বায়ুমণ্ডল এবং এর স্তর বিন্যাস I Atmosphere & Its Stratification

বায়ুমণ্ডল [Atmosphere] হল পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের উপর বেষ্টিত এবং অদৃশ্য বায়ু বা বাতাসের স্তর, যা পৃথিবী তার মধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে ধরে রেখেছে। বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদান দিয়ে গঠিত এ বায়ুমণ্ডল পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিরাজ করে। প্রাণী জগতের জীবন রক্ষাকারী বায়ুর এ বিশাল মণ্ডলটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে স্তর স্তরে একের পর এক সজ্জিত রয়েছে। বায়ুমন্ডলের এ স্তরগুলো পর্যায়ক্রমে উপরের দিকে হালকা। উপরের স্তরগুলো নিচের স্তরগুলোর উপর নিয়মিত চাপ দিতে থাকে। আর এ কারণেই বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরগুলোর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। বিজ্ঞানীগণ গঠন উপাদানের তারতম্যের উপর ভিত্তি করে বায়ুমন্ডলকে প্রধানত ২ টি মণ্ডলে ভাগ করেন। যথা-

ক) সমমণ্ডল (homo-sphere) ও
খ) বিষমমণ্ডল (hetero-sphere) ।

আবার এ দুটি মণ্ডলকে উচ্চতা, তাপ ও চাপের তারতম্যের উপর ভিত্তি করে আরো ৫ টি তাপ ভিত্তিক মণ্ডলে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হল-

ক.১. ট্রপোমণ্ডল (troposphere)
ক.২. স্ট্রাটোমণ্ডল (stratosphere)
ক.৩. মেসোমণ্ডল (mesosphere)
খ.৪. তাপমণ্ডল (thermosphere) ও
খ.৫. এক্সোমণ্ডল (exosphere) ।

চিত্র: বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস।

বায়ুমন্ডলের এ স্তরগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কোন সীমারেখা নেই। একটি স্তর ধীরে ধীরে অপর একটি স্তরের সাথে মিশে গেছে। নিচে এসব স্তর সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

ক) সমমন্ডল (homo-sphere)

[ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বায়ুমন্ডলের উপরের দিকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুর গ্যাসীয় উপাদানগুলো প্রায়  সমান অনুপাতে থাকে, তাই ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত এ স্তরকে সমমন্ডল বলে।]

ক.১. ট্রপোমন্ডল (troposphere):  এটি ভূ-পৃষ্ঠের নিকটবর্তী এবং প্রাণী জগতের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসীয় মন্ডল। এ মন্ডলটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১৩ কি.মি. উচ্চতায় ট্রপোবিরতির (tropopause) সাথে মিশে আছে। এ মন্ডলটির উচ্চতা মেরুদ্বয়ে প্রায় ১১ কি.মি. এবং নিরক্ষরেখায় প্রায় ১৮ কি.মি.। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ মন্ডলের তাপমাত্রা কমতে থাকে, যা প্রতি কিলোমিটার উচ্চতায় প্রায় ৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস হারে কমে। এ মন্ডলের বায়ুর চাপ ও ঘনত্ব উভয়েই বেশি। তবে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাপ ও ঘনত্ব উভয়েই হৃাস পায়। আবহাওয়া ও  জলবায়ুর  সাথে সম্পর্কিত মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক ঘটনাসমূহ এ স্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ মন্ডলটিকে ঘনমণ্ডলও বলা হয়ে থাকে।
ক.১.১. ট্রপোবিরতি (tropopause): ট্রপোমণ্ডলের উপরের শেষ অংশের নাম ট্রপোবিরতি। এটি প্রায় ১ কিলোমিটার পর্যন্ত বিরাজ করে। ট্রপোমন্ডলের মত এ স্তরে বায়ুর তেমন কোন আলোড়ন নেই। এটি ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডলের মধ্যবর্তী সীমানা নির্দেশ করে।

ক.২. স্ট্রাটোমন্ডল (stratosphere): ট্রপোবিরতির (tropopause) উপরের স্তরটি স্ট্রাটোমন্ডল। এ মন্ডলটি বায়ুমন্ডলের উপরের দিকে প্রায় ১৩ থেকে ৫০ কি.মি. পর্যন্ত বিরাজ করে। এ মন্ডলটিতে বায়ুর তাপ ও চাপের তেমন কোন তারতম্য হয় না। বায়ু অত্যন্ত হালকা, সমান শীতল এবং বায়ুর উর্ধ্ব ও নিম্ন গতি নেই, কেবল সমান্তরাল গতি রয়েছে। তাই এ মন্ডলটিকে শান্তমণ্ডলও বলা হয়ে থাকে। এ মন্ডলটির উপরের দিকে ওজন (ozone) নামক ঘনীভূত গ্যাসের একটি বলয় রয়েছে। এ ওজন বলয় সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ শোষণ করে নেয়। যার ফলে পৃথিবীর প্রাণীজগৎ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। ওজন বলয় সূর্যের তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করার কারণে এ মন্ডলটির উপরের দিকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ক.২.১. স্ট্রাটোবিরতি (stratopause): স্ট্রাটোমণ্ডলের উপরের শেষ অংশের নাম স্ট্রাটোবিরতি। এটি স্ট্রাটোমণ্ডল ও মেসোমণ্ডলের মধ্যবর্তী সীমানা নির্দেশ করে।

ক.৩. মেসোমণ্ডল (mesosphere): স্ট্রাটোবিরতির (stratopause) উপরের স্তরটি হল মেসোমণ্ডল। এ মন্ডলটি বায়ুমন্ডলের উপরের দিকে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিরাজ করে। এ মন্ডলটির নিচের অংশে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত তাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়। এরপর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা মধ্যে তাপ দ্রুত হ্রাস পায়।
ক.৩.১. মেসোবিরতি (mesopause): মেসোমণ্ডলের উপরের শেষ অংশের নাম মেসোবিরতি। এটি মেসোমণ্ডল ও তাপমণ্ডলের মধ্যবর্তী সীমানা নির্দেশ করে।

খ) বিষমমন্ডল (hetero-sphere)

[ বায়ুমন্ডলের উপরের দিকে প্রায় ৮০ থেকে ১০,০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুর গ্যাসীয় উপাদানগুলো সমান অনুপাতে থাকে না, তাই ৮০ থেকে ১০,০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত এ স্তরকে বিষমমন্ডল বলে। ]

খ.৪. তাপমণ্ডল (thermosphere): মেসোবিরতি (mesopause) উপরের স্তরটি হল তাপমণ্ডল। এ মণ্ডলটি প্রায় ৮০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিরাজ করে। এ মণ্ডলে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুর চাপ খুবই কম। এ মণ্ডলের সবচেয়ে উপরে বায়ুর তাপমাত্রা স্থির থাকে। তাপমাত্রার এ স্থির অংশকে সমতাপ অঞ্চলও (equal heat zone) বলা হয়ে থাকে। এ মণ্ডলের তাপমাত্রা সাধারণত ১,০০০ ডিগ্রী থেকে ১,৬০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে মধ্যে বিরাজ করে। তাপমণ্ডলের নিচের অংশকে আয়নমণ্ডল বলে।

খ.৫. এক্সোমণ্ডল (exosphere): প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের পরবর্তী স্তর এক্সোমণ্ডল নামে পরিচিত। এ মণ্ডলটি হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং কিছু ভারী অণু, যেমন- নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এ মণ্ডলটির প্রায় ১,১০০ কিলোমিটার উচ্চতার পরবর্তী অংশে যথেষ্ট বেশি তাপ এবং যথেষ্ট কম ঘনত্ব থাকে। ফলে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র থেকে অণু ও পরমাণু বেরিয়ে যাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ মণ্ডলটি প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিরাজ করে।


[লেখক: মো.শাহীন আলম]


[Keywords: Heterosphere, Homosphere, Bayumondal, হেটারোস্ফেয়ার, হোমোস্ফেয়ার]


One Comment

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *