পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে উষ্ণতার পার্থক্যের কারণ | Weather and Climate

পৃথিবীর সর্বত্র উষ্ণতা একই রকম নয়। কোথাও শীতল, কোথাও উষ্ণ আবার কোথাও সমভাবাপন্ন অবস্থা বিরাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের উষ্ণতার এরূপ তারতম্য কতকগুলো কারণের উপর নির্ভর করে। এ কারণগুলো সম্পর্কে নিচে ধারাবাহিকভাবে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:

ক) সূর্যকিরণের পতন (sunlight fall): পৃথিবীর তাপের প্রধান উৎস হল সূর্য। তবে সূর্যকিরণ ভূ-পৃষ্ঠের সর্বত্র সমানভাবে পতিত হয় না। কোথাও তীর্যকভাবে; আবার কোথাও লম্বভাবে পতিত হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে বছরের সব সময়ই সূর্যকিরণ লম্বভাবে পতিত হয়। সূর্য ২১ জুন ও ২২ ডিসেম্বর যথাক্রমে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তির উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। সাধারণত সূর্য পৃথিবীর কোন স্থানে লম্বভাবে কিরণ দিলে অন্য স্থানে তীর্যকভাবে কিরণ দেয়। নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণে যতই দূরত্ব বৃদ্ধি পায়, ততই সূর্যকিরণ তীর্যকভাবে পতিত হয়, ফলে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণে তাপ ক্রমশ কম হয়। সূর্যকিরণ লম্বভাবে পতিত হলে কম বায়ুস্তর ভেদ করে। ফলে তাপের প্রখরতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুস্তরকে অধিকতর উত্তপ্ত করে।

খ) ভূমির ঢাল (land incline): ভূমির ঢাল অনুসারে ভূ-পৃষ্ঠের উষ্ণতার তারতম্য হয়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে পাহাড়ের দক্ষিণ ঢাল বেশি সূর্য তাপ এবং পাহাড়ের বিপরীত পাশ অর্থাৎ উত্তর ঢাল কম সূর্য তাপ পায়। পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়।

গ) উচ্চতার পরিবর্তন (altitude change): ভূ-পৃষ্ঠের কোন স্থান থেকে উচ্চতা যত বাড়ে, সে স্থানের বায়ুতে তত শীতল অনুভূত হয়। একই অক্ষাংশে অবস্থিত বিভিন্ন স্থানের উচ্চতার তারতম্য অনুসারে বায়ুর তাপের তারতম্য হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় তাপ হ্রাসের পরিমাণ ৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঘ) দিবাভাগের দৈর্ঘ্য (day length): ঋতুভেদে দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের তারতম্য হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে দিনের দৈর্ঘ্য হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। দিন বড় হলে ভূ-পৃষ্ঠ বেশি সময় সূর্য তাপ গ্রহণ করে বেশি উত্তপ্ত হয়। কিন্তু দিন ছোট হলে এবং রাত বড় হলে এর বিপরীত অবস্থা হয়। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে দিন বড় হওয়ায় বায়ুমন্ডল বেশি উত্তপ্ত হয় এবং গরম অনুভূত হয়। কিন্তু শীতকালে দিন ছোট হওয়ায় বায়ুমন্ডল বেশি উত্তপ্ত হতে পারে না এবং শীত অনুভূত হয়।

ঙ) বায়ুমন্ডলের গভীরতা (depth of atmosphere): যে বায়ুস্তর যত গভীর ও ঘন হয়, সে বায়ু স্তরে তত বেশি পরিমাণে ধূলিকণা ও জলীয়বাষ্প থাকে। ধূলিকণা ও জলীয়বাষ্প বেশি পরিমাণে তাপ গ্রহণ ও সঞ্চয় করতে পারে। ভূ-পৃষ্ঠের উপর সব জায়গায় বায়ুমন্ডলের গভীরতা সমান না হওয়ায় স্থানভেদে তাপের তারতম্য হয়ে থাকে।

চ) বায়ুপ্রবাহ (wind flow): বায়ু প্রবাহ বায়ুমন্ডলের উষ্ণতার তারতম্য ঘটায়। উষ্ণমন্ডলের বায়ু উষ্ণ ও হিমমন্ডলের বায়ু শীতল। উষ্ণ বায়ু উচ্চ অক্ষাংশ বা মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হলে সেখানে শীতের পরিমাণ কমে যায়। আবার শীতল বায়ু  নিন্ম অক্ষাংশের দিকে প্রবাহিত হলে সেখানে শীত বেশি হয়।

ছ) জলীয়বাষ্পের পরিমাণ (quantity of water vapor): জলীয়বাষ্প সূর্যকিরণ থেকে কিছুটা তাপ শোষণ করে নেয়। এ কারণে কোন স্থানের বায়ুতে জলীয়বাষ্প বেশি থাকলে সে স্থানের তাপ বাড়তে পারে না। আবার জলীয়বাষ্প সে স্থানের তাপ ধরে রাখে বলে রাতে ঐ স্থান বেশি শীতল হতে পারে না।

জ) সমুদ্রস্রোত (ocean current): উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে শীতল অঞ্চলের সমুদ্র উপকূল এলাকা ও উপকূলের বায়ু উষ্ণ হয়। আবার শীতল স্রোতের প্রভাবে উষ্ণ অঞ্চলের উপকূল এলাকা শীতল হয়।

ঞ) পর্বতের অবস্থান (mountain location): পর্বতের অবস্থান ভূ-প্রকৃতির উষ্ণতার উপর প্রভাব বিস্তার করে। হিমালয় পর্বত বিশাল পর্বত প্রাচীর সৃষ্টি করায়, শীত ঋতুতে মধ্য এশিয়া থেকে প্রবাহিত অত্যন্ত শীতল বায়ুর প্রকোপ থেকে ভারত ও বাংলাদেশ রক্ষা পায়। আবার গ্রীষ্মকালে ভারত ও বাংলাদেশ অঞ্চলের আর্দ্র বায়ু মধ্য এশিয়ার দিকে প্রবাহিত হতে পারে না বলে হিমালয়ের উত্তরের তিব্বতে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

ট) বনভূমি (forestland): গাছপালা বায়ুর তাপ কিছুটা শোষণ করে এবং প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাষ্পাকারে অতিরিক্ত পানি বায়ুতে ছেড়ে দেয়। এ কারণে বনভূমি অঞ্চলে বায়ু বেশি উত্তপ্ত হতে পারে না। আবার গাছপালার প্রস্বেদনের ফলে অধিক জলীয়বাষ্প বনভূমি এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। বৃষ্টিপাত হওয়ার পর সে স্থানে তাপ কমে যায়। এজন্য বনভূমির প্রভাবে স্থান বিশেষ ভূ-পৃষ্ঠের তাপ কম হয়।

ঠ) মেঘাচ্ছন্নতা (cloudiness): উত্তাপ নিয়ন্ত্রণে মেঘাচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সূর্য থেকে আগত তাপ মেঘে বাঁধা পায়। ফলে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া নিচের ভূমি বেশি উত্তপ্ত হয় না। আবার দেখা যায় যে, ভূ-পৃষ্ঠের তাপ বিকিরণের সময় মেঘের সাথে বাঁধা পেয়ে বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে ফিরে যেতে পারে না। এ কারণে কোন স্থানের আকাশে মেঘ দেখা দিলে, সে স্থান উষ্ণ থাকে। ফলে  মেঘাচ্ছন্ন রাত মেঘমুক্ত রাত অপেক্ষা বেশি উষ্ণ হয়ে থাকে।


[মো. শাহীন আলাম]


[Keyword: Weather and Climate, Climate Change, Jalbayu Paribartan]


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *