আমেরিকা এবং সমকালীন মুসলমান সমাজ (২০০৪ সাল পর্যন্ত) – পর্ব ২

পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট হয়েছেন মালিক আব্দুল হালিম। সশস্ত্রবাহিনীর অনেকেই সাম্প্রতিক সময়ে হজব্রত সম্পন্ন করেছেন। অনেকেই তাদের কীর্তির জন্য Navy Commendation Medel, Navy Achievement Medel, Joint Service Medel, National Defence Medel, Navy Recruiting Gold Medal এবং অন্যান্য সম্মানজনক পদক অর্জন করেছেন। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের পরে হীনভাবাপন্ন কতিপয় ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলীর মধ্যে ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত কোন মুসলিম নারীকে স্কার্ফ পরা দেখলে বিরূপ মন্তব্য করা হয়। ইসলামিক সেন্টার, গ্রন্থাগার, দোকান, মসজিদ, প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল-কলেজের ব্যক্তিবর্গ এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এসব সত্ত্বেও মুসলমানগণ নিয়মিত মসজিদে যেতে এবং বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকান্ডের নিজেদের সম্পৃক্ত করতে দ্বিধান্বিত হননি। বরং সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। The Council of American Islamic Relation (CAIR) এর সমীক্ষায় জানা যায় যে, বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রায় ৪০০ এর মত ঘটনা ঘটেছে ১১ সেপ্টেম্বরের পরে। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে The American Arab Anti Discrimination Committee (ADE) এর মত অনুযায়ী, মুসলমানদের উপর ৩৪% নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পাশাপাশি একথা সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ইসলাম হচ্ছে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম।

ইকোনমিস্ট পত্রিকা এ পর্যায়ে মন্তব্য করেছে যে, ইসলাম হচ্ছে গোটা বিশ্বের fastest growing religion। কৌতূহলপূর্ণ আমেরিকানদের মতে কোরআন এমনকি ধর্মগ্রন্থ, যা বিশ্বের ১২০ কোটি মানুষের কাছে আজও গ্রহণযোগ্য ও অর্থপূর্ণ। কোরআনের এই গ্রহণযোগ্যতা এবং অর্থপূর্ণতা দিয়ে বিশিষ্ট কোরআন বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং মার্কিন অধ্যাপক একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন, যার নাম অ্যাপ্রচিং কোরআন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গ্রন্থটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ও অমুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অধ্যাপক মিশেল সেলস ১৯৯৯ সালে বইটি বাজারে ছাড়েন। বইটির পূর্ণনাম অ্যাপ্রচিং দা কোরান-দ্য আরলী রেভ্যুলেশন। ভদ্রলোক দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পেনসিলভেনিয়ার কলেজের কম্পারেটিভ রিলিজিয়ান এর অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, তিনি যেন তেন গবেষক নন। তিনি তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ আমেরিকান একাডেমী পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অধ্যাপক সেলস-এর  গ্রন্থ সংখ্যা ৬০ এর উপরে। আরবি ভাষায় তার দক্ষতা পৃথিবীর অনেক খ্যাতনামা আরবি বিশারদদের চাইতে অনেক বেশি। তিনি তার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। সেলস-এর বহুল আলোচিত অ্যাপ্রচিং দ্যা কোরআন গ্রন্থটি ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনার জন্য পাঠ্যসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাপক সেলস তার গ্রন্থটিতে মোট ৩৫টি সূরা অনুবাদ করেছেন, যা নবীজির কাছে প্রথমদিকে নাযিল হয়েছিল। এই বইটি মার্কিন সাম্রাজ্যের ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা গ্রন্থ বিশেষ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন সাংবাদিক এ্যালান কুপারম্যান বলেন বর্তমানে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমেরিকান সমাজে যে কোনো সময়ের চাইতে বেশী প্রবল।

মার্কিন প্রকাশকগণ বলেন, ইসলাম বিষয়ক পুস্তকাদি এখন গোটা যুক্তরাষ্ট্রে বাচ্চাদের কার্টুন কমিক্স বইয়ের মতই খুব ভালো চলছে। ইসলাম সম্পর্কে পুরনো অনেক গ্রন্থ আজকাল পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে। পশ্চিমা সমাজে কোরআন ও ইসলাম নিয়ে নতুন উপলব্ধি আশার সঞ্চার করেছে। আমেরিকার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে মুসলিম চলচ্চিত্র, ইফেক্ট এবং মুসলমানের পারিবারিক এবং ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে প্রতিবেদন দেখানো হয় মার্কিন পত্রপত্রিকা গুলোতে কমবেশি মুসলমানদের জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়। আমেরিকায় তিন হাজারেরও বেশি দৈনিক পত্রিকা রয়েছে। অনেকগুলো পত্রিকা ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে চিত্র তুলে ধরে। তাছাড়া আমেরিকায় মুসলমানদের বেশ কিছু নিজস্ব সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা রয়েছে। এসব পত্রিকায় মুসলমানদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটি কথা না বললেই নয়। ভিন্ন মতাবলম্বীরা ইসলামের নিদর্শন ও আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে খুব কমই জ্ঞান রাখে। আর তাই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলোতে ও মিডিয়াগুলোতে অনেক সময় ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল তথ্য তুলে ধরতে দেখা যায়, যা আমাদের মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। আবার অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনে মুসলমানদেরকে হেয় করে দেখানো হয়ে থাকে। বর্তমান যুগ ইন্টারনেটের যুগ। আমেরিকান মুসলমানরা তাদের পত্রপত্রিকাগুলো ইন্টারনেটে প্রচার করছে। যেসব পাঠক ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তারা সহজেই মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান বা ধারণা লাভ করতে পারেন। যেমন- কিউএই ইসলাম, islam.com, মুসলিম ডট কম ,ইয়ুথ muslim.com। এভাবে মার্কিন মুসলমানরা ধীরে ধীরে নিজেদের ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা করে নিচ্ছে। [ড.আহমেদ আবদুল্লাহ]


তথ্যসূত্র:
১. দৈনিক ইত্তেফাক, ১ মার্চ ২০০৪, আমেরিকায ইসলাম ও মুসলমান, আবু তালিব বিন মফিজ
২. দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ জুন ২০০২, আমেরিকা ও ইউরোপে ইসলাম, ফরহাদ আহমেদ
৩. দৈনিক যুগান্তর, ১১ অক্টোবর ২০০২, মার্কিন মিডিয়ায় ইসলাম, শেখ গোলাম মোস্তফা
৪. দৈনিক যুগান্তর, ২৭ ডিসেম্বর ২০০২, আমেরিকায় কুরআন ও ইসলামের সম্ভাবনা, রবিউল আলম
৫. দৈনিক যুগান্তর, ১ জুলাই ২০০২, সত্যের সন্ধানে আমেরিকা, শাহেদ আহমেদ চৌধুরী
৬. দৈনিক দিনকাল, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ধর্ম মূলধারায় প্রবেশ করছে।


আমেরিকা এবং সমকালীন মুসলমান সমাজ (২০০৪ সাল পর্যন্ত) – পর্ব ১


 

Add a Comment

Your email address will not be published.