বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের মুসলিম পুরাকীর্তি: পটুয়াখালীর আজাইল খা মসজিদ

অবস্থান: পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলাধীন মজিদবাড়িয়া নামক গ্রামে আজাইল খা মসজিদ (mosque) অবস্থিত। ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের পটুয়াখালী সদর চৌমাথা থেকে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে পায়রা নদীর তীরের খেয়াঘাট। এ খেয়াঘাট পার হয়ে পাকা সড়ক পথে প্রায় ৬ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে সুবিদখালী নামক বাজার অবস্থিত। এ বাজার থেকে পায়রা নদীর পশ্চিম তীর দিয়ে চলে যাওয়া পাকা সড়ক পথে এবং কিছু দূর আঁকাবাঁকা মেটে রাস্তায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে মজিদবাড়িয়া গ্রাম। পায়রা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী এ গ্রামে প্রাচীন আজাইল খা মসজিদটি দেখা যায়। এ মসজিদটি মজিদবাড়িয়া মসজিদ নামেও সুপরিচিত। এ মসজিদের লাগোয়া দক্ষিণ পাশে ১ টি পাকা কবরস্থান ও ১ টি পুকুর এবং উত্তর পাশে আরও ১ টি পুকুর রয়েছে।

মানচিত্র: আজাইল খা মসজিদের ( মজিদবাড়িয়া মসজিদ ) অবস্থান।

ঐতিহাসিক পটভূমি: মসজিদটিতে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়, বাংলার সুলতান রুকুন উদ্দীন বরবক শাহের রাজত্বকালে ( ১৪৫৯ – ১৪৭৬ অব্দে ) খান-উল মোয়াজ্জাম আজাইল খা কর্তৃক এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। আরো জানা যায়, মসজিদটিতে প্রাপ্ত এ শিলালিপিটি বর্তমানে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৮৬০ অব্দে ব্রিটিশ সরকারের কমিশনার R. H. Reili এ মসজিদটি আবিষ্কার করেন। ১৯১৩ অব্দে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করে। অন্যান্য পুরাকীর্তির নির্মাণকাল বিচারে পটুয়াখালী জেলার এ মসজিদটি প্রাচীন বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ খ্যাত বরিশালের অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যকীর্তি। ১৫ শতাব্দীর এ মসজিদটি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত এবং তত্ত্বাবধানে রয়েছে ।

    চিত্র: মসজিদের অভ্যন্তরের পশ্চিম দেয়াল ও তিনটি মিহরাব।

স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য: এক গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মাণ করা হয়। দেয়ালসহ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৫ মিটার ও প্রস্থ ১০.৫ মিটার। ২ মিটার চওড়া দেয়ালবিশিষ্ট এ মসজিদের সামনে একটি অপ্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। পাতলা ইট দিয়ে নির্মিত এ মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ৩ টি প্রবেশপথ রয়েছে। দেয়ালের মাঝখানের প্রবেশপথটি আকারে বড়। এ প্রবেশপথগুলো দিয়ে মসজিদের বারান্দাটিতে প্রবেশ করা যায়। বারান্দার উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ১ টি করে মোট ২ টি প্রবেশপথ রয়েছে। এ বারান্দা থেকে মসজিদের পশ্চিম দিকের মূল কক্ষে প্রবেশের জন্য আরো ৩ টি প্রবেশপথ রয়েছে। ৬.৫ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বর্গাকারের এ মূল কক্ষের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ৩ টি করে মোট ৬ টি প্রবেশপথ রয়েছে। বর্তমানে মসজিদের পূর্ব দেয়ালের মাঝখানের বড় প্রবেশপথটি রেখে বাকি সব প্রবেশপথ লোহার গ্রিল দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মসজিদটির প্রতিটি প্রবেশপথের খিলানগুলো শিখরাকার বা গোথিক (gothic)।

চিত্র:  মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের মাঝখানের বড় মিহরাব।

মসজিদের অভ্যন্তরের পশ্চিম দেয়ালে ৩ টি মিহরাব রয়েছে। বহুভাজের খিলান (multi-foil arch) নকশাবিশিষ্ট এ মিহরাবগুলোতে পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক রয়েছে। দেয়ালের মাঝখানের মিহরাবটি আকারে বড়। মসজিদের অভ্যন্তরের দেয়ালগুলো লতাপাতা ও ফুলের অলংকৃত পোড়ামাটির ফলকে সজ্জিত রয়েছে। মসজিদটির বাহির দেয়ালে ৬ টি অষ্টভূজাকার অলংকৃত বুরুজ (tower) রয়েছে। বুরুজগুলোর উপরের দিকে অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে এ বুরুজগুলোর নিচের অংশের প্রায় ১ – ১.৫ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। মসজিদটির সমতলবিশিষ্ট ছাদের একমাত্র গম্বুজটি অর্ধ বৃত্তাকার।

চিত্র:  মসজিদের মিহরাবের পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক ।

এ মসজিদের গম্বুজ, প্রবেশপথ ও বুরুজসহ সামগ্রিক নির্মাণশৈলীর সাথে বাগেরহাটের মধ্যযুগীয় খলিফাতাবাদ শহরে নির্মিত মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও বরিশালের গৌরনদীর কসবা মসজিদের স্থাপত্যশৈলী সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

Click for English Version


তথ্যসূত্র:
১. হোসেন, মো: মোশারফ, উৎসের সন্ধানে চন্দ্রদ্বীপ বাকলা বরিশাল, (২০১০), ঢাকা, পৃষ্ঠা ৮০-৮১।
২. আহম্মেদ, সিরাজ উদ্দিন, বরিশাল বিভাগের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ভাস্কর প্রকাশনী, (২০০৩), বরিশাল-ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৭৪-১৭৫।


লেখক: মো. শাহীন আলম


[Keyword: মজিদবাড়িয়া মসজিদ, মসজিদবাড়িয়া মসজিদ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বরিশাল বিভাগের পুরাকীর্তি, পটুয়াখালীর প্রত্নসম্পদ, বাংলাদেশের স্থাপত্যিক ঐতিহ্য, সুলতানী আমলের পুরাকীর্তি, মির্জাগঞ্জ, Historical Heritage, Antiquity of Barisal Division, Ancient Building of Patuakhali, Architectural Heritage of Bangladesh, Cultural Heritage of Coastal Area to Bay of Bengal, Sultani Monument, Archaeological heritage of the Sultanate period, Majidbariya Mosque, Majidbariya Masjid, Masjid Bariya Masjid, Ajail Kha Mosque]


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *