বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা: নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান

ভারত স্বাধীনতা আইন – পূর্ব বাংলা’র জন্ম: ১৮ জুলাই, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাসকৃত ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ ভারতবর্ষকে ভারত ও পাকিস্তান নামক ২টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে। ব্রিটিশ আমলের বাংলা প্রদেশটি ২টি ভূ-খন্ডে বিভক্ত হয়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের অংশ হয়। এভাবে ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ‘পূর্ব বাংলা’ নামক প্রদেশের জন্ম হয়। ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়।

মানচিত্র: ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে ভারত, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান)।

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত: ১৯ মার্চ, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে ঢাকার ২টি সভায় বক্তৃতাকালে বাংলা ভাষার পরিবর্তে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং জিন্নাহর বক্তব্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে।

আওয়ামী লীগের জন্ম: ১৯৪৯ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ)। ২৩ জুন, ১৯৪৯ সালে পুরান ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের, প্রায় দুই যুগ পর যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

চিত্র-১: রোজ গার্ডেন।

ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): পূর্ব পাকিস্তানে বঞ্চনা ও শোষণের অনুভূতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এখানকার জনগণ ক্রমেই এ মতে বিশ্বাসী হতে শুরু করে যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জায়গায় তাদের উপরে আরোপিত হয়েছে নতুন ধরনের আরেক উপনিবেশবাদ। এ প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়।২৭ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় এসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সাথে সাথে এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন।

চিত্র-২: আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমান  (১৯৫২ সালে)।

৩১ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এ সময় সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব পেশ করে। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

চিত্র-৩: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা (১৯৫২ সালে)।

এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়।

চিত্র-৪: ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদ।

ছাত্ররা পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করে, কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার এবং গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার,  আবুল বরকত, শফিউর রহমান, অহিউল্লাহ্ ও আবদুস সালাম শহীদ হন। ভাষা আন্দোলন থেকে এ ভূখন্ডে স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়।

চিত্র-৫: প্রভাতফেরীতে মাওলানা ভাসানীসহ শেখ মুজিবুর রহমান (২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩ সালে)।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনফলাফল (১৯৫৪): ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের সময় ভাষার প্রশ্নটি যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা নির্বাচনী ইশতিহারে স্থান পায়। ৩০৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের (বর্তমান আওয়ামী লীগ) ১৪২টি আসনসহ ২১৫টি আসনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে।

চিত্র-৬: যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান, মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের কাছে শপথ গ্রহণ করছেন (১৫ মে, ১৯৫৪ সালে )।

যুক্তফ্রন্টভুক্ত মুসলমান সদস্যবৃন্দ ২ ধারায় বিভক্ত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগের ধারাটি ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ গ্রহণ করে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৫৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ৭টি মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ও ৩ বার গভর্ণরের শাসন চালু করা হয়।

পাকিস্তানে সামরিক আইন মৌলিক গণতন্ত্র্র (১৯৫৮-১৯৬২): ৭ অক্টোবর, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করা হয়। ১৯৫৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রণীত মৌলিক গণতন্ত্র্র নামে চার স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়।১১ জানুয়ারি,  ১৯৬০ সালে সারাদেশে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আইয়ুব খান ১৩ জানুয়ারি, ১৯৬০ সালে Presidential Election and Constitutional Order, 1960 জারি করেন এবং এ অধ্যাদেশ বলে ১৪ ফেব্রুয়ারি হ্যাঁ – না ভোটের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবং সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা লাভ করেন।

১ মার্চ, ১৯৬২ সালে সংবিধান ঘোষণা করা হয় এবং তা ৮ জুন থেকে কার্যকর হয়। মৌলিক গণতন্ত্রীগণ ১ মার্চ থেকে ৮ জুনের মধ্যে দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত করেন।

৮ জুন, ১৯৬২ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন’ (১৯৬২) ও শিক্ষা দিবস’: ১৯৬২-এর সেপ্টেম্বরে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। যা ‘বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন’ নামে পরিচিত। ১৭ সেপ্টেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলিতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ প্রমুখ নিহত হন এবং আহত হয় প্রায় ২৫০ জন। এ আন্দোলনের ফলে সরকার শরীফ কমিশনের সুপারিশ স্থগিত রাখে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্র সম্প্রদায় প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবস’ রূপে পালন করে আসছে।

শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (১৯৬৩- ১৯৬৪): ১৯৬৩ এর ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইন্তেকাল করেন। তার পরবর্তী মাসেই (২৫ জানুয়ারি, ১৯৬৪) আওয়ামী লীগ পৃথকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন।

পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬৫): ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এটা স্পষ্ট হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় ছিল না। এমনকি উক্ত যুদ্ধের ১৭ দিন প্রশাসনিক দিক দিয়েও এ প্রদেশ কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ বিচিছন্ন হয়ে পড়েছিল। অতএব ১৬০০ কিলোমিটার ব্যবধানে অবস্থিত ২টি প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান যে একটা অস্বাভাবিক রাষ্ট্র ছিল, তা  আরেক বার  প্রমাণিত হল।

চিত্র-৭: পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬৫)

প্রশাসনিক, অর্থনৈতিকসামাজিক বৈষম্য: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন মহলকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।

  • ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২,০০০ কর্মকর্তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২,৯০০ জন।
  • ১৯৬৬ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১,৩৩৮ ও ৩,৭০৮ জন এবং নন-গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৬,৩১০ ও ৮২,৯৪৪ জন।
  • ১৯৬২ সালে ফরেন সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানিদের অবস্থান ছিল শতকরা ২০.৮ ভাগ।
  • ১৯৬৮ সালে প্রতিরক্ষা সার্ভিসের অফিসারের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে অনুপাত ছিল ১০ : ৯০।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় যে, ১৯৪৮-৫৫ সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৫৩০ কোটি টাকা, পূর্ব পাকিস্তানকে দেওয়া হয় মাত্র ২৪০ কোটি টাকা (১৩.৫%)।
  • ১৯৪৭-৫৫ সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয়ের মাত্র ১০% ব্যয় হয় পূর্ব পাকিস্তানে। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যেখানে উন্নয়ন খাতে খরচ হয় ১৪৯৬.২ মিলিয়ন টাকা, সেক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানেরউন্নয়নে খরচ  করা  হয় মাত্র ৫১৪.৭ মিলিয়ন টাকা।

এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্ট বৈষম্য, নির্বাচনে প্রাপ্য ফলাফল লাভে ব্যর্থতা, পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার হয়।

লাহোরে ছয় দফা কর্মসূচি (১৯৬৬): পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের নেতৃবৃন্দের এক কনভেনশনে ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা কর্মসূচি অনুমোদন করা হয়। শেখ মুজিবসহ দলের অন্য নেতৃবৃন্দ সারাদেশ জুড়ে ছয় দফার প্রচার শুরু করেন। ছয় দফার পক্ষে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি হয় এবং এতে আতঙ্কিত শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ধর পাকড় শুরু করে।

গ্রেফতার-নির্যাতন ও ১১ দফা (১৯৬৬-১৯৬৯): ৮ মে (১৯৬৬) শেখ মুজিব দেশ রক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ৭ জুন গোটা প্রদেশে হরতাল পালন করে। ১৫ জুন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হন এবং ১৬ জুন ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে এবং আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ১১ দফা দাবি ঘোষণা করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১১ দফার আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জন সমর্থন লাভ করে। ২০ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সালে ছাত্রনেতা মোঃ আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে আন্দোলন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা প্রক্টরিয়াল দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় পাক সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হলে গণআন্দোলন চরম আকার ধারণ করে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮-৬৯): পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেছিল। ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে দায়ের করা এ মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এ মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং মামলা। সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়রি, ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের উদ্ভবও ঘটে ঐ সভায়।

চিত্র-৮: আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় জেলাখানা থেকে ট্রাইবুনালে নেয়ার পথে শেখ মুজিবুর রহমান (জানুয়ারি, ১৯৬৯)।

সামরিক আইন জারি ও নির্বাচন (১৯৬৯-১৯৭০): আন্দোলন তীব্র রূপ নিলে আইয়ুব খান ২৪ মার্চ, ১৯৬৯ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এবং ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারি করেন। ক্ষমতা গ্রহণের ৮ মাস পর ২৮ নভেম্বর, ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন যে, ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর দেশে জাতীয় পরিষদের এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট হয়। কিন্তু ১২ নভেম্বর দক্ষিণ বাংলায় এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ২ লক্ষ লোক নিহত হলে উক্ত অঞ্চলের জাতীয় পরিষদের ৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ২১টি ঘূর্ণি-উপদ্রুত নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন ১ মাস পর অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে।

চিত্র-৯: ৭০-এর নির্বাচনে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে জয়লাভের পর আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর ৭ মার্চ ভাষণ (১৯৭১): ৩ মার্চ, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচি’ শীর্ষক ১টি ইশতেহার প্রচার করে। ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণায় ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন।

৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণের মাধ্যমে তিনি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ঘোষিত ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়ার প্রশ্নে ৪ টি পূর্ব শর্ত আরোপ করেন–

  ক) অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে;

  খ) অবিলম্বে সৈন্য বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে;

  গ) প্রাণহানি সম্পর্কে তদন্ত করতে হবে; এবং

  ঘ) (জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বেই) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

এ শর্তগুলো মানলেই কেবল তিনি বিবেচনা করে দেখবেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে আওয়ামী লীগ যোগদান করবে কিনা?

চিত্র-১০: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ (৭ মার্চ, ১৯৭১)।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকায় আকস্মিকভাবে গণহত্যা (১৯৭১): ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকা আসেন। এবং ২৪ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বৈঠক করেন। ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় এসে আলোচনায় যোগ দেন। ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে কালক্ষেপণ এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা সদস্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি আনয়ন করছিলেন। অবশেষে সকল প্রস্ত্ততি সম্পন্ন হলে ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সাল রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে ঢাকায় আকস্মিকভাবে গণহত্যা শুরু করে।

চিত্র-১১: ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকায় আকস্মিকভাবে গণহত্যা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১): পাকবাহিনীর আকস্মিকভাবে এ নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যা নয় মাস ধরে চলে এবং এ যুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হন।

চিত্র-১২: পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসরমান গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১)।

চিত্র-১৩: প্রতিবেশী দেশের দিকে ধাবমান বাঙ্গালী শরণার্থী (১৯৭১)।

মুজিবনগর সরকার গঠন (১৯৭১): ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন) উপ-রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলায় অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার নামেও পরিচিত) শপথ গ্রহণ করে।

চিত্র-১৪: মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ এবং প্রধান সেনাপতি (১৯৭১)।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও মহান বিজয় (বাংলাদেশের অভ্যুদয়): ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তানের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণে দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের জন্ম হয়।

চিত্র-১৫: আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী।


সহায়িকা:
১. ইতিহাস [http://bn.banglapedia.org/index.php?title=ইতিহাস]
২. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা [http://bn.banglapedia.org/index.php?title=আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা]
৩. মুক্তিযুদ্ধ [http://bn.banglapedia.org/index.php?title=মুক্তিযুদ্ধ]
৪. জাতির জনক এ্যলবাম, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট
৫.
দেশ ভাগ, ভারত – পাকিস্থান সংঘাত ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ [https://www.pranabkrdas.com/2019/04/blog-post.html]


সংকলক: মো: শাহীন আলম



																	

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *