেন মার্টিন অ্যালেঞ্জো পিনজন কলম্বাসকে পরাজিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের ইচ্ছেমত পথ অনুসরণ করেন। অবশেষে নিনা জাহাজে করে ১৪৯৩ সালের ১৫ মার্চ স্পেনের মাটিতে ফিরে আসতে সক্ষম হন কলম্বাস।

কেমন করে এই সমুদ্রযাত্রার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছিলেন কলম্বাস? জানা যায় যে কলম্বাস তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে ১৪৮৪ সালে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জনের শরণাপন্ন হলে রাজা তাকে সাহায্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিছুটা হতাশাগ্রস্থ কলম্বাস এ সময় পর্তুগালে কর্মরত তার ভাই বার্থোলিও কলম্বাসকে ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সের রাজ দরবারে প্রেরণ করেন ।কিন্তু এবারও তিনি ব্যর্থ হলেন। এরপর তিনি স্পেনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং রানী ইসাবেলার দরবারে যোগ দেন। তাদের কাছে নৌ অভিযানের জন্য আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলেন। এ সময় রাজা ও রানী তাকে আর্থিক সাহায্য অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে রানীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা তাকে এই বলে বোঝাতে থাকেন যে, অভিযান এর সকল ব্যয় নির্বাহের জন্য অন্যান্য যথেষ্ট পন্থা রয়েছে। একটি ছিল পালোস শহরকে রাজঋণ পরিশোধ হিসেবে জাহাজ দিতে বাধ্য করা। অন্যটি ছিল সার্বিক জয়ের অংশ বিশেষের জন্য ইতালিয় সহায়তা লাভ করা।

তবে এসময় কলম্বাস নতুন এক পন্থা আবিস্কার করেন। তিনি ১৪৮৬ সাল হতে রাজদরবারে অবস্থান করে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের নানাভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলেন। এ সময় গির্জার পাদ্রীদের প্ররোচিত করে তুললেন কলম্বাস। স্পেনীয়রা মনে মনে আশা করত যে একদিন রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং রানী ইসাবেলা হবেন জেরুজালেমের রাজা ও রানী। প্রথমদিকে রাজা ও রানী এ ব্যাপারে উৎসাহ না দেখালেও পরবর্তীতে জেরুজালেম হস্তগত করার ব্যাপারে তারা উৎসাহী হয়ে ওঠেন। কলম্বাস এসময় মোসাহেবীর সুযোগ লাভ করলেন। তিনি রাজা ও রানী সভাসদদের কাছে উপস্থিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবার আহ্বান জানালেন। এজন্য প্রয়োজনীয় খরচাদি তিনি অভিযান হতে এনে দেবেন বলে আশ্বাস দিলেন। কলম্বাসের প্ররোচনায় স্পেনীয়রা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে গ্রানাডা ইউরোপ হতে মুসলমানদের বিতাড়িত করলো। গ্রানাডার যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে স্পেন প্রভুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে কলম্বাস তার কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রযাত্রা হতে প্রচুর অর্থ এনে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করলেন। এবারে নিরুপায় হয়ে রাজা এবং রাণী অভিযানে সম্মতি দিলেন।

অভিযান হতে প্রত্যাবর্তনের পর কলম্বাস রাজা ও রানীর কাছে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে ইউরোপীয় শক্তির পবিত্র ঘর অর্থাৎ আল-আকসা দখল করতে পারবে। এরপর প্রায় পনের শত লোকজনসহ ১৭টি জাহাজ নিয়ে সোনার সন্ধান এবং ক্রীতদাস হিসাবে ইন্ডিয়ানদের ধরে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে ১৪৯৩ সালের ২৫ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো সমুদ্রযাত্রা পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি ডোমিনিয়ন গুয়াডেলুপ, অ্যান্টিগুয়া এবং পুয়ের্তোরিকো আবিষ্কার করেছিলেন। [ড. আহমেদ আবদুল্লাহ]


তথ্যসূত্র:
১. বিজ্ঞানে মুসলমানদের দান, ১২ খন্ড, এম আকবর আলী
২. ইন্টারন্যাশনাল কলম্বিয়ান কুইন সেপ্টেনারী অ্যালাইয়্যাস
৩. মাসিক পৃথিবী, এপ্রিল ১৯৯৮
৪. প্রথম আলো, সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ছুটির দিনে
৫. কিশোর পত্রিকা, ১৫ এপ্রিল – ১৫ মে ১৯৯৪
৬. মাসিক কওমি কণ্ঠ, জুন ২০০৪
৭. ভোরের কাগজ।


আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন মুসলমানরাই (দ্বিতীয় পর্ব)


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *