ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি: এর কার্যপদ্ধতি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

কেমোথেরাপি [Chemotherapy] হল ক্যান্সারের [Cancer] আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। সাধারণত ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের কোষ অস্বাভাবিক গতিতে বিভাজিত হয় বা বৃদ্ধি পায়। শরীরের জন্য ক্ষতিকর অস্বাভাবিক গতিতে বিভাজন বা বৃদ্ধিরত ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা করার পদ্ধতিকে কেমোথেরাপি [Chemotherapy] বলে।

কেমোথেরাপির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কেমোথেরাপির প্রথম প্রচলন শুরু হয় খ্রিস্টীয় ২০শতকের প্রথম দিকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত নাইট্রোজেন মাস্টার্ড গ্যাস আজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় গবেষকরা প্রথম বারের মত খেয়াল করেন যে, এ গ্যাসটিকে যখন কেউ শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে, তখন তার শরীরের শ্বেত কোষের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট হারে হ্রাস পায়।

এরপরে ৪০ দশকের প্রথম দিকে আলফ্রেড গিলম্যান এবং লুইস গুডম্যান নামক ২জন ফার্মাকোলজিস্ট লিম্ফোমা  (ব্লাড ক্যান্সার) রোগ নিরাময়ে মাস্টার্ড গ্যাসের কার্যকারিতার উপরে গবেষণা করেন। গবেষণার অংশ হিসেবে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে ইঁদুরের উপরে মাস্টার্ড গ্যাস প্রয়োগ করেন এবং ইঁদুরের টিউমার ধ্বংসে ইতিবাচক ফল প্রদর্শন করেন। এ সফলতার ধারাবাহিকতায় গিলম্যান গুডম্যান থোরাসিক সার্জন গুস্তাভের সাথে মিলে তৈরি করেন মাস্টিন নামক মাস্টার্ড গ্যাসের লঘুতর মিশ্রণ। আর এ মাস্টিনই হল প্রথম কেমোথেরাপিউটিক ড্রাগস। যা পরবর্তীতে কোন মানুষের উপরে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়। এরপর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিম্ফোমা [lymphoma] চিকিৎসায় সাইটোটক্সিক [Cytotoxic] ঔষুধ হিসেবে নাইট্রোজেন মাস্টার্ড গ্যাসের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়।

একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সার প্রতিষেধক উদ্ভাবনে হার্ভাডের গবেষকরাও সফলতা দেখান। হার্ভাডের সিডনি ফারবার নামক একজন প্যাথোলজিস্ট ফলিক অ্যাসিড প্রয়োগ করে ক্যান্সার টিউমারের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। এ প্যাথোলজিস্ট তাঁর সহকর্মীদের সাথে মিলে তৈরি করেন Folate Analogues। যা ১৯৪৮ সালে অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর উপরে প্রয়োগ করে অস্থিমজ্জা [Bone Marrow] সফলভাবে পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হয়। এ সফলতার জন্য সিডনি ফারবার আধুনিক কেমোথেরাপির জনকের খ্যাতি লাভ করেন। এরপরে সকলের কাছে দৃশ্যমান হতে শুরু করে কেমোথেরাপি প্রয়োগের ইতিবাচক ফলাফল। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ার পেছনে কেমোথেরাপির সফল প্রয়োগ ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

কেমোথেরাপির কার্যপদ্ধতি: প্রত্যেকটি জীবের দেহ অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠিত হয়। আর এসব কোষ ধাপে ধাপে বিভাজিত হয় বা বৃদ্ধি পায়। কেমোথেরাপিতে কোষ বিভাজনের নির্দিষ্ট ধাপে রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। রাসায়নিক ঔষধসমূহের প্রয়োগ কোষ বিভাজনের ধাপসমূহের ওপর নির্ভর করে। এ থেরাপি (চিকিৎসা) একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী পরিচালিত হয়। যেমন- দৈনিক ১বার, প্রতি সপ্তাহে ১বার অথবা প্রতি মাসে ১বার ইত্যাদি। সাধারণত এ পদ্ধতিতে প্রায় ৬বার রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে কেমোথেরাপি সম্পন্ন করা হয়। বিভিন্ন উপায়ে কেমোথেরাপি দেয়া যেতে পারে। যেমন-

ইনজেকশনের মাধ্যমে: কেমোথেরাপিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক ঔষধ রোগীর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। সাধারণত এটি Intra arterial (ধমনীর মধ্যে প্রবেশ করে) কিংবা Intravenous (শিরার মধ্যে প্রবেশ করে)। রাসায়নিক ঔষধ রক্তের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করার পরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ক্যান্সারের কোষ যেখানে পাওয়া যায়, সেখানেই ধ্বংস হয়।

ওরাল: সাধারণত ঔষধের টেবলেট (বড়ি) বা ক্যাপসুল হিসেবে মুখে খাওয়া মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। 

টপিকাল: সাধারণত ক্রীম হিসেবে ত্বকে মালিশ করে প্রয়োগ করা হয়।

ক্যান্সার কোষের জন্য কেমোথেরাপির রাসায়নিক ঔষধ হল এক প্রকারের বিষ [Toxic]। সাইটোটক্সিক [Cytotoxic] এ ঔষুধ ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে। কেমোথেরাপি হল এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরীরের ক্ষতিকারক ক্যান্সার কোষসমূহকে যতটা সম্ভব খুঁজে বের করে ধ্বংস করা হয় এবং ভাল কোষসমূহকে যতটা সম্ভব কম ধ্বংস করা হয়।

কেমোথেরাপির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া: কেমোথেরাপিতে বিশেষ রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগের ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের ধ্বংসের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য কোষসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির নিম্নের ঝুঁকিসমূহ থাকে:

১. কেশগ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে, যার কারণে কেশ বা চুল বা লোম পড়ে যেতে পারে;

২. হাত ও পায়ের তালুসহ শরীরের অন্য অঙ্গসমূহের চামড়া পুড়ে যেতে পারে;

৩. রক্তের লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও অণুচক্রিকা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে;

৪. প্রজননতন্ত্রের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে;

৫. মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে;

৬. বমি বমি ভাবের উদ্রেক ঘটতে পার;

৭. ত্বক এবং নখ শুকিয়ে আসতে পারে; এবং

৮. ঘন ঘন মনমেজাজের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

কেমোথেরাপিতে কতিপয় সতর্কতা: কেমোথেরাপির ঝুঁকি হ্রাসে কতিপয় বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেমন-

১. কেমোথেরাপি প্রয়োগকালে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রার দিকে খেয়াল রাখা;

২. কেমোথেরাপি চলাকালে তরল বা নরম খাবার খাওয়াতে হবে; এবং

৩. কেমোথেরাপি চলাকালে সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে শরীর অভ্যন্তরের পরিবর্তন ঠিক রাখার চেষ্টা করা। এছাড়া-

৪. কেমোথেরাপি গ্রহণকৃত ক্যান্সার রোগীর বর্জ্য; যেমন- মলমূত্রাদি, বমি প্রভৃতি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা; এবং

৫. বর্জ্য পরিষ্কার করার সময় হাতে গ্লাভস পরিধান করা অথবা প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে হাত ভালভাবে মুড়িয়ে নেয়া। [সংকলিত]

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *