কুমিল্লার শালবন বিহার: বাংলার বৌদ্ধ স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ

শালবন বিহার

 অবস্থান | Location

শালবন বিহার কুমিল্লা জেলাধীন সদর দক্ষিণ উপজেলার শালমানপুর নামক গ্রামে (বর্তমানে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ২৪ নং ওয়ার্ডে) অবস্থিত। ময়নামতি জাদুঘর সংলগ্ন প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মীয় সাংস্কৃতিক নিদর্শনের ধ্বংসাবশেষ এ শালবন বিহারটির ভূ-স্থানাঙ্ক (geo-coordinate) হল 23°25’34.0″N 91°08’15.8″E (23.426120, 91.137731)।

স্থাপত‌্যিক বিবরণ | Architectural Description

‘শালবন বিহার’ নামক প্রত্নস্থলটিতে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। বর্গাকার এ বিহারটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১৬৮ মিটার। বিহারটির চারটি বাহুতে সর্বমোট ১১৫টি ভিক্ষু কক্ষ (সন্ন্যাস কক্ষ) এবং কেন্দ্রস্থলে মূল মন্দির অবস্থিত। কেন্দ্রের মূল মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট আরও বেশ কিছু সংখ্যক মন্দির এবং স্তুপের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এ বিহারের উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে উন্মোচিত বিশালাকার তোরণের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।

বিহারের কক্ষগুলোর অভ্যন্তরে ২টি বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য খোঁজে পাওয়া যায়। এগুলো হল – অলংকৃত ইটের পাদস্তম্ভসহ কক্ষে পরিকল্পিতভাবে আগুন জ্বালানোর উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা। বিহারটির উল্লেখযোগ্য অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হল – দরবার আঙ্গিনার সোপান, কোণের কক্ষগুলিতে সিঁড়ি, কেন্দ্রীয় কক্ষগুলোর প্রতিটি কক্ষে দেবদেবীর মূর্তি এবং কুলুঙ্গি।১,২

শালবন বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরটি প্রকৃতপক্ষে কোন একক স্থাপত্যিক কাঠামো নয়। এখানে বিভিন্ন সময়ের ৬টি নির্মাণ কাঠামোর অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়। এ কাঠামোগুলো বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনায় একই স্থানে একের পর এক নির্মাণ করা হয়েছে। পরবর্তী দুই কালপর্যায়ে (৪র্থ এবং ৫ম কালপর্যায়ে) শালবন বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এ কালপর্যায়ে মন্দিরটি ক্রুশাকৃতির পরিবর্তে আয়তাকার হয়ে উঠে। এভাবে পুরোপুরি খোলা, সুপরিসর ও কার্যোপযোগী হয়ে উঠায় গোটা মন্দির কাঠামোটি প্রায় হিন্দু মন্দির স্থাপত্যে রূপ পরিগ্রহ করে।১,২

বৌদ্ধ পীঠস্থান বা মন্দিরের নিচতলার দেয়ালে পোড়ামাটির ইটের অলঙ্করণ একটা ঐতিহ্যগত রীতি। পীঠস্থানগুলোর প্রধান আকর্ষণ বহির্দেয়াল থেকে অভ্যন্তরের প্রকোষ্ঠ – যেখানে মূর্তি, ভাস্কর্য ও স্থাপত্য অলঙ্করণ রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে শালবন বিহারে আরও বহু প্রত্ন-স্থাপত্যিক কাঠামোর অস্তিত্ব উন্মোচিত হয়েছে। এসব প্রত্ন-স্থাপত্যিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে ইঁদারা, পাকা মেঝে, ভোজনালয়, ছোট স্তম্ভ, পূজার স্তুপ এবং মন্দির। এগুলোর ভিত ও বুনিয়াদ খুবই সুন্দর।১,২

 

এছাড়া বিহারের বাহিরে তারা মন্দির ও স্তুপসহ আরও প্রত্ন-স্থাপত্যিক কাঠামোর অস্তিত্ব উন্মোচিত হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালে এ প্রত্নস্থলে বিভিন্ন ধরনের পোড়ামাটির চিত্রফলক, মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির গুটিকা, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি, অলংকৃত ইট, তাম্রলিপি, সিলমোহর, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নবস্তুর সন্ধ্যান পাওয়া যায়।১,২

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | Historical Background

শালবন বিহারের প্রকৃত নাম ‘শ্রী ভবদেব মহাবিহার’। সপ্তম থেকে  অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত দেব বংশের শাসনকালে ৪র্থ রাজা শ্রী ভবদেব কর্তৃক এ মহাবিহারটি নির্মিত হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে শালবন বিহারে ৪টি স্তরে নির্মাণ, পুনর্নিমাণ এবং সংস্কার-মেরামত পর্যায়ের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কেন্দ্রীয় মন্দিরটি হল ৩য় কালপর্যায়ে (৭ম – ৮ম শতাব্দীর) নির্মিত প্রত্ন-স্থাপত্যিক কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ। তবে ২য় ও ১ম কালপর্যায়ের (৭ম শতাব্দীর আগের) প্রত্ন-স্থাপত্যিক কাঠামোর কোন ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানা যায়। এখানে, ৩য় কালপর্যায়ের উপরে ৪র্থ ও ৫ম কালপর্যায়ে (৯ম – ১০ম শতাব্দীর) মেঝে (floor) এবং প্রবেশপথের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। মূলত: শালবন বিহার হল ৭ম – ৮ম শতাব্দীতে নির্মিত বাংলার বৌদ্ধ মন্দির ও বিহার স্থাপত্যের এক পরিপূর্ণ বিকাশের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।১,২

‘‘খ্রিস্টীয় ৭ম শতকের মধ্যভাগে বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক উয়ান চোয়াঙ সমতটে আসেন এবং এ দেশকে কামরুপের (আসাম) দক্ষিণে “সমুদ্র তীরে অবস্থিত নিচু ও স্যাঁতস্যাঁতে দেশ” বলে বর্ণনা করেন। এখানে তিনি ত্রিশটিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার দেখেন এবং বিহারগুলোতে বৌদ্ধ মহাযান মতাবলম্বী ২০০০ ভিক্ষু ছিল বলে উল্লেখ করেন। সমগ্র ত্রিপুরা ও কুমিল্লা জেলা এবং নোয়াখালী ও ঢাকা জেলার কিছু অংশ নিয়ে প্রাচীন সমতট রাজ্য গঠিত ছিল বলে প্রাপ্ত তাম্রশাসনগুলো থেকে জানা যায়। তাম্রশাসনগুলো থেকে আরও জানা যায় যে, এ অঞ্চলে পর্যাক্রমে খড়গ বংশ, দেব বংশ, চন্দ্র বংশ, ও বর্মণদের রাজত্বকালে ময়নামতি অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল।’’

The 7th July 1945, Simla (under Ancient Monuments Preservation Act 1904) অনুসারে শালবন বিহারটি Shalban Raja’s Palace নামে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়। এটি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি, যা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এছাড়া ১৯৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি “The Lalmai-Mainamati Group of monuments” শিরোনামে ইউনেস্কোর (UNESCO) সম্ভাব্য বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় (tentative lists) অন্তর্ভূক্ত অন্যতম প্রত্নস্থান হল শালবন বিহার।৪,৫

লেখক: মো. শাহীন আলম  

তথ্যসূত্র :
১. রশীদ, এম হারুনুর, শালবন বিহার ;
২. শালবন বিহার (ফোল্ডার), প্রকাশ: জুন ২০২২, আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ, কুমিল্লা; 
৩. প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ২০১০-২০১১, শালবন বিহার, কুমিল্লা, প্রত্নচর্চা-৬, জুন ২০১৫ পৃষ্ঠা ২১ – ২৬;
৪. The Lalmai-Mainamati Group of monuments;
৫. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *