চাখারের শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘর | বরিশাল

অবস্থান: শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘরটি বরিশাল জেলাধীন বানারীপাড়া উপজেলার চাখার গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গড়িয়ারপাড় নামক বাসস্ট্যান্ড থেকে স্বরূপকাঠিগামী পাকা সড়ক ধরে প্রায় ২২ কি.মি. পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে গুয়াচিত্রা নামক বাসস্ট্যান্ড। এ বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৩ কি.মি. উত্তর দিকে পাকা সড়কের মাথায় চাখার গ্রাম। এ গ্রামের বাজার সংলগ্ন পূর্ব-পশ্চিমগামী পাকা সড়কের পাশে একতলাবিশিষ্ট দক্ষিণমুখী এ জাদুঘরটির অবস্থিত।

মানচিত্র: শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘরের অবস্থান।

জাদুঘরের গ্যালারী বিন্যাস: পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট এ জাদুঘরে রয়েছে ৩টি প্রদর্শনী গ্যালারী, ১টি দাপ্তরিক কক্ষ ও ১টি বিশ্রাম কক্ষ। এ জাদুঘর ভবনের পশ্চিমাংশে দর্শনার্থীদের জন্য শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া জাদুঘরের সামনে রয়েছে ১টি সুন্দর ফুলের বাগান।

জাদুঘরের  বাম দিকের প্রথম প্রদর্শনী গ্যালারীতে শের-ই- বাংলার ১টি বিশাল প্রতিকৃতি; তাঁর জীবনকর্মের বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বংশলতিকা; তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্র এবং তাঁর নিজের হাতে লেখা চিঠিপত্র।

মাঝের গ্যালারীতে রয়েছে শের-ই-বাংলার ব্যবহার্য চেয়ার-টেবিল, হাতের লাঠি, পানি পানের পাত্র, বিভিন্ন সময়ে শের-ই-বাংলার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মানপত্র, তাঁর সময়ে চাখারে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলোকচিত্র এবং তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে জাদুঘরে দেয়া ১টি কুমিরের খোলস।

এছাড়া, ডান দিকের শেষ গ্যালারীটিতে রয়েছে শের-ই-বাংলার ব্যবহার্য আরাম কেদারা, কাঠের খাট, তোষক, আলনা, ড্রেসিং টেবিল ও টুল।


জাদুঘরের প্রবেশমূল্য (টিকিট): জাদুঘরের প্রধান গেটের পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার। দেশী প্রাপ্তবয়স্ক জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশমুল্য ৫ টাকা। তবে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য টিকেট ফ্রী। সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীর জন্য প্রবেশমূল্য ২৫ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা করে। 

জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সূচি: গ্রীষ্মকালে (১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) সকাল ১০:০০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। দুপুর ১:০০টা থেকে ১.৩০টা পর্যন্ত আধা ঘণ্টার জন্য বিরতি। সোমবার বেলা  ২.৩০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে।

শীতকালে (১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত) সকাল ৯:০০টা থেকে বিকেল ৫:০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালেও দুপুর ১:০০টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত বিরতি। সোমবার বেলা ১.৩০টা থেকে থেকে বিকেল ৫:০০টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের জন্য ১২:৩০টা থেকে ২:৩০টা পর্যন্ত বিরতি থাকে। প্রতি রবিবার জাদুঘরের সাপ্তাহিক ছুটি। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে নির্দেশ মোতাবেক সরকারি যে কোন  বিশেষ দিবসে জাদুঘর খোলা থাকে ।

ঐতিহাসিক পটভূমি: বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ২৬ অক্টোবর, ১৮৭৩ সালে বরিশালের রাজাপুর (বর্তমানে ঝালকাঠি জেলাধীন) থানার সাতুরিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জম্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা- কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এবং মাতা- বেগম সৈয়দুন্নেছা। কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ আইন পেশা গ্রহণ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে চাখারে জমিদারী ও তালুক ক্রয় করেন এবং প্রচুর সম্পত্তির মালিক হন। পিতা ওয়াজেদের মত শের-ই-বাংলা আইন পেশা গ্রহণ করেন। তিনি কলিকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করলেও পিতার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে বরিশালে আগমন করেন। তিনি বরিশালে আইন ব্যবসার পাশাপাশি চাখারের জমিদারী ও তালুক দেখাশুনা করেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময় তিনি চাখারে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে কাটান। তাছাড়া তিনি রাজনৈতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেন। এ পদসমূহের মধ্যে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার মেয়র, ১৯৩৭ – ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৫৬ – ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অন্যতম। যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ২৭ এপ্রিল, ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে শেষ নিঃশ্বাসের ত্যাগ করেন ।

শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘর উপমহাদেশের অবিসংবাদিত মহান নেতা এ.কে. ফজলুল হক-এর স্মৃতি রক্ষার জন্য ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাদুঘরটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের  অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে।


Click for English Version


[লেখক: মো. শাহীন আলম ]


 

Add a Comment

Your email address will not be published.