একটি মূর্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: প্রেক্ষিত পার্বত্য বান্দরবানের রাজগুরু বৌদ্ধবিহারের বুদ্ধ মূর্তি

মূর্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এ প্রবন্ধে আলোচ্য মূর্তিটি বাংলাদেশের পার্বত্য বান্দরবান জেলার রাজাগুরু বৌদ্ধ বিহারে অধিষ্ঠিত একটি বুদ্ধ মূর্তি। এ বুদ্ধ মূর্তিটি ফাঁপা ছাঁচ (hollow cast) পদ্ধতিতে ব্রোঞ্জ (?) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পদ্মপাপড়ির অংলকরণবিশিষ্ট দুই স্তরের পাদপীঠের (footrest) উপরে ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় বুদ্ধ মূর্তিটি উপবিস্ট। মূর্তিটির মাথায় পরিহিত প্রথাগত উষ্ণীষ বা শিরোভূষণ (coronet) রয়েছে। উষ্ণীষের উপরে ছোট অলংকৃত শিখর বা শীর্ষ রয়েছে। অলংকৃত শীর্ষটির মাঝখানের ক্ষুদ্রাকার গর্ত দেখে ধারণা করা যায়, এ গর্তটিতে কোন রত্নখচিত ছিল। মূর্তিটির কানের উভয় লতিকা নিচের দিকে প্রলম্বিত। পাতলা সংঘাতি মূর্তিটির বাম কাঁধ থেকে যথাক্রমে বুকের ও পেটের উপর দিয়ে ঝুলে এসে বাম হাতের কব্জি পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তি

চিত্র: বান্দরবান জেলার রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তি।

রাজগুরু বৌদ্ধবিহার পরিদর্শনকালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব ক্যশৈহ্লা আলোচ্য বুদ্ধ মূর্তিটি সম্পর্কে তথ্য প্রদানকালে উল্লেখ করেন যে, ‘আরাকানের রাজা চন্দ্র সূর্য-এর আমলে একজন ঋষি মুনি এ বুদ্ধের মূর্তিটি নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে মূর্তিটি এ ঋষি মুনির কাছ থেকে ৯ম বোমাং রাজা সংগ্রহ করে রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত করেন।

১৬তম বোমাংগ্রী উ ক্যসাইন পু চৌধুরীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ অনুযায়ী বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সরকারের ডিসি, এসপি ছাড়াও মানুষদের কাছে আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন; তিনি হলেন বোমাং রাজা। সাক হ্ন ঞো বোমাংগ্রী ছিলেন ৯ম বোমাং রাজা। তার দায়িত্বকাল ছিল ১৮৭৫-১৯০১ অব্দ।

জনাব ক্যশৈহ্লা-এর প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, ঋষি মুনির কাছ থেকে ৯ম বোমাং রাজা সংগ্রহ করে রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত করেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৫-১৯০১ অব্দ সাক হ্ন ঞো বোমাংগ্রী নামক ৯ম বোমাং রাজা ছিলেন। সূতরাং এ তথ্য সূত্র ধরে বলা যায় যে, বান্দবানের রাজগুরু বৌদ্ধবিহারের আলোচ্য বুদ্ধ মূর্তিটি প্রায় ১৪০/১৪৫ বছর আগে অধিষ্ঠিত হয়ে থাকতে পারে।

Sylvia Fraser-Lu ‘Bronze Buddha in earth touching mudra, seated on stepped throne. From Myohaung. Circa 14th-15th century” ক্যাপশনটি উল্লেখ করে তাঁর লিখিত Buddha Images from Burma Part II: Bronze and Related Metals, Arts of Asia March/April 1981 issue শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধ মূর্তির নিম্নের আলোকচিত্রটি যোগ করেন।

Buddha Images from Burma Part II: Bronze

[Bronze Buddha in earth touching mudra, seated on stepped throne. From Myohaung. Circa 14th-15th century]

চিত্র: Buddha Images from Burma Part II: Bronze and Related Metals নামক প্রবন্ধে Sylvia Fraser-Lu এর সংযুক্ত ব্রোঞ্জের বুদ্ধ মূর্তি (সাদাকালো) [সময়: আনুমানিক ১৪-১৫ শতাব্দী] ।

রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তির (রঙ্গিন) আলোকচিত্র ও Sylvia Fraser-Lu এর Buddha Images from Burma Part II: Bronze and Related Metals নামক প্রবন্ধে সংযুক্ত ব্রোঞ্জের বুদ্ধ মূর্তির (সাদাকালো) আলোকচিত্রের আপেক্ষিক বিশ্লেষণ (comparative analysis) করলে নিম্নরূপ চিত্র পাওয়া যায়।

বুদ্ধ মূর্তির (সাদাকালো) আলোকচিত্রে আপেক্ষিক বিশ্লেষণ

উপর্যুক্ত আলোকচিত্রদ্বয় পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পাদদেশের বা পাদপীঠের (footrest)  উলম্ব (vertical) ভাজের ভিন্নতা ব্যতীত উভয় বুদ্ধমূর্তির অলংকৃত শিখরযুক্ত উষ্ণীষ, কানের লতিকা, হাত ও পায়ের ভাজসহ দৈহিক গঠন, পদ্ম নকসা এবং নির্মাণশৈলীর সাথে হুবহু মিল রয়েছে। আলোকচিত্রদ্বয়ের আপেক্ষিক বিশ্লেষণে (comparative analysis) বলা যায় যে, উভয় মূর্তি আনুমানিক ১৪ – ১৫ শতাব্দীর বুদ্ধ মূর্তির গঠনশৈলী দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং আলোকচিত্রের আপেক্ষিক বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বান্দবানের রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত মূর্তিটি আনুমানিক ১৪ – ১৫ শতাব্দীর কোন এক সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাজবংশের শাসনামলে বার্মায় (বর্তমান মায়ানমারে) বুদ্ধ মূর্তি তৈরিতে ধর্ম ভিত্তিক একাধিক শিল্পধারার উদ্ভব হয়েছিল। বাগান বা প্যাগান কালপর্ব (১০৪৪ থেকে ১৩৪৭ অব্দ) হল এদের অন্যতম। এ কালপর্বটিকে বার্মার বৌদ্ধ শিল্প ধারার স্বর্ণ যুগও বলা হয়ে থাকে। প্যাগান কালপর্বে প্রচুর বৌদ্ধ মন্দির ও বিহার নির্মাণের সাথে সাথে বুদ্ধ মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।

পরিবর্তনযোগ্য (alterable) এবং অবিকল অনুকৃতিযোগ্য (replicable) ধাতু দিয়ে নির্মিত যে কোন অস্থাবর (movable) প্রত্নবস্তু আপেক্ষিক বিশ্লেষণে নির্মাণকাল নির্ণয় করা হলেও প্রকৃত/প্রামাণিক (authentic) নির্মাণকাল সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তিটি ব্রোঞ্জ (?) ধাতু দিয়ে নির্মিত, পরিবর্তনযোগ্য (alterable) এবং অবিকল অনুকৃতিযোগ্য (replicable) একটি অস্থাবর (movable) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

তথাপিও উপর্যুক্ত তথ্য উপাত্ত এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে মূৰ্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের পার্বত্য বান্দরবান জেলার রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তিটি মায়ানমারের বাগান বা প্যাগান [Pagan] কালপর্বের শিল্পরীতির প্রভাবে নির্মিত হয়েছে। সুতরাং আলোকচিত্রের মাধ্যমে মূৰ্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে এবং বুদ্ধ মূর্তির শিল্পরীতির উপর ভিত্তি করে ধারণা করা যায় যে, বান্দরবান জেলার রাজগুরু বৌদ্ধবিহারে অধিষ্ঠিত বুদ্ধ মূর্তিটি বাগান বা প্যাগান [Pagan] কালপর্বের শিল্পরীতিতে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে যে কোন এক সময়ে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। [মো: শাহীন আলম]


সহায়িকা:
১। ১৬তম বোমাংগ্রী উ ক্যসাইন প্রু চৌধুরীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ।
২। Fraser-Lu , Sylvia, Buddha Images from Burma Part II: Bronze and Related Metals, Arts of Asia March/April 1981 issue
৩। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।
৪। বান্দরবান জেলার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজগুরু বৌদ্ধবিহার।


 

Add a Comment

Your email address will not be published.