পানাম নগর: মধ্যযুগীয় রাজধানী শহর সোনারগাঁও-এর একটি উপশহর !

পানাম নগর নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন সোনারগাঁও উপজেলার আমিনপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া নামক বাসস্ট্যান্ড। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সড়কপথে প্রায় ২.৬ কিলোমিটার উত্তর দিকে এগিয়ে গেলে পানাম বাজার। এ বাজারের সাথে লাগোয়া পূর্বদিকে প্রাচীন পানাম নগরটি ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পানাম নগর থেকে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার পশ্চিম দিক দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী এবং প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্ব দিক দিয়ে মেঘনা নদী  উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত রয়েছে।

মানচিত্র: প্রাচীন পানাম নগরের অবস্থান।

চারদিকে পরিখা বা খাল বেষ্টিত এবং একটি সড়কের দুই পাশে কতকগুলো সুরম্য স্থাপনা নিয়ে  পানাম নগরটি গড়ে উঠেছে। প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৫ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট সড়কের দুই পাশে স্থাপনাগুলো সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে বর্তমানে ছোট-বড় ৫২টি স্থাপনা রয়েছে। সড়কটির উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি স্থাপনা রয়েছে। সবগুলো স্থাপনার সদর বা সম্মুখভাগ সড়কের দিকে। বাড়িগুলো কোথাও পরস্পর সন্নিহিত, আবার কোথাও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পানাম নগরের অভ্যন্তরে ছোট বড় পুকুর ও পাতকুয়া রয়েছে।

চিত্র: পানাম নগরে অবস্থিত অলংকরণ শোভিত সুরম্য স্থাপনা [কাশীনাথ ভবন, সন ১৩০৫ (ডানে)]।

চিত্র: পানাম নগরে অবস্থিত সামনের দেয়ালে নানা অলংকরণ শোভিত সুরম্য স্থাপনা।

চিত্র: পানাম নগরে অবস্থিত কিছু ক্ষতিগ্রস্থ স্থাপনা।

এক তলা থেকে তিন তলা উচ্চতার এ স্থাপনাগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মাণ করা হয়েছে। তবে দোতলা স্থাপনার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি রয়েছে। এ স্থাপনাগুলোতে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে পোড়ামাটির ইট ও টালি, চুন-সুরকি, লোহার বিম ও কাঠের বর্গা, লোহার রেলিং, লৌহ স্তম্ভ, টিন, পাথরের টুকরো, চীনামাটির ফলকের টুকরো প্রভৃতির ব্যবহার করা হয়েছে। স্থাপনাগুলোর বাহির দেয়ালের গাঁথুনীতে গোলাকার, অর্ধগোলাকার, খিলানাকার, চোখা, বক্ররেখ প্রভৃতি আকৃতিবিশিষ্ট ইটের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। স্থাপনাগুলোর মেঝেতে লাল, সাদা ও কালো টালি এবং মোজাইকের কারুকাজ রয়েছে। এছাড়া বাহিরের দেয়ালে অলংকৃত চীনামাটির (porcelain) ফলকের ভগ্ন টুকরোর সুসজ্জিত কারুকাজ দেখা যায়। বাহিরের দেয়ালে, দরজা ও জানালায়, সামনের বারান্দার তোরণে ও ছাদের প্রাচীরে ফুল ও লতা-পাতাসহ বিভিন্ন প্রকারের জ্যামিতিক অলংকরণ রয়েছে। প্রতিটি স্থাপনার দেয়াল প্রায় ৫০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার পুরু। স্থাপনার ছাদগুলোতে লোহার বিম, কাঠের বর্গা, টালি ও চুন-সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে। সিঁড়িতে অলংকৃত লোহার রেলিং ব্যবহার করা হয়েছে। স্থাপনাগুলোর সামনের দেয়ালে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর আদলের বিভিন্ন খিলান (arch), তোরণ (archcade), স্তম্ভ (column) ও রেলিং (railing) -এর সংমিশ্রণ ঘটেছে। তবে প্রতিটি স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

চিত্র: পানাম নগরে অবস্থিত সুরম্য স্থাপনার সামনের দেয়ালে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর একান্থাস (acanthus) পত্র শোভিত করিন্থিয়ান স্তম্ভ (corinthian column), অলংকৃত রেলিং (railing) ও অর্ধবৃত্তাকার খিলান (semi-circular arch)।

১. করিন্থিয়ান স্তম্ভ (corinthian column) ও অলংকৃত রেলিং (railing)।

৪. চীনামাটির (porcelain) ফলকের টুকরো দিয়ে দেয়ালে কারুকাজ।

২. সামনের বারান্দায় লোহার অলংকৃত রেলিং (railing) ও স্তম্ভ (column)।

৫. ত্রি-পত্রাকার খিলানের (trefoil arch) নিচে ব্যবহৃত লোহার অলংকরণ।

৩. মেঝেতে (floor) সাদা ও কালো বর্ণের টালির (tile) কারুকাজ।

৬. অর্ধবৃত্তাকার খিলানের (semi-circular arch) নিচে লোহার অলংকরণ।

চিত্র: পানাম নগরের সুরম্য স্থাপনাসমূহের দেয়ালে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অলংকরণ ও কারুকাজের খণ্ডচিত্র।

পানাম নগরের পশ্চিম পাশের সরু পরিখা বা খালের উপরে পানাম নগর সেতু অবস্থিত। পানাম নগরের এ প্রবেশ সেতুটির দৈর্ঘ্য ২২ মিটার ও প্রস্থ ৫ মিটার। পশ্চিমের সরু খালটি উত্তর ও দক্ষিণ পাশের খালের সাথে সংযুক্ত রয়েছে। পঙ্খিরাজ নামে পরিচিত উত্তর পাশের খালটি পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা-মেনীখালী স্রোতধারার সাথে মিলিত হয়েছে।

এছাড়া পানাম নগরের পশ্চিম পাশের সড়ক দিয়ে উত্তর দিকে যাওয়ার পথে মুঘল আমলের একটি সেতু দেখা যায়। পঙ্খিরাজ খালের উপরে অবস্থিত এ সেতুটি তিনটি খিলানের উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। এ সেতুটি পানাম সেতু হিসেবে অধিক পরিচিত। সেতুটির মাঝখানের খিলানটি তুলনামূলক বেশি উঁচু এবং প্রশস্ত।

চিত্র: পানাম নগরের বাহিরে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর আদলের পানাম সেতু [পশ্চিম দিক থেকে]।

চিত্র: পানাম নগরের বাহিরে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর আদলের পানাম সেতু [পূর্ব দিক থেকে]।

১৮ – ১৯ শতাব্দীতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ফলে প্রাচীন পানাম নগর গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে সোনারগাঁও সুতিবস্ত্রের ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এ ব্যবসা কেন্দ্রের সুবাদেই গড়ে ওঠে এ পানাম নগর। ১৯ শতাব্দীতে সুতিবস্ত্রের ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক হিন্দু তালুকদার পানামকে নিজেরদের আবাসস্থলরূপে গড়ে তোলেন। আরো জানা  যায় যে, পানাম নগরের স্থাপনাগুলো মূলত হিন্দু ব্যবসায়ী-তালুকদারদের আবাসিক ভবন। পানাম নগরের স্থাপত্যিক নির্মাণ অগ্রগতি এবং সৌন্দর্যবর্ধণের কাজ ১৯ শতাব্দী থেকে ২০ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক লোকজন দেশত্যাগ করেন। তখনই পানাম প্রায় জনমানবহীন একটি নগরে পরিণত হয়।

চিত্র: পানাম নগরের অভ্যন্তরে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর আদলের একটি স্থাপনা।

উল্লেখ্য যে, সোনারগাঁও বাংলার অন্যতম প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন সুবর্ণগ্রাম বা স্বর্ণগ্রাম থেকে সোনারগাঁ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে জানা যায়। ১৬ শতাব্দীর শেষভাগে (অর্থাৎ ১৫৬০-১৫৯৯ সালের মধ্যে) ঈসা খান সোনারগাঁওয়ে বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন। ঈসা খান ১৫৮১ – ১৫৮২ সালের দিকে সোনারগাঁওয়ের নিকটবর্তী কাত্রাবো, কলাগাছিয়া ও খিজিরপুরে দুর্গ নির্মাণ করেন। ১৬১০ সালে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সোনারগাঁও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। আরো জানা যায় যে, ১৬১১ সালে মুঘলদের সোনারগাঁও অধিকারের পরে একাধিক সড়ক ও সেতু নির্মাণ করে। যার ফলে রাজধানী শহরের সাথে পানামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পানাম নগর ও এর আশেপাশের এলাকায় মুঘল আমলের ইট ও স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ৩টি সেতু; পানাম সেতু, পানামনগর সেতু ও দালালপুর পুল রয়েছে। এছাড়া সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়ায় প্রস্তর নির্মিত বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের সমাধী এবং গোয়লদীতে ১৫১৯ সালে মোল্লা হিজবার আকবর খান নির্মিত একগম্বুজবিশিষ্ট গোয়লদী মসজিদ রয়েছে। পানামের সেতুগুলোর অবস্থান, পানাম নগরের তিন দিকের পরিখা বা খালের বেষ্টনী এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যিক নিদর্শন দেখে প্রতীয়মান হয়, পানাম নগরটি সম্ভবত মধ্যযুগীয় রাজধানী শহর সোনারগাঁওরের একটি উপশহর (suburb) ছিল। সোনারগাঁও তথা পানাম নগরের ঐতিহাসিক দিক উন্মোচনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অগ্রবর্তী (advanced) প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, খনন ও অনুসন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

পানাম নগরের সুরম্য স্থাপত্যশৈলী ও এরূপ স্থাপত্য বিন্যাস বাংলাদেশে খুব কম দেখা যায়। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও প্রত্নস্থল। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও প্রত্নস্থল দেখার জন্য প্রতিদিন বহু পর্যটকের আগমন ঘটে। রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়


তথ্যসূত্র:
১. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।
২. পানাম নগর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ।
৩. খান, মুয়ায্‌যম হুসায়ন, পানাম , ১৭ এপ্রিল ২০১৫, বাংলা পিডিয়া।
৪.  আহমদ, এ.বি.এম শামসুদ্দীন, ঈসা খান, ৫ মে ২০১৪, বাংলা পিডিয়া।
৫. ইসলাম, সিরাজুল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ৮ মে ২০১৪, বাংলা পিডিয়া।


লেখক: মো: শাহীন আলম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *