বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ: ঘূর্ণিঝড় | Atmospheric Disturbance: Cyclone

পৃথিবীপৃষ্ঠের সর্বত্র সমানভাবে সূর্যের কিরণ পতিত হয় না। সূর্যকিরণের তারতম্যের জন্য পৃথিবীপৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুর তাপ ও চাপের হঠাৎ তারতম্য ঘটে। বায়ুর তাপ ও চাপের এরূপ তারতম্যের কারণে বায়ুমণ্ডলে অনিয়মিত বা অস্বাভাবিক বায়ু প্রবাহিত হয়। ফলস্বরূপ বায়ুমণ্ডলে কতিপয় বায়বীয় গোলযোগের বা সমস্যার সৃষ্টি হয়। বায়ুমণ্ডলের সৃষ্ট শক্তিশালী ও প্রলয়ঙ্করী গোলযোগ বা সমস্যাসমূহের মধ্যে একটি হল ঘূর্ণিঝড়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত গভীর সমুদ্রে সৃষ্ট নিম্নচাপজনিত ঘূর্ণিঝড়সমূহ উপকূলবর্তী স্থলভাগের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।


ঘূর্ণিঝড় (cyclone): নিম্নচাপের কারণে বায়ু যখন প্রচণ্ড গতিবেগে ঘুরতে ঘুরতে প্রবাহিত হয় তখন তাকে ঘূর্ণিঝড় বলে। ‘ঘূর্ণিঝড়’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল ‘Cyclone’। এ প্রতিশব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Kyklos’ থেকে এসেছে। Kyklos শব্দের মানে হল ‘সাপের কুন্ডলী’। উপগ্রহ চিত্রে ঘূর্ণিঝড় দেখতে প্রায় সাপের কুন্ডলীর মত। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত ‘The Sailor’s Horn-book for the Law of Storms’ নামক সামুদ্রিক দুর্যোগ বিষয়ক বইয়ে আবহাওয়াবিদ  হেনরী পিডিংটন প্রথমবারের মত ‘Cyclone’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ঘূর্ণিঝড়ের বায়ু পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতমুখী এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার মুখী হয়ে  প্রবাহিত হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণ (causes of cyclone): যে সব প্রধান কারণে সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়, সেগুলো হল:
ক) প্রখর সূর্যকিরণের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের কোন স্থান বিশেষ করে সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পানিতে অত্যধিক তাপমাত্রা বিরাজ করে। আর টানা ৩ দিন যাবৎ এ তাপমাত্রা ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বিরাজ করলে।
খ) সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর তাপ ও চাপের হঠাৎ হৃাস ও বৃদ্ধি হলে। এবং
গ) উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে দ্রুতবেগে বায়ু প্রবাহিত হলে।

ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি (origin of cyclone): প্রখর সূর্যকিরণ গভীর সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পানিকে অত্যধিক উত্তপ্ত করে। অত্যধিক উত্তাপে বায়ুর চাপ হঠাৎ কমে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে নিম্নচাপের চারদিকে তখন তুলনামূলক শীতল বায়ুবিশিষ্ট উচ্চচাপ বিরাজ করে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের উত্তপ্ত বায়ু হালকা হয়ে দ্রুত ঊর্ধ্বগামী হয়। তখন নিম্নচাপ কেন্দ্রে বায়ুর শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এ শূন্যস্থান পূরণের জন্য উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বায়ুর প্রবাহ দ্রুতবেগে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। ফলে নিম্নচাপের কেন্দ্রে ঘূর্ণায়মান প্রচন্ড বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। নিম্নচাপ কেন্দ্রের এ ঘূর্ণায়মান বায়ু হালকা হয়ে আবার  দ্রুত ঊর্ধ্বগামী হয়। নিম্নচাপের ঘূর্ণায়মান প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহের বেগ ঘণ্টায় ৬৩ কিলোমিটারের বেশি হলে তখন তাকে ঘূর্ণিঝড় (cyclone) বলা হয়। ঘূর্ণিঝড় সাধারণত একস্থানে স্থির থাকে না। ঘুরতে ঘুরতে বায়ুপ্রবাহের পথ অনুসরণ করে অনেক দূর চলে যায়। গভীর সমুদ্রে সৃষ্ট এ জাতীয় ঝড় উপকূলের স্থলভাগে প্রায়ই আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবাহিত এ বায়ুতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। এ জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু ঊর্ধ্ব আকাশে উঠলে মেঘের সৃষ্টি হয়। এ মেঘ থেকে নিম্নচাপের কেন্দ্রের বাহিরে হালকা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়। বায়ুর তাপ কমে শীতল না হওয়া পর্যন্ত এরূপ ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণি বায়ুপ্রবাহ চলন্ত থাকে।

ঘূর্ণিঝড়ের চোখ (eye of the cyclone): নিম্নচাপের কেন্দ্রই হল ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র। উষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের প্রায় ১৬ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যে বায়ুর কোন আনুভূমিক প্রবাহ থাকে না। ফলে এ অংশের বায়ু ঘুরতে ঘুরতে উপরের দিকে উঠে যায়। তখন ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটি দেখতে প্রায়ই শান্ত এবং মেঘ মুক্ত থাকে। উপগ্রহে ‍তোলা চিত্রে কেন্দ্রটিকে চোখের মত দেখা যায়। আর এ কারণে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটিকে ঘূর্ণিঝড়ের চোখ বলা হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের আঞ্চলিক নাম (regional name of cyclone): ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক নামে পরিচিত। নিম্নের ছকে ঘূর্ণিঝড়ের আঞ্চলিক নামসমূহ তুলে ধরা হল:

অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের আঞ্চলিক নাম
চীন ও জাপান সাগরে টাইফুন
অস্ট্রেলিয়ায় উইলি উইলিজ
পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে হ্যারিকেন
দক্ষিণ এশিয়ায় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়

তাছাড়া, জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা প্রতি বছর সংঘটিত একেকটি ঘূর্ণিঝড়কে একেকটি নাম দেয়ার নিয়ম চালু করেছে। এ কারণে অতিসম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়সমূহের নাম দেয়া হয়েছে সিডর, আইলা, মহাসেন, তিতলি প্রভৃতি।


সহায়িকা:
১. হু., মু. মকবুল, জলবায়ু বিজ্ঞান: পরিবেশীয় ও ফলিত দৃষ্টিভঙ্গি, ২০০৬, আলীগড় লাইব্রেরী, ঢাকা, পৃ. ৯৭-১০০;
২. আ., ড. সৈ. শাহজাহান ও হক, জিয়াউল, ভূগোল, প্রথম পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, ২০১৭, কাজল ব্রা. লি., ঢাকা,পৃ. ১৬৯-১৭০;
৩. বিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণি, ২০১৬, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, পৃ. ১৩৯-১৪০;
৪. www.britannica.com/science/tropical-cyclone;
৫. বাকী, আবদুল, ভুবনকোষ, ২০১৩, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ৯৪।


লেখক: মো. শাহীন আলম


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *