বাংলাদেশের স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির উপর ভূমিকম্পের প্রভাব এবং প্রতিরোধ

ভূমিকা: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। এ দেশটি ২০৩৪’ উত্তর থেকে ২৬৩৮’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮০১’ পূর্ব থেকে ৯২৪১’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী প্রণালীর সংযোগস্থলের বৃহৎ ব-দ্বীপের উপরে এ দেশটি অবস্থিত। ভূ-তাত্ত্বিক গঠনের শুরু থেকেই এদেশের রয়েছে গৌরবময় নানা সাংস্কৃতিক ইতিহাস। প্রাচীন সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যিক পুরাকীর্তি এ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও কালের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। অপরদিকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙ্গন, টর্নেডো, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক দূর্যোগ এদেশের জানমালের কম বেশি ক্ষতি সাধন করে। জনগণ ও মূল্যবান সম্পদের পাশাপাশি এ দেশের স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এ প্রবন্ধটি বাংলাদেশের স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের উপর ভূমিকম্পের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রভাব মোকাবেলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা  তুলে ধরার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।

ভূমিকম্প: ভূমিকম্প সম্পর্কে আমাদের অনেকের কম বেশি ধারণা আছে। তারপরেও কিছু কথা না বললেই নয়। ভূমিকম্প এমনি একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি অঞ্চল কিংবা দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। ভূমিকম্প বলতে ভূ-পৃষ্ঠের আকস্মিক কম্পন বা আন্দোলনকে বুঝায়, যা সাধারণত ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট হঠাৎ কোন আলোড়নের বা কম্পনের ফল। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। একটি স্থানে পর্যায়ক্রমে একাধিক বারও ভূমিকম্প হতে পারে। শক্তিশালী বা প্রবল ভূমিকম্প আমরা সহজেই অনুভব করি। তবে মৃদু ভূমিকম্প আমরা অনেক সময় অনুভব করি না। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপ করা হয়।

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ইতিহাস: জানা যায়, ১৫৪৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্প সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করা হয়। তবে বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকার গত ২০০ থেকে ২৫০ বছরে সংঘটিত ভূমিকম্পের ইতিহাস জানা যায়। ১৯০০ সাল থেকে এদেশে শতাধিক ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, সংঘটিত ভূমিকম্পগুলোর অধিকাংশ আঘাত হানে ১৯৬০ সালের পরে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ভূমিকম্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা জানা যায়। এসব ভূমিকম্পের উৎসস্থল পার্শ্ববর্তী দেশে হওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এসব তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার হার বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিকট ভবিষ্যে এদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এদেশে আঘাত হানা ভূমিকম্পের ইতিহাসের চিত্র নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।

সারণি-১: বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে সংঘটিত প্রধান প্রধান ভূমিকম্প।

তারিখ/সময় মাত্রা (রিখটার স্কেল) ক্ষয়ক্ষতি
১৫৪৮ সিলেট ও চট্টগ্রামে ভীষণভাবে কম্পিত হয়। বহু স্থানে ভূ-পৃষ্ঠ দুই ভাগ হয়ে যায়। পানি ও কাদা শূন্যে উৎক্ষিপ্ত হয়।
২ এপ্রিল, ১৭৬২ ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রচন্ডভাবে অনুভূত হয়। ঢাকায়  ৫০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে। নদী ও খাল-বিলের মাছ ও অনেক গবাদিপশু মারা যায়। সীতাকুন্ড পাহাড়ে দুটি আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়।
১০ জানুয়ারী, ১৮৬৯ ৭.৫ সারাদেশ কম্পিত হয় এবং সিলেটে ক্ষয়ক্ষতি হয়। সিলেটের পূর্বাঞ্চলে গির্জার চূড়া ভেঙে পড়ে, আদালত ভবন ও সার্কিট বাংলোর দেয়ালে ফাটল ধরে, বহু নদীর তীর দেবে যায়।
১৪ জুলাই, ১৮৮৫ ৭.০ ‍সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও ময়মনসিংহে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
১২ জুন, ১৮৯৭ ৮.৭ সিলেটে মৃতের সংখ্যা ৫৪৫ জন। এদের অধিকাংশই বাড়িঘর চাপা পড়ে মারা যায়। ময়মনসিংহ সদরে আদালত ভবনসহ বহু সরকারি ভবন বিধ্বস্ত হয় এবং  জমিদারদের ব্যবহৃত শশী লজ দোতলা ভবনের খুব কমই অক্ষত ছিল। ঢাকা শহরে মালামাল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়।
৮ জুলাই, ১৯১৮ ৭.৬ ঢাকাতে জানমালের আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
২ জুলাই, ১৯৩০ ৭.১ রংপুরে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
২ জানুয়ারী, ১৯৩৪ ৮.৩ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
১৫ আগস্ট, ১৯৫০ ৮.৫ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে আতংকের সৃষ্টি হয়।
২২ নভেম্বর, ১৯৯৭ ৬.০ চট্টগ্রাম শহরে ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভবন ধ্বসে ২৩ জন প্রাণ হারায়।
জুলাই, ১৯৯৯ ৫.২ মহেশখালী দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন সমুদ্রে কম্পন অনুভূত হয়। বাড়ি-ঘরের স্থানে স্থানে ফাটলের সৃষ্টি হয়।
২৭ জুলাই, ২০০৮ ৫.১ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আতংকের সৃষ্টি হয়।
১১ আগস্ট, ২০০৯ ৭.৫ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ঢাকার মাটি কেঁপে উঠেছিল।
১০ অক্টোবর, ২০১৫ ৭.১ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।  তবে মাটি কেঁপে উঠেছিল। আতংকের সৃষ্টি হয়।
জুলাই, ১৯৯৯ ৫.২ মহেশখালী দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন সমুদ্রে কম্পন অনুভূত হয়। বাড়ি-ঘরের স্থানে স্থানে ফাটলের সৃষ্টি হয়।
২৭ জুলাই, ২০০৮ ৫.১ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আতংকের সৃষ্টি হয়।
১১ আগস্ট, ২০০৯ ৭.৫ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ঢাকার মাটি কেঁপে উঠেছিল।
১০ অক্টোবর, ২০১৫ ৭.১ বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।  তবে মাটি কেঁপে উঠেছিল। আতংকের সৃষ্টি হয়।

 

বাংলাদেশের ভূমির গঠন ও ভূমিকম্পের প্রবণতা: বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্পের জন্য প্রধানত ভূমির গাঠনিক বৈশিষ্ট্যকে দায়ী করা হয়। বাংলাদেশের উত্তরে আসামের খাসিয়া পাহাড়, জয়ন্তিয়া পাহাড় এবং হিমালয় পর্বতের পাদদেশ অবস্থিত। এসব পাহাড়-পর্বত এবং তৎসংলগ্ন ডাউকি ও সিলেট-আসাম ভূ-গাঠনিক চ্যুতির অবস্থান এদেশের উত্তর-পূর্বাংশকে ভূমিকম্প প্রবণ করেছে।

বাংলাদেশের পূর্বাংশে টারশিয়ারী যুগের পাহাড় অবস্থিত। বেলেপাথর, সেলপাথর ও কর্দম দিয়ে গঠিত এসব পাহাড় ও তৎসংলগ্ন চট্টগ্রাম-মিয়ানমার ভূ-গাঠনিক চ্যুতির অবস্থান এদেশের পূর্বাংশকে ভূমিকম্প প্রবণ করেছে।

বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং লালমাই পাহাড় প্লাইস্টোসিনকালের পুরাতন পলল দিয়ে গঠিত সোপান বা চত্বর ভূমি। আর বাকি অংশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি। সোপান ভূমি ও প্লাবন সমভূমির ভূ-তাত্ত্বিক গঠন এবং মধুপুরের ভূ-গাঠনিক চ্যুতির অবস্থান এদেশের উত্তর-মধ্য ও মধ্য-পূর্বাংশকে ভূমিকম্প প্রবণ করেছে।

বাংলাদেশ ভারত মহাসাগর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তাই এদেশকে সামুদ্রিক ভূমিকম্পপ্রবণ বলা যায় না। তবে ইদানীং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ ও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা দেখা যায়। ভূমিকম্পের ইতিহাস ও ভূ-গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশ ক্রমেই ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করতে শুরু করেছে। অধিকাংশ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেশের বাহিরে হওয়ায় বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এখনও পর্যন্ত ব্যাপক নয়। তবে ভূমিকম্পের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি বাংলাদেশের দৈনন্দিন মূল্যবান সম্পদের পাশাপাশি স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির ক্ষয়ক্ষতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে জোড়ালো করেছে।

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের অঞ্চলীকরণ: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এদেশের জন্য একটি ভূ-কম্পনীয় অঞ্চলীকরণ মানচিত্র প্রণয়ন করে। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ভূ-কম্পন সমস্যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যথাযথ সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। বিশেষজ্ঞ কমিটি একই সালে বাংলাদেশের জন্য একটি ভূ-কম্পনীয় অঞ্চলীকরণ মানচিত্র প্রস্তাব করে। ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রের বণ্টন এবং ভূ-গাঠনিক বলয়ের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে ৩টি  ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। যেমন-

অঞ্চল-১: বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে গঠিত ভূমিকম্পের সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল। এ অঞ্চল পূর্ব সিলেটের ডাউকি চ্যুতি ব্যবস্থা এবং জাফলং ঘাত, নাগা ঘাত ও ডিসাং ঘাতের সাথে উচ্চমাত্রায় সক্রিয় দক্ষিণ-পূর্ব আসামের অঞ্চলসমূহ নিয়ে গঠিত। এটি ভূমিকম্পের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

অঞ্চল-২: বাংলাদেশের লালমাই, বরেন্দ্র ও মধুপুরের প্লাইস্টোসিন অঞ্চলসহ সম্প্রসারিত পশ্চিম দিকের বলয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম  নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এটি ভূমিকম্পের মাঝারী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

অঞ্চল-৩: এ অঞ্চলটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশকে নিয়ে গঠিত এবং ভূ-কম্পনের দিক থেকে শান্ত বলয়। এটি ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

মানচিত্র-১: বাংলাদেশে ভূমিকম্পের অঞ্চলীকরণ।

ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল অনুযায়ী স্থাপত্যিক পুরাকীর্তি: ভূমিকম্পের অঞ্চলীকরণ মানচিত্রে প্রদর্শন করে স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহকে তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া যায়। ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল অনুযায়ী স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ নিচে তুলে ধরা হল।

অঞ্চল- ১: ভূমিকম্পের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পুরাকীর্তি: বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশের জেলাগুলোতে অবস্থিত স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ ভূমিকম্পের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। সিলেট জেলার শাহজালাল (র.) দরগাহ, জয়েন্তশ্বরী বাড়ি ও শ্রী চৈতন্য মন্দির; হবিগঞ্জের উচাইল মসজিদ; কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ মসজিদ ও কুতুব মসজিদ; ময়মনসিংহের শশী লজ; শেরপুরের ঘাঘরা খান বাড়ি মসজিদ এবং কুড়িগ্রামের সর্দারপাড়া জামে মসজিদ ও মেকুর্টারী শাহী মসজিদের মত গুরুত্বপূর্ণ শতাধিক স্থাপত্যিক পুরাকীর্তি ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। অঞ্চল- ১: বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ির মত গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তিটিও ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

অঞ্চল- ২: ভূমিকম্পের মাঝারী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পুরাকীর্তি: বাংলাদেশের পশ্চিম-মধ্য ও মধ্য-পূর্বাংশের জেলাগুলোতে অবস্থিত স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ ভূমিকম্পের মাঝারী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দির ও রামসাগর মন্দির; বগুড়ার মহাস্থানগড়; নওগাঁয় অবস্থিত বিশ্বঐতিহ্য পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার; নাটোরের রাণী ভবানীর রাজবাড়ি; সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র কাছারী বাড়ি; ঢাকার সংসদ ভবন, রোজগার্ডেন, আহসান মঞ্জিল, সাতগম্বুজ মসজিদ ও লালবাগ দূর্গ; নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও পানামনগর এবং কুমিল্লার শালবন বিহারসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যিক পুরাকীর্তি ভূমিকম্পের মাঝারী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে।

অঞ্চল- ৩: ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পুরাকীর্তি: বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের জেলাগুলোতে অবস্থিত স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি ও জাউদিয়া শাহী মসজিদ; ফরিদপুরের মথুরা দেউল; মাগুরার সীতারাম রাজার কীর্তিসমূহ; যশোরের এগারো শিবমন্দির, ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দির ঢিবি ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি; নড়াইলের কোটাকোল জোড় বাংলা মন্দির ও নড়াইল জমিদারদের কীর্তিসমূহ; খুলনার রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি; গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি; বাগেরহাটে অবস্থিত বিশ্বঐতিহ্য খলিফাতাবাদের ষাটগম্বুজ মসজিদ, নয়গম্বুজ মসজিদ প্রভৃতি এবং বরিশাল জেলার কসবা মসিজদ, কমলাপুর মসিজদ, মাহিলাড়া মঠ, কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ, বরিশাল কালেক্টরেট ভবনসহ বহু পুরাকীর্তি ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত।

 

মানচিত্র-২: ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল অনুযায়ী স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের অবস্থান।

স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির উপর  ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাব: ভূ-গাঠনিক বৈশিষ্ট্য এবং সাম্প্রতিক ঘন ঘন সংঘটিত ভূ-কম্পন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। উচ্চমাত্রার এবং ঘন ঘন ভূমিকম্প সংঘটিত হলে এদেশের আধুনিক অবকাঠামো ও মানুষের জীবনের ঝুঁকির পাশাপাশি গৌরবময় ইতিহাসের উপাদান বহু স্থাপত্যিক পুরাকীর্তি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির উপর  ভূমিকম্পের সম্ভাব্য যে সব প্রভাব পড়তে পারে নিচে সে সব তুলে ধরা হল।

ক) ভূমিকম্পের সময় ভূ-পৃষ্ঠে প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে শত বছরের পুরাতন, আকারে বড় ও উঁচু স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ; যেমন- প্রাসাদ বাড়ি, মসজিদ, গীর্জা, সুউচ্চ মঠ ও মন্দির, প্রশাসনিক ভবন, সেতু প্রভৃতি আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বসে (collapse) পড়তে পারে।

খ) স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত বহু কর্মচারি ও দর্শনার্থী ভূমিকম্পের সময় স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির ধ্বসের (collapse) নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাতে পারে।

গ) দুর্বল খনিজ পদার্থ দিয়ে গঠিত ভূ-পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের কিছু কিছু মাটির নিচে দেবে যেতে পারে।

ঘ) স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের যেমন- প্রাসাদ, মসজিদ, মঠ, মন্দির, প্রশাসনিক ভবন প্রভৃতির দেয়াল ও মেঝেতে ফাটলের সৃষ্টি হতে পারে। দেয়াল ও মেঝের আস্তর উঠে যেতে পারে।

ঙ) ভূমিকম্পের সময় বৈদ্যুতিক সর্ট সার্কিট কিংবা গ্যাস লাইন থেকে পুরাকীর্তিতে অগ্নিকাণ্ড হতে পারে।

চ)  শত বছরের পুরাতন সড়কপথে বড় ধরণের ফাটল ও চ্যুতির সৃষ্টি হতে পারে।

ছ) বঙ্গোপসাগরে ভূমিকম্প হলে সুনামীর কারণে উপকূলের স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। জলোচ্ছ্বাস পরবর্তী পুরাকীর্তিসমূহ নোনা, ছত্রাক ও শ্যাওলায় আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভূমিকম্পের প্রভাব মোকাবেলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা : ভূমিকম্পের কোন পূর্বাভাস ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ভূমিকম্পের প্রভাব মোকাবেলায় কতকগুলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ যথোপযুক্ত হতে পারে। ভূমিকম্পের প্রভাব মোকাবেলার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে স্থাপত্যিক পুরাকীর্তির প্রেক্ষিতে নিচে আলোচনা করা হল।

ক) প্রাসাদ, মসজিদ, গীর্জা, সুউচ্চ মঠ, মন্দির, প্রশাসনিক ভবন, সেতু, সড়ক প্রভৃতি স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহ যথাসময়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাযথ সংস্কার করার মাধ্যমে টেকসই করে রাখা প্রয়োজন।

খ) বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা দুর্বল স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহে সংস্কার করার পাশাপাশি মজবুত সহায়ক ঠেস দিয়ে যে কোন প্রকারের ধ্বস থেকে রক্ষা করা।

গ) বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের নিচে দীর্ঘ সময় কর্মচারি নিয়োজিত করে না রাখা। দর্শনার্থীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পুরাকীর্তিসমূহে প্রবেশ সংরক্ষিত রাখা। সম্ভব হলে ঝুঁকিপূর্ণ পুরাকীর্তিসমূহ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা।

ঘ) ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি দপ্তরে সংরক্ষণ করা।

ঙ) পুরাকীর্তিসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত কর্মচারি ও দর্শনার্থীদের মাঝে ভূমিকম্প সম্পর্কে গণসচেতনা বৃদ্ধি করা।

চ) স্থাপত্যিক পুরাকীর্তিসমূহের দেয়াল ও মেঝের ফাটল ও আস্তর মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী দপ্তরে সংরক্ষণ করা।

ছ) ভূমিকম্পের সময় পুরাকীর্তিতে সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ফায়ার ফাইটিংয়ের  হালকা যন্ত্রপাতি দপ্তরে সংরক্ষণ করা।

জ) ভূমিকম্পের সময় ও পরবর্তী উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্পর্কে নিয়োজিত কর্মচারিদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।

উপসংহার: পূর্বাভাস ব্যবস্থা আবিষ্কৃত না হওয়ায় ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই। অতীতকাল থেকেই বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞদের আভাসের কথা মাথায় রেখে যার যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। একটি প্রবাদে আছে, রোগমুক্ত হওয়ার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ উত্তম। তাই ভূমিকম্পের ফলে বাংলাদেশের পুরাকীর্তিসমূহের উপর সৃষ্ট দূর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন।


সহায়িকা:
১. Choudhury, Dr. Jamilur R., Bangladesh – Seismicity of Bangladesh, February 1993, Bangkok.
২. Ali, Md. Hossain, Earthquake Database and Seismic Zoning Bangladesh, February 1998, Bangkok.
৩. Islam, Raihanul, Islam, Md. Nazrul and Islam, M. Nazrul, Earthquake Risks In Bangladesh: Causes, 
    Vulnerability,Preparedness And Strategies For Mitigation, December 2016, ARPN Journal Of Earth Sciences.
৪.আহমেদ, ড. সৈয়দ শাহজাহান ও হক, জিয়াউল,  ভুগোল প্রথম পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, ২০১৭, কাজল ব্রাদার্স লি,. ঢাকা।
৫. ভূগোল ও পরিবেশ, নবম ও দশম শ্রেণি, ২০১৪, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।
৬. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
৭. বাংলাপিডিয়া (http://bn.banglapedia.org/)
৮.  বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (http://www.gsb.gov.bd/)
৯. বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (www.bmd.gov.bd/)


লেখক: মো. শাহীন আলম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।


For PDF Version


[Keywords: Earthquake Impacts on Architectural Heritages in Bangladesh, Preventive Measures to Reduce Earthquake Impacts on Architectural Heritages, Vumikamper Provab, Bhumikampa.]


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *