কবি পরিচিতি: কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্য জগতের এক অনন্য শিল্পী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে (বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা- কাজী ফকির আহমদ ও মাতা- জাহেদা খাতুন। তাঁর বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাযারের খাদেম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১৩১৫) কবি নজরুল মাত্র ৮ বছর বয়সে তাঁর পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুর পরে কবির পরিবার চরম দারিদ্র্যে পতিত হয়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১৩১৬) নজরুল ইসলাম গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পাস করেন এবং সেখানে তিনি ১ বছর শিক্ষকতা করেন। তিনি মাত্র বার বছর বয়সে লেটোর দলে যোগদান করেন এবং এ দলের জন্য পালাগান রচনা করেন। মূলত ঐ সময় থেকেই নজরুল সৃষ্টিশীল সত্ত্বার অধিকারী হয়ে উঠেন।

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে তিনি ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন এবং পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি হাবিলদার পদে উন্নীত হন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দেয়া হয়। আর এ কারণে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হলে তাঁর কবিখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’র খ্যাতি লাভ করেন। কবি নজরুল ‘লাঙ্গল’, নবযুগ’ ও ধূমকেতু’-সহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে প্রথম কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই প্রমীলা দেবীর সাথে কবি পরিচিত হয়ে প্রথমে প্রণয়ে ও পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। অগ্নি-বীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্ধু-হিন্দোল, চক্রবাক, সন্ধ্যা ও প্রলয়-শিখা তারঁ রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও তিনি উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন। সংগীতেরও স্রষ্টা কবি নজরুল অংসখ্য দেশাত্মবোধক গান, শ্যামাসংগীত ও গজল রচনা করেন।

১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধীতে ভূষিত করেন। তিনি ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ ও ‘একুশে পদক’সহ অসংখ্য সম্মাননায় ও পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর বিশেষ উদ্যোগে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি পেয়ে কবি নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ে এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কবিকে সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে কবি নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এ একই বছরে কবির স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করে। অসুস্থ্যতার কারণে কবির জীবনের শেষ দিনগুলো ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) কাটে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ২৯ আগস্ট  (বাংলা ১২ ভাদ্র, ১৩৮৩) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় । [সংকলিত]

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *