প্রাচীন ভূগোল বিকাশে ইরাটোসথেনিসের অবদান

ইরাটোসথেনিস (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৬ – খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৪) ছিলেন একজন গ্রিক গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ, কবি, জ্যোতির্বিদ, এবং সঙ্গীত তত্ত্ববিদ। তিনি মহাবিশ্বে বা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে (universe) পৃথিবীর অবস্থান এবং পৃথিবীর আকৃতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, পৃথিবী গোলাকার এবং পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। তিনি আরও মনে করতেন, আকাশের জ্যোতির্মণ্ডল নিজ গতিতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় পৃথিবীকে একবার ঘুরে আসে। জ্যোতির্মণ্ডলের এসব জ্যোতিষ্ক ছাড়াও সূর্য এবং চাঁদের নিজস্ব আলাদা গতি রয়েছে। সূর্যের গতিপথের বক্রতা সম্পর্কে সে সময়কার গ্রীকদের জানা ছিল। এছাড়া গ্রীক জ্যোতির্বিদদের কাছে পৃথিবীর বৃহত্তর বৃত্ত নিরক্ষরেখা এবং তার সমান্তরাল ‘ক্রান্তি’ নামে পরিচিত ক্ষুদ্রতর বৃত্তদ্বয় সুপরিচিত ছিল। ইরাটোসথেনিস বা তার সমসাময়িক জ্যোতির্বিদ বা ভূগোলবিদদের মনে ভূগোলক (globe) সম্পর্কে যে ধারণা ছিল, তা প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়ের জ্যোতির্বিদ বা ভূগোলবিদদের ধারণা থেকে আলাদা নয়। নিচে ইরাটোসথেনিসের প্রাচীন ভূগোল বিকাশে বিভিন্ন অবদানের বিষয়ে আলেচনা করা হলো।

মানচিত্রাঙ্কন পদ্ধতিতে ইরাটোসথেনিসের অবদান : ইরাটোসথেনিসের সবচেয়ে বড় অবদান হল ভূগোলকের উপর অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখার অবস্থান নির্দেশ এবং পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কন। ইরাটোসথেনিস ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত স্যাক্রাম শৈলান্তরীপ থেকে হারকিউলিসের স্তম্ভগুলোর মধ্যদিয়ে ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য বরাবর রোডস দ্বীপ পর্যন্ত একটি অক্ষরেখা অংকন করেন। তিনি অক্ষরেখাটি রোডস দ্বীপ থেকে ইসাস (issius) উপসাগর পর্যন্ত অংকন করে দেখান। তিনি এ অক্ষরেখার সাথে সমকোণে একটি দ্রাঘিমারেখা কল্পনা করেছিলেন। তিনি মনে করেন, এ রেখা আলেকজান্দ্রিয়া এবং রোডস দ্বীপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। ইরাটোসথেনিস উভয় স্থান একই দ্রাঘিমারেখায় অবস্থান দেখালোও প্রকৃতপক্ষে রোড্স নগরী আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ১.৫ ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় অবস্থিত। 

সমকোণে অঙ্কিত এ ২টি রেখা ছাড়াও ইরাটোসথেনিসের অঙ্কিত মানচিত্রে আরও ৯টি অক্ষরেখা এবং ১০টি দ্রাঘিমারেখা রয়েছে। এসবের মধ্যে থুলের (thule) অক্ষরেখা, বোরি স্থেনেসের (bory sthenes) অক্ষরেখা, বাইজানটিয়ামের (byzantium) অক্ষরেখা, ট্যামারাম (tamarum) অন্তরীপের অক্ষরেখা, সায়েনের (syene) অক্ষরেখা, মেরোর (Meroe) অক্ষরেখা এবং সে সময়ের পরিচিত পৃথিবীর দক্ষিণ প্রাপ্ত দিয়ে আঁকা অক্ষরেখা উল্লেখযোগ্য এবং হারকিউলিসের স্তম্ভের দ্রাঘিমারেখা, কার্থেজের দ্রাঘিমারেখা, নীলের দ্রাঘিমারেখা, থ্রাপসাকাসের দ্রাঘিমারেখা, পাইলা কাসপিয়ানের দ্রাঘিমারেখা, সিন্দু মোহনার দ্রাঘিমা, গঙ্গা মোহনার দ্রাঘিমা এবং কোনিয়াসি অন্তরীপের দ্রাঘিমা উল্লেখযোগ্য। ইরাটোসথেনিসের মানচিত্র অভিক্ষেপের বৈশিষ্ট্য হল এর অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো সমদূরবর্তী নয়।

গাণিতিক ভূগোলে ইরাটোসথেনিসের অবদান : ইরাটোসথেনিস গাণিতিক ভূগোলের জনক হিসেবে সুপরিচিত। ভূগোলে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ নির্ণয় অন্যতম। তিনিই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর আগে অনেকেই পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করে ছিলেন, কিন্তু তা সঠিক ছিল না বলে জানা যায়।

তবে ইরাটোসথেনিস গাণিতিক ভূগোলে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন, তা তত্ত্বীয় দিক থেকে যথেষ্ট দৃঢ় ছিল। বর্তমান সময়কার জ্যোতির্বিদগণ যে পদ্ধতি অবলম্বন করে, ইরাটোসথেনিসের পদ্ধতি নীতির দিক থেকে ঠিক তেমনই ছিল। উচ্চ মিশরের শুরু কর্কট ক্রান্তির ঠিক নিচে এবং নিম্ন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া ও উচ্চ মিশরের সায়েনে (বর্তমান আসওয়ান) একই মধ্য রেখায় এবং একটি অপরটি থেকে ৫,০০০ ষ্টেডিয়া দূরে অবস্থিত বলে কল্পনা করে আলেকজান্দ্রিয়ার অক্ষরেখা নির্ধারণের জন্য ২১ জুলাই সূর্যঘড়ির কাটার (Gnomon) দন্ডের ছায়া পরিমাপ করেন। এভাবেই ঠিক করেন যে, উত্তরের মধ্যবর্তী মধ্যরেখার চাপ (arc) ভূগোলকের বৃহৎ বৃত্তের ১/৫০ ভাগ। ইরাটোসথেনিস সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পৃথিবীর পরিধি অর্থাৎ পৃথিবীর বৃহৎ বৃত্তের পরিমাপ ২৫০,০০০ ষ্টেডিয়া।

বাসযোগ্য পৃথিবী সম্পর্কে ইরাটোসথেনিসের ধারণা : গ্রীক ভূগোলবিদগণ মনে করতেন যে, পরিচিত বা বাসযোগ্য পৃথিবী ভূপৃষ্ঠের একটি সীমিত নির্দিষ্ট অংশ অবস্থিত। অন্যান্য গ্রীক ভূগোলবিদদের মত ইরাটোসথেনিসও মনে করতেন, পৃথিবীর বসতি অঞ্চল উত্তর গোলার্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং যা এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে অবস্থিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পৃথিবীর দক্ষিণ অঞ্চলে অত্যন্ত গরম অনুভূত হয় বলে সে অঞ্চল অবনতি অঞ্চল বা বসতিহীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। 

বর্ণনামূলক ভূগোলে ইরাটোসথেনিসের অবদান : পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কিত ইরাটোসথেনিসের আলোচনাসমূহ বর্ণনামূলক ভূগোলে পরিণত হয়েছে। ২২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আঁকা ইরাটোসথেনিসের মানচিত্রে অঙ্কিত ইউকসিন সাগর (কৃষ্ণসাগর) এবং মেয়োটিস সাগরের (আজোভ সাগর) আকৃতি ও অবস্থান এর পূর্বে অন্যান্য গ্রীক ভূগোলবিদদের অঙ্কিত আকৃতি ও অবস্থানের তুলনায় অনেকটা সঠিক হয়েছে। তিনি কাম্পিয়ান সাগরকে উত্তর সাগরের সাথে যুক্ত করেন এবং এর প্রকৃত আকৃতিও পাওয়া যায় না। তবে তাঁর আলোচনায় আরব উপসাগর (লোহিত সাগর) এবং পারস্য উপসাগরের আকৃতি প্রায় সঠিক হয়েছে। তিনি এ ২টি উপসাগরকে ইরিথরিয়ান (ভারত মহাসাগর) মহাসাগরের উপসাগর হিসেবে দেখিয়েছেন। লিবিয়ার (বর্তমান আফ্রিকার) পশ্চিমে অবস্থিত মহাসাগরকে তিনি আটলান্টিক মহাসাগর নামে উল্লেখ করেন। গ্রীকদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত ভূমধ্যসাগর এবং তার অংশ হিসেবে বিবেচিত মাজোর (সিদরা) উপসাগর, সার্দোয়াম সাগর, তিরহেনাস সাগর, আড্রিয়াটিক সাগর এবং এজিয়ান সাগরের আকৃতি ও অবস্থান ইরাটোসথেনিসের বর্ণনায় অনেকটা সঠিক হয়েছে।

ইরাটোসথেনিসই সর্বপ্রথম আরব উপদ্বীপ সম্পর্কে  সঠিক ধারণা প্রদান করেন। তিনি আরব অঞ্চল সম্পর্কে  নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেন। আরবের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাঁর সাধারণ বর্ণনা খুব সঠিক ছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তর ভাগ এবং উত্তরাংশ বালুকাময় অনুর্বর মরুভূমি। সেখানে কেবল কিছু খেজুর গাছ এবং কাঁটাবিশিষ্ট বাবলা জাতীয় গাছ জন্মে। এ অংশে কোন পানির প্রবাহ নেই, তবে বেশ কিছু সংখ্যক কূপ রয়েছে।

লিবিয়ার (বর্তমান আফ্রিকার) আকার ও আয়তন সম্পর্কিত তথ্যে হেরোডোটাস এবং ইরাটোসথেনিসের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পাওয়া যায়। বর্তমান সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, প্রভৃতি অঞ্চল সে সময় গ্রীকদের কাছে দারুচিনি অঞ্চল (cinnamomifera region) নামে পরিচিত ছিল। পূর্ব অন্তরীপ থেকে স্থলভাগের দক্ষিণপ্রাপ্ত পশ্চিম দিকে বেঁকে লিবিয়ার শেষ দক্ষিণ সীমা নির্দেশ করেছে। [সংকলিত]

Add a Comment

Your email address will not be published.