ফন থুনেনের কৃষি ভূমি ব্যবহার মডেল

মডেলের মাধ্যমে স্থানের (space) প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্ববিদদের মধ্যে ফন থুনেন (Von Thunen) অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তিনি একটি ফসল তত্ত্ব (crop theory) ও একটি ফসল নিবিড়তা তত্ত্বের (crop intensity theory) উপস্থাপন করেন। ফন থুনেন তাঁর মডেলটি উপস্থাপনের জন্য জার্মানীর অন্তর্গত রস্টক (Rostock) এর নিকটবর্তী মেকলেনবার্গ (Mecklenburg) খামার এলাকাকে সমীক্ষা এলাকা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ফন থুনেন তাঁর মডেল বা তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহৃত উপাত্তের অধিকাংশই তাঁর নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খামারের আয়-ব্যয়সহ বিস্তারিত হিসাব থেকে সংগ্রহ করে ছিলেন। মেকলেনবার্গের অভিজ্ঞতার আলোকে শহর ও গ্রামগুলোর বিশেষ বিন্যাস দেখিয়ে ফন থুনেন ১৮২৬ সালে কৃষি ভূমি ব্যবহার তত্ত্ব বা কৃষি ভূমি ব্যবহার মডেল উপস্থাপন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বাজার থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি ভূমি ব্যবহারের বিভিন্নতা কেমন হয় ও কেন হয়, তা দেখানোই ছিল ফন থুনেনের এ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রধান উদ্দেশ্য। ফন থুনেনের মৌলিক মডেল নিম্নে উল্লেখ করা হল:

১। বাজার থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে কোন বিশেষ ফসলের উৎপাদনের নিবিড়তা হ্রাস পাবে। ভূমির প্রতি একক এলাকায় বিনিয়োগের (input) পরিমাণের পরিমাপই হল উৎপাদনের নিবিড়তা। উদাহরণস্বরূপ, ব্যবহৃত অর্থ, শ্রমিক, সার, প্রভৃতি যত বেশি হবে, কৃষি উৎপাদনের নিবিড়তাও তত বেশি হবে।
২। বাজার থেকে দূরত্ব অনুসারে ভূমি ব্যবহারের ধরনের (type) বিভিন্নতা হবে। চলকের (variables) পরিমাণ হ্রাস করার জন্য ফন থুনেন কতিপয় ধারণা গ্রহণ করেন। তাঁর ধারণাগুলো হল:

(ক) কোন কৃষি এলাকার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি ‘বিচ্ছিন্ন খামার এলাকা’ (পৃথিবীর অন্যান্য অংশের সাথে যে কোন যোগসূত্রবিহীন)।
(খ) ঐ কৃষি এলাকার উদ্বৃত্ত উৎপাদনের জন্য নগর একমাত্র বাজার এবং কৃষি এলাকাটি ঐ নগরীর একমাত্র সরবরাহকারী অঞ্চল।
(গ) নগরের বাজারে কোন নির্দিষ্ট সময়ে সব কৃষক একটি বিশেষ ফসলের জন্য নির্দিষ্ট মূল্য পায়।
(ঘ) ঐ কৃষি এলাকা একই রূপ সমতল এবং এর উপরের মাটির উর্বরতা, জলবায়ু ও অন্যান্য প্রাকৃতিক নিয়ামকগুলোর তারতম্য হয় না। এ সমভূমির উপর দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে কোন প্রাকৃতিক অন্তরায় নেই।
(ঙ) চাষাবাদ যুক্তিসঙ্গতভাবে করা হয়েছে, অর্থাৎ সব কয়জন কৃষকেরই উদ্দেশ্য ছিল সর্বাধিক লাভ করা এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে তাদের পূর্ণ জ্ঞান ছিল।
(চ) সেখানে মাত্র এক ধরনের পরিবহণ (সে সময়কার ঘোড়া, গাড়ি এবং নৌকা) ব্যবস্থা থাকবে। অঞ্চলের পরিবহণ ব্যবস্থা (সড়ক ও নৌ চলাচল উপযোগী খাল উভয়ই) নিম্নমানের ছিল এবং পরিবহণ খরচ অবিরত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
(ছ) কৃষি এলাকার কেন্দ্রে অবস্থিত শহরটির নিকটবর্তী এলাকায় কোনই বিরুদ্ধ চৌম্বক শক্তি (শহর) নাই।

উপর্যুক্ত ধারণাগুলোর ভিত্তিতে ফন থুনেন প্রত্যেকটি শহর বেষ্টনকারী কতিপয় সমকেন্দ্রিক ভূমি ব্যবহার মডেল উপস্থাপন করেন। তাঁর মডেল অনুসারে –
পচনশীল, বা ভারী দ্রব্যগুলো শহরের নিকটবর্তী মণ্ডলগুলোতে উৎপাদন হবে। কম ওজন ও বড় আকৃতির অথচ বাজারে অধিক মূল্য আনয়নকারী দ্রব্যগুলো অধিকতর দূরত্ববিশিষ্ট মণ্ডলগুলোতে বিশেষত্ব লাভ করবে, কারণ সেগুলো আপেক্ষিকভাবে অধিকতর পরিবহণ খরচ সহ্য করতে সমর্থ হবে। সম্পূর্ণ মডেলটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কৃষি কর্মপ্রচেষ্টা ও ফসল পালিত পশুর সমন্বয়ে রূপ লাভ করবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

ফন থুনেনের মতানুসারে
প্রত্যেকটি বলয় সে সব কৃষি দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষত্ব লাভ করবে, যে সব দ্রব্য উৎপাদনের জন্য মন্ডল বা বলয়টি সবচেয়ে বেশি উপযোগী (চিত্র-১)।

ফন থুনেনের কৃষি ভূমি ব্যবহার মডেল
চিত্র-১: ফন থুনেনের কৃষি ভূমি ব্যবহার মডেল।

সর্বশেষে, ফন থুনেন তাঁর উন্নতমানের এ মডেলে পরিবর্তনীয় নিয়ামকের দুইটি উদাহরণ অন্তর্ভুক্ত করেছেন (চিত্র-২)। নৌ চলাচলযোগ্য নদীর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সে সময়ে পরিবহণ অধিকতর ধীর এবং স্থল পরিবহণ অপেক্ষা এ পরিবহণে মাত্র এক-দশমাংশ ব্যয় হত। এছাড়া প্রতিযোগিতামূলক বাজার কেন্দ্র হিসেবে পার্শ্ববর্তী সক্রিয় ক্ষুদ্র শহরের প্রভাব। মাত্র দুইটি পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্তি সত্ত্বেও এটি অনেক বেশি জটিল ভূমি ব্যবহার ধরন সৃষ্টি করেছে। বাস্তবতা হিসেবে যখন সব কয়টি সরলীকরণ ধারণা শিথিল করা হয়, তখন একটি জটিল ভূমি ব্যবহার ধরন আশা করা যাবে।

ফন থুনেনের বিকল্প পরিবহণ ও ছোট নগরের জন্য মণ্ডল বিকৃত হয়েছে।
চিত্র-২: ফন থুনেনের বিকল্প পরিবহণ ও ছোট নগরের জন্য মণ্ডল বা বলয় বিকৃত হয়েছে।

ফন থুনেন, প্রকৃতপক্ষে বাজার থেকে দূরত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রান্তিক অর্থনৈতিক ভাড়া (খাজনা) বা ভূমি খাজনা (land rent) প্রয়োগ করেছেন। তিনি ক্রমবর্ধমান দূরত্বের সাথে ব্যয় প্রতিস্থাপনের (cost substitution) সমস্যার ক্ষেত্রে প্রান্তিক অর্থনীতি প্রয়োগ করেছেন (ফন থুনেনের ১৮২৬, গোটেওয়াল্ড ১৯৫৯, চিশোলম ১৯৬২, হল ১৯২৬)। ফন থুনেনের মডেলে অনুঘটক (catalytic) সংক্রান্ত নিয়ামক হল পরিবহণ ব্যয় এবং একটি ‘বিচ্ছিন্ন ভূ-সম্পত্তি’ (isolated estate) এর কল্পনাই ছিল প্রধান কল্পনা।


সহায়িকা:
১। মাহমুদ, কাজী আবুল, (২০০৩), ভূগোল কম্প্রিহেনসিভ, সুজনেষু প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।
২। বাকী, আবদুল, (২০১৩), ভুবনকোষ, সুজনেষু প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।


সংকলক: মো: শাহীন আলম


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *