ঐতিহ্য অন্বেষণে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন: এ খনন কাজের কতিপয় ধাপ ও প্রক্রিয়া

প্রত্নঐতিহ্য অন্বেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হল প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। আমরা সকলেই জানি যে, খনন মানে হল মাটি খোঁড়ার কাজ। শত কিংবা হাজার বছর আগের পুরাতন স্থাবর ও অস্থাবর বস্তু অনুসন্ধানের জন্য মাটি খোঁড়ার কাজ বা খনন করা হয়ে থাকে। মাটি খোঁড়ার এ কাজটি প্রত্নতত্ত্বে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে কতিপয় ধাপে ও প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কিংবা অনুসন্ধানের মাধ্যমে কোন একটি স্থান, বিশেষ করে মাটির উঁচু বা অনুচ্চ ঢিবির মধ্যে ঐতিহাসিক বস্তু থাকার সম্ভাবনা নিশ্চিত হলেই প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ শুরু করা হয়। এ প্রবন্ধটিতে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ সম্পন্নকরণের জন্য অনুসৃত পদ্ধতি, কাজের কতিপয় ধাপ ও প্রক্রিয়া তুলে ধরা হল। বর্ণনার সুবিধার্থে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনটি ধাপে বিভক্ত করে নিম্নে তুলে ধরা হল:

১. খননপূর্ব প্রস্তুতিমূলক কাজ (preparatory works before excavation)
২. খননকালীন কাজ (Works during excavation) ও
৩. খননপরবর্তী কাজ (works after excavation)

১. খননপূর্ব প্রস্তুতিমূলক কাজ: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরুর পূর্বে যেসব কাজ করার প্রয়োজন হয়, সেগুলো হল:

১.১. সরকারী অনুমোদন: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান  প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনার জন্য সরকারী অনুমোদন নিতে হয়।
১.২. ভূমি মালিকের অনুমোদন কিংবা ভূমির মালিকানা গ্রহণ: খননের জন্য নির্ধারিত ভূমিটি যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়, তাহলে ভূমি মালিকের অনুমোদন কিংবা অর্থের বিনিময়ে মালিকানা গ্রহণ করে ঐ ভূমিটিতে খনন কাজ পরিচালনা করতে হয়।
১.৩. প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনার জন্য ছোট-বড় কোদাল, বেল্চা, কর্ণিক, ঝুঁড়ি, কাগজ, গ্রাফশীড, কলম, লেবেল মেশিন, স্কেল, কম্পিউটার, পরিমাপের ফিতা, আলপিন, সুতা, রড, ব্যাগ, গ্রিবসিল ব্যাগ, প্লাস্টিকের কাগজ, ওলন, ফিল্ড টেবিল, জিপিএস মেশিন, ক্যামেরা, সয়েল কালার চার্ট, কম্পাস প্রভৃতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হয়।

১.৪. জনবল নিয়োগ: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কিংবা অন্য কোন অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনার জন্য কয়েক সদস্যবিশিষ্ট একটি দক্ষ জনবল নিয়োজিত করে। এছাড়া খনন এলাকা থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে আরো প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবলও নিয়োগ করা হয়।
১.৫. প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান: খনন কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক খনন দলটিকে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেয়া হয়। এ অর্থ দিয়ে খনন চলাকালীন প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে থাকে।
১.৬. সময় নির্ধারণ: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ সম্পন্ন করার জন্য উপযুক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। তবে শীতকাল হল খনন কাজ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত খনন কাজ পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ধরা হয়। এছাড়া খনন কাজটি কতদিন চলবে তার জন্য একটি সময় বাজেট খননের পূর্বে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
১.৭. খনন ভূমির উপর প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও বিন্যাস: খননের জন্য ভূমি নির্ধারণ, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারিত ভূমির খননখাদের (excavation trench) বিন্যাস (layout), প্রত্নবস্তু রাখার চত্বর প্রস্তুত প্রভৃতি কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিমাপ করে যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়।
১.৮. আবাসন ও প্রত্নবস্তু ব্যবস্থাপনার জন্য স্থান নির্বাচন: প্রত্নতাত্ত্বিক খননের জন্য নিয়োজিত সদস্যগণের প্রয়োজনীয় আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে আবাসনটি খনন ভূমির নিকটে নির্বাচন করা হয়। এছাড়া প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলো পরিষ্কারকরণ এবং প্রয়োজনীয় তালিকাকরণের কাজ সম্পন্ন করে নিরাপদে রাখার জন্য একটি স্থান নির্বাচন করা হয়।

২. খননকালীন কাজ: প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালীন যেসব কাজ করার প্রয়োজন হয়, সেগুলো হল:

২.১. মাটি খোঁড়ার কাজ: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন দলটি প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে খনন কাজ পরিচালনা করে। এক বা একাধিক মাঠ পরিচালকের অধীন কিছু সংখ্যক শ্রমিক মাটি খোঁড়ার কাজ করে। মাটি খোঁড়ার সময় খুব সাবধানতা অবলম্বন করে খননের জন্য নির্ধারিত খাদে (trench) কোদালসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। যাতে করে কোন প্রত্নবস্তু নষ্ট না হয় এবং খনন খাদের মাটির স্তরায়ন সম্পর্কিত কোন তথ্য নথিভুক্তকরণ থেকে বাদ না পড়ে।

২.২. ডায়েরী ও নির্দিষ্ট ফরমে তথ্য লিপিবদ্ধকরণ: খনন চলাকালীন মাঠ পরিচালক খননখাদে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু ও মাটির স্তর সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ডায়েরী ও নির্দিষ্ট ফরমে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। খনন খাদ ও প্রাপ্তবস্তুর স্তরায়ন, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ও প্রতিবেদন উপস্থাপনের জন্য মাঠ পরিচালক আগে থেকে একটি স্বীকৃত পদ্ধতি অবলম্বন করে খনন কাজ শুরু করেন। এ স্বীকৃত পদ্ধতির ভিত্তিতে মাঠ পরিচালক তার খননখাদের প্রাপ্ত নমুনা, প্রত্নবস্তু ও স্তর সম্পর্কিত তথ্য নিজের ডায়েরী ও ফরমে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনায় বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ Sir Robert Eric Mortimer Wheeler এবং Dr. Edward C. Harris কর্তৃক স্বীকৃত খনন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
২.৩. আলোকচিত্র ধারণ: খনন কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিদিন খনন ভূমি, খনন খাদ (trench), প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু, মাটির স্তর, খনন কাজ প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ আলোকচিত্রে ধারণ করা হয়। এক বা একাধিক আলোকচিত্রকর সার্বক্ষণিক আলোকচিত্র ধারণের কাজ করে থাকেন। এছাড়া মাঝে মাঝে খনন সংশ্লিষ্ট কাজের ভিডিওচিত্রও ধারণ করা হয়।

২.৪. প্রয়োজনীয় নকশা অংকন: প্রত্নতাত্ত্বিক খননখাদের(trench) বিন্যাস, খননখাদে প্রাপ্ত স্থাবর প্রত্নবস্তু যেমন- পাকা দেয়াল, মেঝে প্রভৃতি ও খননখাদের পার্শ্বছেদের(section) স্তরায়নের প্রয়োজনীয় নকশা অংকন করা হয়। এছাড়া ছোট-বড় অস্থাবর প্রত্নবস্তু যেমন- মৃৎপাত্র, সিরামিকের পাত্র, ধাতব বস্তু প্রভৃতির নকশা অংকন করা হয়ে থাকে। এক বা একাধিক নকশাংকনকারী প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলাকালে প্রয়োজনীয় নকশা অংকনের কাজ সম্পন্ন করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উন্মোচিত ইটের গাঁথুনী, ভরত ভায়না, কেশবপুর, যশোর।

২.৫. নমুনা সংগ্রহ: খনন চলাকালীন খননখাদের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা, যেমন- ছাই-কয়লা, মাটি প্রভৃতি সংগ্রহ করা হয়। মাঠ পরিচালক এ নমুনাসমূহ ফয়েল পেপারে (foil paper) মুরিয়ে এবং গ্রীপস সিল ব্যাগে আবদ্ধ করে প্রয়োজনীয় নম্বর ও তথ্যের লেবেল দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকেন।
২.৬. প্রত্নবস্তু সংগ্রহ: খননখাদের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু যেমন- মৃৎপাত্র, সিরামিকের পাত্র, ধাতব বস্তু প্রভৃতি সংগ্রহ করা হয়। এসব বস্তু সংগ্রহের সময় প্রতিটি বস্তুর জন্য আলাদা আলাদা নম্বর, স্তর নম্বর, নাম, তারিখ প্রভৃতি যুক্ত টেগ (tag) দেয়া হয়। সংগৃহীত প্রত্নবস্তুগুলোর পরিচর্যার জন্য সাবধানতার সাথে প্রত্নবস্তু রাখার চত্বরে প্রেরণ করা হয়।

২.৭. প্রত্নবস্তু পরিষ্কারকরণ: প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলো প্রত্নবস্তুর চত্বরে সাবধানতার সাথে আস্তে আস্তে পানি দিয়ে ধৌত করা হয়। এরপর ছায়ার নিচে বাতাসে শুকিয়ে প্রত্নবস্তুগুলো নথিভুক্তকরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
২.৮. প্রত্নবস্তুর তালিকাকরণ: এ পর্যায়ে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলো একটি নির্দিষ্ট রেজিষ্টার খাতায় তালিকা আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়। এ সময় প্রত্নবস্তুগুলোর সংযোজন নম্বর, নাম, সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও আলোকচিত্র ধারণ করে রাখা হয়। এছাড়া প্রত্নবস্তুর উপরে সংযোজন নম্বরটির লেবেল ছোট করে লেখা হয়। প্রত্নবস্তুর উপর লেবেল লেখার জন্য সাধারণত একজন মার্কসম্যান সহযোগিতা করে থাকেন।
২.৯. পরিমাপকরণ: খনন ভূমির পরিমাপ, খননখাদের পরিমাপ, প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর পরিমাপ, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে খনন ভূমি, খননখাদ ও স্তরের (layer) উচ্চতা প্রভৃতি খনন চলাকালীন যথাযথভাবে নেয়া হয়।

৩. খননপরবর্তী কাজ: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরবর্তী যেসব কাজ করার প্রয়োজন হয়, সেগুলো হল:

৩.১. লিপিবদ্ধ তথ্য, আলোকচিত্র ও নকশা পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা: ডায়েরী ও ফরমে লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত, ক্যামেরায় ধৃত আলোকচিত্র এবং খনন খাদ, পার্শ্বছেদ ও স্তরের নকশা প্রভৃতি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এগুলো পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ সময় প্রতিটি কাজের জন্য দায়িত্বরত সদস্যগণ উপস্থিত থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজগুলো নিজেরাই সম্পন্ন করেন।
৩.২. প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু ও প্রত্নবস্তুর তালিকা পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা: প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর তালিকাকরণ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু ও প্রত্নবস্তুর তালিকা পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
৩.৩. খননখাদে প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষের প্রয়োজনীয় সংস্কার: প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেট প্রাপ্তি সাপেক্ষে খননখাদে প্রাপ্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষসমূহের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ সংস্কার কাজ প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
৩.৪. সংস্কার করা না হলে খননখাদ ভরাটকরণ: প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেট না থাকলে খননখাদসমূহ মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়া হয়। যাতে করে মানুষ বা অন্যকোন প্রাণী প্রাপ্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষসমূহ নষ্ট করতে না পারে। তবে ভরাটের আগে খননখাদের প্রয়োজনীয় নকশা অংকন ও আলোকচিত্র ধারণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
৩.৫. প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর: প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্তর কর্তৃক পরিচালিত খননে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু অধিদপ্তরের নির্ধারিত স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শেষে খনন দলটি তাদের প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু অধিদপ্তরের নির্ধারিত কাস্টোডিয়ান/পরিচালকের কাজে তালিকাসহ হস্তান্তর করে থাকে। অনুমোদিত অন্যকোন  প্রতিষ্ঠানকেও খননকাজ শেষে এদের প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু সরকারী প্রতিষ্ঠান প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করতে হয়।
৩.৬. প্রতিবেদন উপস্থাপন: প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে প্রয়োজনীয় নকশা ও আলোকচিত্রসহ একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এ প্রতিবেদনটির মুদ্রিত কপি ও সফটকপি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে উপস্থাপন করা হয়।

Click for English Version


[লেখক: মো. শাহীন আলম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।


[Keywords: Archaeological Excavation Method and Procedure, Archaeology, Bangladesh, Excavation in Bangladesh, Excavation and Exploration]


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *