কোবারের মহীখাত (Geosynclines ) মতবাদ

পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থানে ভাঁজবিশিষ্ট ভূ-প্রকৃতি দেখা যায়। ভাঁজবিশিষ্ট ভূ-প্রকৃতির উঁচু অংশকে ঊর্ধভঙ্গ (anticline) এবং নিচু অংশকে অধোভঙ্গ (syncline) বলা হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্ট অধোভঙ্গকে ভূ-অধোভাজ বা ব্যাপ্ত অধোভঙ্গ বা মহীখাত (geosyncline) বলা হয়। সুর্যের তাপ, বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, স্রোতপ্রবাহ, হিমবাহ, মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে মহাদেশীয় ভূ-ভাগ ক্রমশ: ক্ষয়প্রাপ্ত এবং বিধৌত হয়ে নিচু অংশগুলোতে এসে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত পদার্থের চাপে অধোভঙ্গগুলোর নিম্নাংশ আরও নিচু হয়, ফলে অধিকতর পদার্থ সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

মহীখাত (geosyncline) ধারণার ভিত্তি: প্রথমে Hall, Dane এবং পরবর্তীতে Hauge এর অধোভঙ্গ (geosyncline) ধারণার উপর ভিত্তি করে অস্ট্রীয় ভূ-তাত্ত্বিক এল. কোবার (L. Kober) পর্বত গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেন। কোবার মূলতঃ সংকোচন প্রকল্পের প্রবক্তা ছিলেন। জার্মান ভাষায় ‘Der Bau der Erde নামক পুস্তকে তিনি তাঁর ধারণা প্রকাশ করেন। কোবারের মতানুসারে, পৃথিবীর ইতিহাসে ‘তারকা’ সময় থেকে কম বেশি অবিরতভাবে সঙ্কোচন ক্রিয়া চলে আসছে। তিনি মনে করেন যে, প্রাচীন দৃঢ় শীল্ড (shield) বা মালভূমিগুলোর সাথে অধিকতর নমনীয় মণ্ডলে পর্বতগঠন (orogene) গুলোর সম্পর্ক আছে। তিনি আরও মনে করেন যে, অতি প্রাচীন কাল থেকে অবস্থিত (১) বাল্টিক, (২) সাইবেরীয়, (৩) চৈনিক, (৪) ইন্দোচীন, (৫) ভারতীয়, (৬) আফ্রিকান (৭) অস্ট্রেলীয়, (৮) ব্রাজিলীয় (৯) কানাডীয় এবং (১০) এন্টার্কটীয় অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত প্রাচীন দৃঢ় ভূখণ্ডগুলো (shield) -কে ভিত্তি করে মহাদেশগুলো গড়ে উঠেছে।

মেসোজোইক যুগের ভূ-অধোভাঁজ

চিত্র – ১ : মেসোজোইক যুগের ভূ-অধোভাঁজসমূহ।

গিরিজনি আলোড়নের ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অবস্থা হল ক্রাটোজেন। ক্রাটোজেনে সাধারণত ফাটল  এবং গ্রস্ত উপত্যকা দেখা যায়, তবে গভীরভাবে স্থাপিত ভাঁজ সেখানে দেখা যায় না। ভূ-ভাগের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী সাগরগুলো (transgressional seas) পলিরাশির উপরিভাগের ভাঁজ ক্রাটোজেনীয় (cratogenic) হিসেবে পরিগণিত। আল্পস ও জুরা পর্বতে গভীর এবং উপরিভাগের ভাঁজের মধ্যে ভিন্নতা সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। উত্তর আমেরিকার বৃহৎ হ্রদগুলোর চারদিকে অবস্থিত উন্নত উপকূল রেখা;  জুরা পর্বতে কেবল আলপাইন ভূ-অধোভাজের হার্সেনীয় (hersenian) অগ্রবর্তী ভূ-ভাগের উত্তরাংশের ভাঁজ পুনর্গঠন; পূর্ব আফ্রিকার গ্রাবেন বা গ্রস্ত উপত্যকা; মধ্য ইউরোপের স্তূপ পর্বত প্রভৃতি ক্রাটোজেন আলোড়নের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

পর্বত গঠন: কোবার মূলত: পর্বত শ্রেণীর কাঠামো অনুসন্ধান এবং গবেষণা করেন। কোবারের ধারণার সাথে পশ্চিম আলপাইন অঞ্চলের ভূতত্ত্ববিদগণের ধারণার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে তিনি এ ধারণার চরমপন্থীদের মত ছিলেন না। কোবার মনে করতেন যে, পর্বত গঠনের উপযোগী এবং সঞ্চিত পলি বহনকারী ব্যাপ্ত অধোভঙ্গগুলো যথেষ্ট দীর্ঘ এবং প্রশস্ত। সাধারণ নিয়মানুসারে সঙ্কুচিত হওয়ার প্রক্রিয়া ২টি প্রান্তিক পর্বত শ্রেণির সৃষ্টি করে। অত্যাধিক পার্শ্ব চাপ হলে ২টি অগ্রবর্তী ভূ-ভাগ প্রকৃতপক্ষে একে অপরের সাথে প্রায় মিলিত হয়। যার ফলে সঞ্চিত পলিরাশির সবটুকুই প্রায় মিশে যায়।

মধ্যস্তূপ ও নার্ভে

চিত্র – ২: মধ্যস্তূপ ও নার্ভে।

ভূগাঠনিক দিক থেকে এরূপে সৃষ্ট জটিল প্রান্তিক পর্বতশ্রেণী প্রায় একটি রেখা (cicatrice) বরাবর পাশাপাশি অবস্থান করে। আর এ অবস্থানকে ”নার্ভে” (narbe) বলা হয়। সুইস আল্পসের ক্ষেত্রে এরূপ হয়েছিল। পক্ষান্তরে, যে সব স্থানে ভাঁজ প্রক্রিয়া তত চরম নয়, সেখানে ২টি প্রান্তিক পর্বত শ্রেণীর মধ্যে অবস্থিত ছোট ও বড় আকারের ভূভাগ সৃষ্টি হয়। আর এ ভূভাগকে ‘মধ্য স্তূপ’ (Median Mass) বলা হয়। উত্তর দিকে ভাঁজবিশিষ্ট কাপোথিয়ান (carpathian) এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসরশীল ডেনারীক আল্পসের মধ্যস্থলে অবস্থিত হাঙ্গেরীর সমভূমি এরূপ একটি মধ্যস্তূপ হিসেবে পরিগণিত হয়।

 

কোবারের ক্যালিডোনিও গিরিজনি প্রকল্প

চিত্র – ৩: কোবারের ক্যালিডোনিও গিরিজনি প্রকল্প।

কোবারের মতানুসারে, ২টি ভূ-ভাগ পরস্পরের দিকে অগ্রসর হলে ব্যাপ্ত অধোভঙ্গের পলিরাশি নিষ্পেষিত হয়। আর এ উভয় ভূখন্ডই অগ্রবর্তী ভূভাগ বলে পরিগণিত। কোবারের প্রান্তিক পর্বত শ্রেণিগুলো হল ‘একপেশে’ এবং অধোভঙ্গ হল ‘দুইপেশে’। এ পর্বত গঠন আলোড়নগুলো হল গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ভূগাঠনিক এবং উচ্চ মাত্রার রূপান্তর বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।

দৃঢ় ভূ-খণ্ডদ্বয়ের অগ্রগতির ফলে মধ্যস্তূপ ও প্রান্তিক পর্বতশ্রেণির উদ্ভব

চিত্র – ৪: দৃঢ় ভূ-খণ্ড ২টির অগ্রগতির কারণে মধ্যস্তূপ এবং প্রান্তিক পর্বতশ্রেণির উদ্ভব।

মহাসাগরের সৃষ্টি: স্বাভাবিক সমুদ্রগুলো প্রাচীন না নবীন এ সম্পর্কিত বিষয়ে দ্বন্দ এবং অনেক জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোবারের মতানুসারে, মধ্য আটলান্টিক শৈলশিলা (mid-atlantic ridge) একটি ডুবন্ত গিরিজনির অংশবিশেষ। এ শৈলশিরাটির মত পৃথিবীর কতিপয় প্রাথমিক গঠন অনেক ধারণার সৃষ্টি করেছে। আটলান্টিকের তলদেশ সিমা (sima) না হয়ে সিয়াল (sial) দিয়ে গঠিত মনে করার অনেক যুক্তি আছে। এমনকি ওয়েগনারও একথা স্বীকার করতেন। কোবার সম্পূর্ণ সমুদ্রকে একটি গিরিজনি পরিগণিত করেন। আর মধ্য শৈলশিরাটি এটির অক্ষ। সমুদ্রের প্রান্তভাগগুলো হল চ্যুতি বা তীর্যক পর্বতশ্রেণি দিয়ে ব্যবচ্ছেদিত প্রধান প্রাচীন মালভূমি। গিরিজনি তলিয়ে গেছে; তবে ক্রাটোজেন টিকে আছে। উত্তর মহাসাগরে এবং ভারত মহাসাগরেও অনুরূপ উপকূলীয় শ্রেণি রয়েছে। এমনকি এ সাগর দু’টি আটলান্টিকের গঠনকে নিশ্চয়তা দান করেছে। [সংকলিত]


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *