মাটি গঠনে যৌগিক প্রক্রিয়া | Soil Formation

মাটি হল শিলাকণা (খনিজ পদার্থ), জৈব পদার্থ, বায়ু, পানি, প্রভৃতির একটি যৌগিক প্রক্রিয়ার মিশ্রণ। অবক্ষয়ের মাধ্যমে ভূত্বকের শিলা চূর্ণ বিচূর্ণ (crushed) হয়ে ছোট ছোট শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। এরপর এ শিলাখণ্ডগুলো হৃতমানকরণ (humification), অনুস্রবণ/চুয়ীসরণ (percolation), সঞ্চায়ন (accumulation), পডজলীকরণ (podzolization), চুনীকরণ (calcification), ল্যাটারীকরণ (laterization), লবণাক্তকরণ (salinization), ক্ষারীয়করণ (alkalization) প্রভৃতি যৌগিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মাটিতে পরিণত হয়। নিচে মাটি গঠনে বিভিন্ন ধরনের যৌগিক প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেয়া হল :

(ক) হৃতমানকরণ (humification): আর্দ্র কিংবা উপআর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে উদ্ভিজ এবং প্রাণীজ উৎস থেকে আগত জৈব পদার্থ পঁচে মাটির উপরের স্তরে হিউমাস (humus) বা জৈব সার সৃষ্টি হয়। সাধারণত আর্দ্র জলবায়ুতে মাটির জৈব পদার্থকে ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিশ্লেষণ করে। হিউমাস স্তরের গুণাবলী নির্ভর করে সাধরণত – ভূপৃষ্ঠের উপরে পতিত জৈব পদার্থের ধরন, বিয়োজিত হওয়ার ধরন, বিয়োজিত পদার্থের যৌগ সংশ্লেষণের ধরন, প্রভৃতি বিষয়ের উপর। যেহেতু উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, সেহেতু মাটির হিউমাস স্তরে প্রচুর জৈব ক্ষার (acid) সৃষ্টি হয়। এ জৈব ক্ষার মাটির উপরের স্তরের খনিজ পদার্থকে দ্রবীভূত করে এবং চুয়ান প্রক্রিয়ায় মাটির উপরের স্তর থেকে নিচের স্তরের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে মাটির মধ্যে উপর থেকে নিচের দিকে ভিন্ন ভিন্ন স্তরের সৃষ্টি হয়। মাটি গঠনের এরূপ প্রক্রিয়াকে হৃতমানকরণ (humification) বলে।

(খ) চুয়ীসরণ/অনুস্রবণ (percolation): মাটির এক স্তর থেকে অপর স্তরে বিভিন্ন পদার্থ অনুস্রবণের মাধ্যমে চলে যাওয়াকে চুয়ীসরণ বলে। সাধারণত মাটির উপরের স্তর থেকে নিচের স্তরের দিকে বিভিন্ন পদার্থের অনুস্রবণ হয়। তবে পৃথিবীর যে সব অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের চেয়ে পানির বাষ্পীভবনের পরিমাণ বেশি থাকে, সে সব অঞ্চলে মাটির  নিচের স্তর থেকে উপরের স্তরের দিকে চুয়ীসরণ হয়। মাটির যে স্তর থেকে বিভিন্ন পদার্থের অপচয় হয়, সে স্তরটিকে চূয়ীক্ষেপ (eluvial) বা পরিশ্রুত স্তর বলে। চুয়ানো পদার্থগুলো মাটির যে স্তরে জমা হয়, সে স্তরকে সঞ্চিত (Illuvial) স্তর বলে। সঞ্চিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মাটির গঠনে সঞ্চায়ন বলে। মাটির বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী পানির পরিমাণ এবং পানি চলাচলের প্রকৃতির উপর মাটির গঠন  এবং মাটির পার্শ্বচিত্রের (soil profile) স্তর বিন্যাস নির্ভর করে। 

(গ) পডজলীকরণ (podzolization): বিভিন্ন উপায়ে মাটিতে জৈব পদার্থ সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত প্রচুর জৈব পদার্থ পঁচে মাটিতে বিভিন্ন প্রকারের এসিড উৎপন্ন হয়। এসব জৈব এসিডের প্রভাবে মাটির উপরের স্তরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাটি কণা, হিউমাস (humus), লোহা (iron) এবং এলুমিনিয়াম যৌগগুলো চুয়ীসরণ (percolation) প্রক্রিয়ায় মাটির নিচের স্তরে সঞ্চিত হয়। এর ফলে নিচের স্তরের মাটি কালচে ছাই বর্ণ ধারণ করে। মাটি গঠনের এ প্রক্রিয়াটিকে পডজলীকরণ বা পডজলীভবন বলে। আর পডজলীকরণের বা পডজলীভবনের মাধ্যমে পডজল মাটি গঠিত হয়।

(ঘ) লেটারীকরণ (laterization): অধিক তাপমাত্রা এবং অধিক বৃষ্টিপাতবিশিষ্ট অঞ্চলে জৈব পদার্থ দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মাটির ক্ষার জাতীয় উপাদান বিযুক্ত (isolated) করে। জৈব পদার্থ বিয়োজনের সময় মাটিতে প্রচুর জৈব এসিড উৎপন্ন হয়। তবে মাটিতে ক্ষার জাতীয় উপাদান থাকায় বিক্রিয়া প্রায় নিরপেক্ষ হয়ে থাকে। নিরপেক্ষ বিক্রিয়ার ফলে মাটির সিলিকা প্রধান কাদা (clay) দ্রবীভূত হয়ে মাটির উপরের স্তর থেকে নিচের স্তরে চলে যায় এবং উপরের স্তরে কেবল লোহা (Fe) ও এলুমিনিয়াম (Al) থাকে। মাটি গঠনের এ প্রক্রিয়াটিকে লেটারীকরণ বা লেটারীভবন বলে। লোহার প্রাধান্য থাকায় মাটি লালচে বর্ণের হয়। লালচে বর্ণের এ মাটিকে ল্যাটারাইট মাটি (laterite soil) বলে। পৃথিবীর উষ্ণ এবং স্বল্প উষ্ণ অঞ্চলে ল্যাটারাইট মাটির অস্তিত্ব বেশি দেখা যায়।

(ঙ) লবণাক্তকরণ (salinization): সাধারণত বৃষ্টিপাতের পানি চুয়ান প্রক্রিয়ায় বা অনুস্রবণের মাধ্যমে  মাটির উপরের স্তর থেকে নিচের স্তরের দিকে যায়। তবে অধিক উত্তাপ এবং বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫০ সেন্টিমিটারের চেয়ে কম বিশিষ্ট অঞ্চলে চুয়ান প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ পানি মাটির নিচের স্তরের দিকে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির নিচের স্তর থেকে উপরের দিকে উঠে আসে।  ভূগর্ভের পানি উপরে উঠে আসার সময় লবণ (Nacl), সোডিয়াম সালফেট (Na2so4) প্রভৃতি দ্রবীভূত লবণ মাটির উপরের স্তরে উঠে আসে। এর ফলে ঐ সব অঞ্চলে পানি সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার পরে মাটির উপরে লবণের স্তর পড়ে থাকে। আর এ প্রক্রিয়ায় লবণাক্ত মাটির (salty soil) সৃষ্টি হয়। সুতরাং লবণাক্ত মাটি গঠনের এরূপ প্রক্রিয়াকে মাটি লবণাক্তকরণ (salinization) বলা হয়।

(চ) চুনীকরণ (calcification): পৃথিবীর ভূ-ত্বকে বিভিন্ন প্রকারের চুনাপাথর, ডেলোমাইট, শামুক, ঝিনুক প্রভৃতি চুন বা চুনজাতীয় পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে। প্রাকৃতিক এবং ভূতাত্ত্বিক বিভিন্ন উৎস থেকে এসব চুন বা  চুনজাতীয় পদার্থ প্রাকৃতিক শক্তিসহ বিভিন্ন নিয়ামকের প্রভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। এর ফলে মাটিতে চুন বা ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। মাটিতে চুন বা  চুনজাতীয় পদার্থ সংযুক্ত হওয়ার এ প্রক্রিয়াটিকে মাটি চুনীকরণ  বা চুনবিশিষ্ট করণ বলে। চুন বা ক্যালসিয়ামবিশিষ্ট মাটিকে চুনামাটি বলে। সাধারণত যে কোন স্থানের জলবায়ু মাটির চুনীকরণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। বিশেষ করে শুষ্ক জলবায়ুবিশিষ্ট অঞ্চলে চুনবিশিষ্ট ক্ষার মাটির পরিমাণ বেশি দেখা যায়।

(ছ) রুবিকরণ (rubification): ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় সাভানা অঞ্চলে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ঐ সব অঞ্চলে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি চুয়ান প্রক্রিয়ায় মাটি থেকে কার্বনেট (Na2CO3) অপসারিত করে এবং কাদায় চুয়ীসরণ হয়। যার ফলে এ মাটি উজ্জ্বল লাল বর্ণ ধারণ করে। রাসায়নিকভাবে মাটি গঠনের এ প্রক্রিয়াকে রুবিকরণ বা রুবিবিশিষ্ট করণ (rubification) বলে। [মো: শাহীন আলম]


সহায়িকা: 
১. মাহমুদ. কাজী আবুল, ভূগোল কম্প্রিহেনসিভ, ২০০৩, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা।
২. বাকী, আবদুল, ভুবনকোষ,২০১৩, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. মাটির সংজ্ঞা | Definition of Soil


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *