নড়াইলের স্থাপত্যিক ঐতিহ্য: সাহিত্যিক ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়ি



অবস্থান: সাহিত্যিক ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়ি নড়াইল জেলাধীন লোহাগড়া উপজেলার ইতনা নামক গ্রামে অবস্থিত। লোহাগড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫.৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ইতনা গ্রাম। লোহাগড়া-ইতনা সড়ক সংলগ্ন ইতনা বাজারের পশ্চিম পাশ থেকে দক্ষিণ দিকে ইতনা বালিকা বিদ্যালয়গামী রাস্তা। এ রাস্তা ধরে প্রায় ৮০০ মিটার এগিয়ে গেলে রাস্তাটি পশ্চিম দিকে বেঁকে যায়।  এরপর আরো প্রায় ২০০ মিটার সামনে গেলে প্রাচীন এ বাড়িটি দেখা যায়।  বর্তমানে বাড়িটিতে ১টি দোতলাবিশিষ্ট দালান ও ১টি মন্দির রয়েছে। মন্দিরটি এ বাড়িটির সামনে প্রবেশপথের পশ্চিম পাশে এবং দোতলা দালানটি মন্দিরটির খুব সন্নিকটে উত্তর পাশে অবস্থিত।

 মানচিত্র: সাহিত্যিক ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়ির অবস্থান।

ঐতিহাসিক পটভূমি: নীহার রঞ্জন গুপ্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতায় ৬ জুন, ১৯১১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা- সত্যরঞ্জন গুপ্ত এবং মাতা- লবঙ্গলতা দেবী। নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইতনায় নীহার রঞ্জন গুপ্তের আদি পৈতৃক বাড়িটি অবস্থিত। তিনি জীবনের বেশি সময় কলকাতায় অতিবাহিত করেন। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি বাঙ্গালী সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম  হল- রাজকুমারী,  মঙ্গলসূত্র, উল্কা, বহ্নিশিখা, ইস্কাবনের টেক্কা, অশান্ত ঘূর্ণি, মধুমতি থেকে ভাগীরতী, সেই মরু প্রান্তে, ধূসর গোধূলী, ছিন্নপত্র, কন্যাকুমারী, রাত্রি নিশীথে, কাগজের ফুল, কন্যা কেশবতী, নীল তারা, নূপুর, নিশিপদ্ম, মধুমিতা, মুখোশ, রাতের রজনী গন্ধা প্রভৃতি। তিনি ২০ জানুয়ারি, ১৯৮৬ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈতৃক বাড়িটি আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১৯ শতকের ৬০-৭০ দশকে নির্মিত হয়। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, সর্বশেষ মনরঞ্জন গুপ্ত নামে তাঁর এক চাচা এ বাড়িটিতে বাস করতেন এবং দাতব্য চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর চাচা এ বাড়িটিতেই মৃত্যুবরণ করেন। ঐতিহ্যবাহী এ বাড়িটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। যা এখন বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়ির দোতলা দালান: দক্ষিণমুখী এ দালান নির্মাণে ইট ও চুন-সুরকি ব্যবহার করা হয়। ছাদে কড়িকাঠ (wooden joist) ব্যবহার করা হয়। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার ছাদ বরাবর কার্ণিস (cornice) রয়েছে। এ কার্ণিসের নিচে দেয়ালের গায়ে বহুভাজের (multi-foil) নকশা দেখা যায়। সামনে সরু বারান্দাবিশিষ্ট দালানটির নিচ তলায় ৭টি কক্ষ  রয়েছে। সামনের বারান্দা থেকে অভ্যন্তরের কক্ষসমূহে প্রবেশ করার জন্য একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে। বারান্দার সামনে সেগমেন্টাল খিলানবিশিষ্ট স্তম্ভ (segmental arched column) রয়েছে। দোতলায় উঠার জন্য এ দালানের উত্তর-পূর্ব কোণে ১টি সিঁড়ি রয়েছে। এ দালানের দোতলার দক্ষিণের অংশটি নেই। উত্তরের যে অংশটি রয়েছে সেখানে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা বারান্দাসহ ৩টি কক্ষ রয়েছে। দোতলার বারান্দার সামনে সেগমেন্টাল খিলানবিশিষ্ট স্তম্ভ (segmental arched column) রয়েছে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার প্রতিটি কক্ষে কুলঙ্গি (niche) ও দেয়াল আলমারি রয়েছে। দালানের দরজা, জানালা ও দেয়াল আলমারিতে ফুল ও লতাপাতার নকশা করা কাঠের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। নিচ তলার বারান্দার দেয়ালে বাংলা বর্ণে ‘আনন্দ অন্নদা কুঠির’ উৎকীর্ণ রয়েছে। এটি প্রাচ্যের (oriental) নির্মাণ শৈলীর একটি  সাধারণ মানের দোতলা দালান।


নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়ির মন্দির: নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়িতে অবস্থিত মন্দিরটি আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মাণ করা হয়। দক্ষিণমুখী এ মন্দিরের দৈর্ঘ্য ৮.৩০ মিটার ও প্রস্থ ৭.১৫ মিটার। মন্দিরটি নির্মাণে  ইট ও চুন-সুরকি ব্যবহার করা হয়। এ মন্দিরের সামনে ১টি বারান্দা ও পিছনে একটি মাত্র কক্ষ রয়েছে। প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার উঁচু পাদমঞ্চের (podium) উপর অবস্থিত এ মন্দিরের সামনে ২ ধাপের একটি সিঁড়ি রয়েছে। এ সিঁড়িটি দিয়ে সামনের বারান্দায় প্রবেশ করা যায়। বারান্দার সামনের দেয়ালে ৩টি প্রবেশপথবিশিষ্ট ১টি তোরণ (arcade) রয়েছে। তোরণের প্রবেশপথগুলো অর্ধবৃত্তাকার খিলানবিশিষ্ট (semi circular arched)। প্রবেশপথের খিলানগুলো তুস্কান স্তম্ভের (tuscan column) উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনের বারান্দা থেকে পিছনের কক্ষে প্রবেশের জন্য একই আদলে নির্মিত তোরণ (arcade) রয়েছে। এ তোরণটির খিলানের স্প্যান্ড্রিলে (spandrel) গরুর মাথা সদৃশ প্রতিকৃতি রয়েছে। এ মন্দিরের দেয়ালগুলো ৩৭.৫ সেন্টিমিটার পুরু।  মন্দিরের অভ্যন্তরে উত্তর দেয়ালের মাঝামাঝি ১টি মূর্তি প্রকোষ্ঠ (statue chamber)। মূর্তি প্রকোষ্ঠটির বাম পাশে ১টি প্রবেশপথ ও ১টি জানালা এবং ডান পাশে আরো ১টি জানালা রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম দেয়ালের মাঝামাঝি ১টি কুলঙ্গি (niche) এবং এ কুলঙ্গিটির বাম পাশে ১টি জানালা ও ডান পাশে ১টি প্রবেশপথ রয়েছে। পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি ১টি জানালা এবং জানালাটির বাম পাশে ১টি কুলঙ্গি ও ডান পাশে ১টি দেয়াল আলমারি রয়েছে। একতলাবিশিষ্ট এ মন্দিরটির ছাদ নির্মাণে লোহার বার (iron joist), কড়িকাঠ (wooden joist) এবং টালি (tile) ব্যবহার করা হয়েছে। মন্দিরের নির্মাণশিল্পে পাশ্চাত্য (occidental) ও প্রাচ্যের (oriental) সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।

Click for English Version


[লেখক: মো. শাহীন আলম



Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *