জীবজগতে জলবায়ুর ভিন্নতার প্রভাব

পৃথিবীর সর্বত্র একই রকম জলবায়ু বিরাজ করে না। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, উদ্ভিদ, প্রাণী, কৃষিব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট পার্থক্য। জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে কৃষিব্যবস্থা। পৃথিবীর সব স্থানে যেমন কৃষিজ ফসল ভালো হয় না, তেমনি সব স্থানে প্রাণী বা উদ্ভিদের জীবনধারণ করাও সম্ভব না। আবার জলবায়ুর ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। যে কারণে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও জলবায়ু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলবায়ুর ভিন্নতা মানুষ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তর জীবনযাত্রাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং সাধারণ জীবনপ্রণালির ওপর জলবায়ুর ভিন্নতার প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। নিচে জীবজগতে জলবায়ুর ভিন্নতার প্রভাব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. কৃষিব্যবস্থার ওপর: জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কৃষিজ ফসলের প্রকার ও ধরন জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। যেমন: মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের দেশগুলোতে ধান, পাট, চা, আখ প্রভৃতি কৃষিজ ফসল ভালো জন্মায়। যে কারণে এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। অপরদিকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে প্রচুর ফল, গম, যব, ভুট্টা ভলো হয়। সেখানকার মানুষের প্রধান খাদ্য গম বা রুটি। অর্থাৎ যে জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত সে অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের সাথে খাপ খেয়ে মানুষের জীবন- জীবিকা ও খাদ্যাভ্যাস, বসতি ইত্যাদি গড়ে ওঠে।

২. উদ্ভিদের ওপর: জলবায়ুর ভিন্নতার সাথে সাথে উদ্ভিদের ভিন্নতাও লক্ষণীয়। জলবায়ু ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিজ্জ বংশবিস্তার করে। অর্থাৎ যে উদ্ভিদের বেঁচে থাকা কিংবা বংশবিস্তারের জন্য যে ধরনের জলবায়ু অনুকূল সে উদ্ভিদ সে ধরনের জলবায়ুতে গড়ে ওঠে। যেমন: ভূম্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে ছোট ছোট গাছপালা ও ঝোপঝাড় বেশি জন্মে। অপরদিকে মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে চিরসবুজ বৃক্ষের গভীর বনভূমি দেখা যায়। এ অঞ্চলে প্রচুর শাল, সুন্দরি, নারিকেল, সুপারি, রাবার, আম, জাম, কাঁঠাল, বাঁশ, বেত, গোলপাতা, ইত্যাদি বৃক্ষ ভালো জন্মে। আবার নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে নিবিড় চিরহরিৎ বনভূমির প্রাধান্য দেখা যায়। এখানে রাবার, রেজ উড, আয়রন উড, কোকো প্রভৃতি বৃক্ষ প্রচুর জন্মে।

৩. জীবজন্তুর ওপর: জলবায়ুর ভিন্নতার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার প্রাণীর বিচরণ লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ অনুকূল পরিবেশ না পেলে কোনো প্রাণীই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে প্রধানত হিংস্র মাংসাশী, তৃণভোজী এবং গৃহপালিত জীবজন্তু যেমন: গরু, ছাগল, ঘোড়া, মহিষ, বাঘ, ভাল্লুক, চিতাবাঘ, হরিণ, হাতি, বানর, শূকর, বন্য মহিষ, ছাগল, বিড়াল, কুকুর প্রভৃতি বসবাস করে। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে হিংস্র ও মাংসাশী প্রাণী দেখা যায় না বললেই চলে। এখানে সাধারণত গাধা, খচ্চর, দুম্বা, ভেড়া প্রভৃতি জীবজন্তু দেখা যায়।

৪. শিল্প কলকারখানার ওপর: বিভিন্ন শিল্পকারখানার ওপর জলবায়ু ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অনুকূল জলবায়ু অঞ্চলে অনুকূল শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। যেমন: যেসব অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল পাওয়া যায়, সেসব অঞ্চলে কাঁচামাল নির্ভর শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। আবার লোহা ও আকরিক সমৃদ্ধ এলাকাতে যন্ত্রশিল্প কারখানা গড়ে ওঠে।

৫. জনবসতি ও বাসস্থানের ওপর: পৃথিবীর এক এক অঞ্চলের বসতি এক এক ধরনের। জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে এ সমস্ত বসতি গড়ে উঠেছে। যেমন: তুন্দ্রা অঞ্চলের বাসগৃহে সাধারণত জানালা থাকে না। অধিক বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে চাল কিছুটা ঢালু করা হয়। আবার ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের বাসগৃহ অধিকাংশই কাঠ দ্বারা নির্মিত। আবার জলবায়ু জনবসতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। নিরক্ষীয় অঞ্চল এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে জনবসতি খুব বিরল। আবার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে জনবসতি ঘন সন্নিবিষ্ট। অর্থাৎ জলবায়ু ভিন্নতায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষ উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজগতে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের পেশা, জীবনযাত্রা, পোশাক ইত্যাদিতে জলবায়ুর প্রভাব লক্ষণীয়।

সুতরাং, জলবায়ু প্রতিটি দেশের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডের উপরে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই জলবায়ুর ভিন্নতায় একেক দেশে জীবনযাত্রার মানও একেক রকম হয়। [ইশরাত জাহান মিম]


সহায়িকা: মজুমদার, তাপস কুমার, ভূগোল, (২০২৩), লেকচার পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, পৃষ্ঠা ২০১ – ২০২।


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *