উৎপাদন ও সংগঠন: মালিক-উৎপাদক-সংগঠক

একটি দ্রব্য উৎপাদন করতে বিভিন্ন উপকরণের প্রয়ােজন হয়। উপকরণ দিয়ে দ্রব্য উৎপাদন এবং তা ভােগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ বা উপযােগ সৃষ্টি করা হয়। দ্রব্যের উৎপাদনের কাজটি করে একটি সংগঠন। উৎপাদন করতে উপকরণ লাগে, উৎপাদন করার একটি পরিকল্পনা করতে হয় এবং উৎপাদন করার সময় বিভিন্ন জন বিভিন্ন কাজ করে থাকে। যােগ্যতা অনুযায়ী এ কাজগুলাে বিভিন্ন জনের মধ্যে বণ্টন করতে হয় এবং উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রির জন্য বাজারে নিতে হয়। আর এ কাজগুলাে করে থাকে একটি সংগঠন। যে ব্যক্তি সংগঠনের মূল দায়িত্ব পালন করেন, তাকে বলা হয় উদ্যোক্তা বা সত্ত্বাধিকারী বা মালিক। সংগঠন বা উদ্যোক্তা দক্ষ না হলে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না । নিম্নে উৎপাদন, সংগঠন, মালিক, উৎপাদক ও সংগঠক সম্পর্কে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

উৎপাদন [Production]: সাধারণত উপকরণ বা প্রাথমিক দ্রব্য ব্যবহার করে নতুন কোন দ্রব্য সৃষ্টি করাকে উৎপাদন বলে। আবার উৎপাদিত দ্রব্য ভােগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ বা উপযােগ সৃষ্টি না হলে উৎপাদন বােঝায় না। তাই কোন পণ্য বা দ্রব্যের উপযােগ সৃষ্টি করাকেও উৎপাদন বলে। যেমন- আটা, পানি, লবণ, বেলুন প্রভৃতি ব্যবহার করে রুটি তৈরি করা হয়। রুটি হল একটি উৎপাদিত নতুন দ্রব্য। আর রুটি খেয়ে ক্ষুধা নিবারিত হয় বা তৃপ্তি পাওয়া যায়। সুতরাং, রুটি তৈরি করে উপযােগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

সংগঠন [organization]: সাধারণত কোন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য দুই বা ততোধিক ব্যক্তির সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার একটি প্রণালীকে সংগঠন বলা হয়। একটি সংগঠন যে কোন কাজ বাস্তবায়ন বা দ্রব্য উৎপাদনের যাবতীয় কাজ করে। যেমন- সংগঠনের বা সংগঠন পরিচালক উদ্যোক্তার মাধ্যমে উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন কাজের পরিকল্পনা, উৎপাদনের সময় বিভিন্ন জনের মধ্যে কাজ বন্টন এবং দ্রব্য বাজারজাতকরণসহ উৎপাদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়। আবার বলা যায় যে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে উৎপাদনমুখী কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করাই সংগঠন।

উদ্যোক্তা [Entrepreneur]: উদ্যোক্তা সাধারণত এমন একজন ব্যক্তি, যিনি এমন কোন দ্রব্য উৎপাদন বা সেবা তৈরি করেন; যে দ্রব্য উৎপাদন বা সেবা তৈরি করার কথা আগে কেউ কখনও ভাবেননি। পুরাতন কোন ব্যবসাকে নতুন রূপে শুরু করাকেও ব্যবসায়িক উদ্যোগ মনে করা হয়। আসলে নতুন কোন দ্রব্য উৎপাদন বা সেবা তৈরি করাকেই মূলত উদ্যোগ বলে। আর যিনি এ উদ্যোগটি গ্রহণ করেন তিনিই হলেন উদ্যোক্তা।একজন উদ্যোক্তা এবং একজন ব্যবসায়ীর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ব্যবসায়ী বাজারে একটি দ্রব্য বা সেবা বিক্রি করেন। তবে একজন উদ্যোক্তা সে দ্রব্য বা সেবাটি উদ্ভাবন বা তৈরি করেন এবং একই সাথে তা বাজারে বিপণন করেও থাকেন। এ হিসেবে যে কোন উদ্যোক্তাই ব্যবসায়ী, কিন্তু যে কোন ব্যবসায়ীই উদ্যোক্তা নয়। একজন ব্যবসায়ী তখনই উদ্যোক্তা হিসেবে গণ্য হন; যখন তিনি বাজারে যে দ্রব্যটি বিক্রি করেন, যদি সেটি তিনি নিজেই উদ্ভাবন বা উৎপাদন করেন।

উৎপাদক [Producer]: যে ব্যক্তি উপকরণ বা প্রাথমিক দ্রব্য ব্যবহার করে নতুন কোন দ্রব্য উৎপাদন করে, সে ব্যক্তিকে সাধারণত উৎপাদক বলে। মূলতঃ উৎপাদিত দ্রব্য ভােগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ বা উপযােগ সৃষ্টি হয়। তাই, বলা যায় যে ব্যক্তি দ্রব্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে উপযােগ সৃষ্টি করান, সে ব্যক্তিকে উৎপাদক বলে।

সংগঠক [Organizer]: সাধারণত যে ব্যক্তি কোন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য দুই বা ততোধিক ব্যক্তির সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার জন্য গড়ে তোলা সংগঠনকে নেতৃত্ব দেয় তাকে সংগঠক বলা হয়। একজন সংগঠক একটি সংগঠনের যে কোন কাজ বাস্তবায়ন বা দ্রব্য উৎপাদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেন। যেমন- উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন কাজের পরিকল্পনা, উৎপাদনের সময় বিভিন্ন জনের মধ্যে কাজ বন্টন এবং দ্রব্য বাজারজাতকরণসহ উৎপাদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার কাজটি করেন একজন দক্ষ সংগঠক।

মালিক-উৎপাদক-সংগঠক [Owner-Producer-Organizer]: সংগঠনে সব কিছু দক্ষতার সাথে তদারকি করতে না পারলে নির্দিষ্ট পরিমাণ উপকরণ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে উৎপাদন পাওয়া সম্ভব হয় না। একটি সংগঠনে যে কোন উৎপাদন কাজে একই ব্যক্তি একই সাথে সংগঠক এবং উৎপাদক হতে পারেন। যেমন- যে কৃষক নিজে নিজের জমিতে ফসল উৎপাদন করেন, তিনি একই সাথে একজন উৎপাদক এবং সংগঠক। তবে যে ব্যক্তি কারখানার মালিক ম্যানেজার হিসেবে শ্রমিকদের দিয়ে কারখানা পরিচালনা করেন, তিনি সংগঠক হলেও কিন্তু উৎপাদক নন। আবার, যে কারখানার মালিক ম্যানেজার রেখে শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন কাজ করান; তিনি সংগঠকও নন এবং উৎপাদকও নন, বরং তিনি কেবলই একজন মালিক। আবার যে মালিক নিজেই নিজের কারখানায় উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং অন্য উৎপাদকদের তত্ত্বাবধান করেন, কেবল তিনিই হলেন একই সাথে মালিক-উৎপাদক-সংগঠক। [সংকলিত]

Add a Comment

Your email address will not be published.