প্রাইমেট ও মানুষের বিবর্তন

ভূ-তাত্ত্বিক সময়পঞ্জি [Geological Time Scale] অনুসারে ৬ থেকে ৩ কোটি বছর পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে এক শ্রেণির স্তন্যপায়ী প্রাণি গাছে বসবাস করে। গাছে বসবাসকারী এ প্রাণিসমূহ ঐ সময়কার পরিবেশের উপযোগী কতিপয় বিশেষ গুণ অর্জন করে। বিশেষ এ গুণসমূহ ঐ সময়কার ভূমিচর প্রাণি কর্তৃক অর্জন করতে পারেনি। আর এ শ্রেণির বা জাতের প্রাণিদেরকেই প্রাইমেট (primate) বলা হয়। লেমুর, গিবন, ওরাংওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণিসমূহ এ প্রাইমেট প্রাণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণার মাধ্যমে ধারণা করা হয় যে, সুদূর অতীতকালের প্রাইমেটদের ১টি শাখা থেকে পর্যায়ক্রমে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্ভব হয়েছে। প্রাইমেটদের অন্যান্য শাখার প্রাণিরা বানর বা নরবানর (লেমুর, গিবন, ওরাংওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি) পর্যায়ে আটকে রয়েছে। মানুষের উদ্ভব বা সৃষ্টির উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীগণ ধারণা করেন যে, প্রাইমেটদের মত সংস্কৃতিবিহীন কোন প্রাণি পর্যায় থেকে মানুষের উৎপত্তি শুরু এবং দীর্ঘ কালব্যাপী পর্যায়ক্রমে বিবর্তনের মাধ্যমে এসে মানুষের বর্তমান (আধুনিক) পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রাইমেট Primate

জীববিজ্ঞানীগণ প্রাচীনকালের এবং বর্তমানকালের প্রাইমেটদের নিয়ে গবেষণা করে কতিপয় সাধারণ বৈশিষ্ট্য ঠিক করেন। তাঁরা এপ (ape) – এর ওরাংওটাং, গিবন, গরিলা, শিম্পাঞ্জী সাথে মানুষের শরীরের মিল/সাদৃশ্য খোঁজে পান। জীববিজ্ঞানীগণ মনে করেন যে, মিলের দিক দিয়ে এরা কেবল প্রাইমেট (primate) নয়, একই হোমিনিডা (Hominidae)। এপ (ape) ও মানুষের মধ্যে হুবহু মিল নেই, তবে এদের মিলের মধ্যে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা মানুষের একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। তবে এপ (ape) ও মানুষের মধ্যে দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণগত কিছু মিল ও অমিল রয়েছে। মানব বিবর্তন (human evolution) আলোচনায় সে সব মিল ও অমিল নিম্নে তুলে ধরা হল:

মস্তিষ্ক (brain): মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন গড়ে ১,৩৫০ সেন্টিমিটার; অপরদিকে সবচেয়ে বড় এপ (ape) – এর মস্তিষ্কের আয়তন ৫০০ ঘন সেন্টিমিটার। মানুষের মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের সংখ্যা ১,৪০০ কোটি, অপরদিকে এপ (ape) বিশেষ করে ওরাংওটাং – এর মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের সংখ্যা ১,০০০ কোটি। সুতরাং এপ (ape) ও মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে অনেকটা মিল রয়েছে। তবে একই পূর্বপুরুষ থেকে এপ (ape) ও মানুষের উদ্ভব বা জন্ম হলে এপ (ape) এর মস্তিষ্ক অবশ্যই মানুষের মত উৎকৃষ্ট হওয়া দরকার ছিল।  

হাত (hand): নখবিশিষ্ট ৫টি করে আঙ্গুলসহ এপ (ape) ও মানুষের ২টি হাতের ধরন একই রকম। তবে পূর্বপুরুষের হাতের মত লক্ষণ থাকলেও মানুষের হাত এপ (ape)-এর হাতের মত গাছের ডাল ধরা, ঝোলা ও লাফালাফি করার মত শক্ত সমর্থ নয়।

দাঁত (teeth): এপ (ape) ও মানুষের দাঁতের পাটিতে সমান সংখ্যক কৃন্তক (incisor) এবং ছেদক (canine) দাঁতসহ সর্বমোট ৩২টি দাঁত রয়েছে। তবে পূর্বপুরুষের দাঁতের মত লক্ষণ থাকলেও মানুষের কৃন্তক (incisor) এবং ছেদক (canine) দাঁতসমূহ এপ (ape) – এর দাঁতের তুলনায় বেশি শক্তপোক্ত, ধারালো ও ছুঁচালো নয়।

পায়ের আঙ্গুল (toes): ২টি পায়ে সমান সংখ্যক নখবিশিষ্ট ৫টি করে আঙ্গুল এবং পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের আকারের দিক দিয়ে এপ (ape) ও মানুষের বেশ মিল রয়েছে। সুতরাং মানুষের এবং এপ (ape) পায়ের আঙ্গুলের সাথে পূর্বপুরুষের পায়ের আঙ্গুলের মিল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

খাদ্যাভাস (food habits): মানুষ আমিষ ও নিরামিষভোজী প্রাণি; অপরদিকে এপ (ape) কেবলই নিরামিষভোজী প্রাণি। মানুষ খাদ্যের ভালমন্দ গুণাগুণ বিচার করে আহার করে; অপরদিকে এপ (ape) বনের ফলমূল যেখানে যে অবস্থায় পায় সেভাবেই আহার করে। সুতরাং মানুষের এবং এপ (ape) এর মধ্যে কেবল নিরামিষ ভোজনের দিক দিয়ে মিল থাকলেও খাদ্যাভাসের অন্যান্য দিক দিয়ে অমিল রয়েছে।

অন্যান্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য (other common features): অনুভূতিক্ষম প্রাইমেট প্রাণিসমূহ হল স্তন্যপায়ী প্রাণির শ্রেণিভূক্ত। এদের যৌন আবেগ রয়েছে, যা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাব্ধ নয়। এদের মধ্যে সব সময় যৌন অনুভূতি লক্ষ্য করা যায়। এরা এক সাথে ১টি বাচ্চা প্রসব করে। স্ত্রী-জাতীয় প্রাইমেটদের ২টি স্তন থাকে। এদের চোঁয়াল তুলনামূলক কিছুটা খর্বকায়। এদের চোখ মাথার পার্শ্বদেশে নয়; বরং মাথার সামনে উপরের দিকে শক্ত হাড়ের মাঝখানে সংস্থাপিত। পায়ের পাতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য এরা খুব সহজে বোঝা বহন করতে পারে। এদের হাত ২টিকে সহজে ও ইচ্ছে মত ঘুরাতে ও বাঁজাতে পারে। এরা হাত-পা দিয়ে যে কোন কিছু সহজে আঁকড়ে ধরতে পারে। এরা দলবদ্ধ হয়ে পরিবারের মত বসবাস করতে ও ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে।

দৈনিক ও আচরণত উপর্যুক্ত মিল ও অমিল ছাড়াও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড ও মানসিক দিক দিয়ে প্রাইমেট প্রাণি ও মানুষ পরস্পর আলাদা। অন্য সব প্রাণি মানুষের মত হাতিয়ার তৈরি এবং অর্থনৈতিক কাজ করতে পারে না। জীব জগতের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কেবল মানুষই ভাষার মাধ্যমে ভাব আদান প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ তাঁদের বুদ্ধিবলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের শ্রেষ্ঠ প্রাণি এবং অবিভাজ্য অঙ্গ। [মো: শাহীন আলম]


সহায়িকা:
১। An Evolutionary Theory of Schizophrenia: Cortical Connectivity, Metarepresentational, and The Social Brain
২। List of primates
৩। রহমান, মোহাম্মদ আরিফুর, মানবীয় ভূগোল, ২০১৭-২০১৮, কবির পাবলিকেশন্স, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৫৫ – ৫৮।
৪। প্রাইমেট


Primates and Humans Evolution 


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *