সমুদ্র তলদেশের ভূ-প্রকৃতি | Topography of the Ocean Basin

সাগর ও মহাসাগরসমূহ মহাদেশগুলোকে এমনভাবে ঘিরে রয়েছে, মহাদেশগুলো যেন এক একটি দ্বীপ। আবার এসব সাগর ও মহাসাগরের তলদেশের ভূমিরূপ অধিক বৈচিত্র্যময়। মহাদেশগুলো সমুদ্র তলদেশ থেকে খাড়া হয়ে উঠে আসেনি এবং সমুদ্রের তটরেখা মহাদেশের প্রান্তসীমাও নয়। মহাদেশের উপকূল ভাগের কিছু অংশ ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে সমুদ্র তলদেশে নেমে গেছে। সাগর ও মহাসাগরগুলোর পরস্পরের মধ্যে আয়তন ও গভীরতা পার্থক্যের কারণে এগুলোর তলদেশের ভূ প্রকৃতির যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।

সমুদ্র তলদেশের ভূ-প্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ: সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানের গভীরতার তারতম্যের উপরে ভিত্তি করে সমুদ্র তলদেশের ভূ-প্রকৃতিকে মূলত: চারটি শ্রেণিতে ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-

১. মহীসোপান (continental shelf)

২. মহীঢাল (continental slope)

৩. গভীর সমুদ্রের সমভূমি (deep sea plains) এবং

৪. গভীর সমুদ্রখাত (deep sea trench)।

উপর্যুক্ত এ চার শ্রেণি ছাড়াও সমুদ্রবিজ্ঞানীগণ সমুদ্রের তলদেশকে নিম্নরূপ ভূ-প্রকৃতিতে বিভক্ত করে থাকেন। যেমন-

১. তটদেশীয় মণ্ডল (littoral zone)

২. ঝিনুক মণ্ডল (neritic zone)

৩. মহীসোপান (continental shelf)

৪. মহীঢাল (continental slope)

৫. মহীউত্থান (continental rise)

৬. গভীর সমুদ্রের সমভূমি (deep sea plains/abyssal plain)

৭. গভীর সমুদ্রখাত (deep sea trench)

৮. সামুদ্রিক শৈলশিরা (submarine ridge) এবং

৯. সামুদ্রিক দ্বীপ (ocean island)।

১. তটদেশীয় মণ্ডল (littoral zone): জোয়ারের সময় সমুদ্রের তীরবর্তী ভূমিতে পানি ক্রমে উন্নত হয়, আবার ভাঁটার সময় সে স্থান থেকে পানি ক্রমে অবনত হয়। পানির এ উন্নীত স্থান থেকে অবনত স্থান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটিকে তটদেশীয় মণ্ডল (littoral zone) বলে। এটি মূলত: মহীসোপানের উপকূলীয় ঢালের উপরের অংশ।

২. ঝিনুক মণ্ডল (neritic zone): Neritos অর্থ ঝিনুক। গ্রিক শব্দ Neritos থেকে Neritic শব্দের উৎপত্তি। ভাঁটার সময়ের পানিরেখা থেকে শুরু করে মহীসোপানের উপরের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে ঝিনুক মণ্ডল (neritic zone)। ঝিনুক মণ্ডলে ঢেউয়ের কাজ এবং পলির বিন্যাস সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। এটি মূলত: মহীসোপানের উপকূলীয় ঢালের নিচের অংশ।

৩. মহীসোপান (continental shelf): মহাদেশগুলোর বাহিরের দিকের সমুদ্রের ক্রমনিম্ন ও অগভীর নিমজ্জিত অঞ্চলকে মহীসোপান বলে। সাধারণত মহীসোপান প্রায় ১° কৌণিকভাবে ঢালু হয়ে সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত হয়। মহীসোপানের সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১৮০ মিটার (প্রায় ১০০ ফ্যাদম বা ৬০০ ফুট)। মহীসোপানকে মহাদেশীয় ভূ-ভাগের সর্বশেষ প্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহাদেশীয় ভূভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো দ্বারা পলি, কাকর, পাথর, বালি প্রভৃতি মহীসোপানের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সমুদ্রে পতিত হয়। মহীসোপান মূলত মহাদেশীয় ভূ-ভাগেরই অংশ, কারণ এটি প্রধানত মহাদেশীয় শিলা বা সিয়াল [SiAl] দিয়ে গঠিত।

৪. মহীঢাল (continental slope): মহীসোপানের শেষ প্রান্তসীমা থেকে খাড়াভাবে যে ঢাল গভীর সমুদ্রে নেমে যায় তাকে মহীঢাল বলে। মহীঢাল  কখনও ২ থেকে ৫ ডিগ্রী কৌণিকভাবে, কখনও সম্পূর্ণ খাড়া অবস্থায় সমুদ্রে নেমে যায়। প্রকৃতপক্ষে মহীঢালই হল মহাদেশগুলোর শেষ প্রান্তসীমা। মহীঢালের গভীরতা ১৮০মিটার থেকে ৩,৬০০মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। মহীঢাল কেবল সঞ্চিত জলজ জন্তুর দেহাবশেষ ও জলজ উদ্ভিদের ধ্বংসাবশেষ বা জীবাশ্ম প্রভৃতি নিয়ে গঠিত হয়ে থাকে। 

৫. মহীউত্থান (continental rise): মহিউত্থান মহিঢালের শেষ প্রান্তসীমা থেকে শুরু হয়। মহিউত্থানের নতিমাত্রা ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রীর মধ্যে। মহিউত্থানের গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত গভীর সমুদ্রের সমভূমির সাথে মিলিত হয়।

৬. গভীর সমুদ্রের সমভূমি (deep sea plains/abyssal plain): মহিউত্থানের শেষ প্রান্তসীমা থেকে সমুদ্রের তলদেশে যে বিস্তৃত সমতল ভূমি অবস্থিত, তাকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে। গভীর সমুদ্রের এ সমভূমির গভীরতা ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার। গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রের এ সমভূমি সম্পূর্ণ সমতল নয়। কারণ গভীর সমুদ্রের সমভূমির উপরে জলমগ্ন অনেক মালভূমি, পাহাড়, পর্বত অবস্থান করে। 

৭. গভীর সমুদ্রখাত (deep sea trench/trough): গভীর সমুদ্রের সমভূমির মাঝে কোথাও কোথাও গভীর গর্ত দেখা যায়। আর এসব গর্তকে গভীর সমুদ্রখাত বলে। গভীর সমুদ্রখাতগুলো সাধারণতঃ সমুদ্রতলের একপ্রান্তে এবং আগ্নিয়গিরি ও ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এ সমুদ্রখাতগুলেঅ অধিক প্রশস্থ না হলেও খাড়া ঢালবিশিষ্ট। এগুলোর গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ (sea level) থেকে প্রায় ৫,৪০০ মিটারের অধিক হয়ে থাকে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে অবস্থিত ম্যারিয়ানা খাত (Mariana Trough) সর্বাপেক্ষা গভীরতম খাত। যার গভীরতা ১০,৯৬০ মিটার।

৮. সামুদ্রিক শৈলশিরা (submarine ridge): গভীর সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত পর্বতশ্রেণীর মত উঁচু, সুদীর্ঘ ও প্রশস্ত ভূ-ভাগকে সামুদ্রিক শৈলশিরা বলে। কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত ও সুদীর্ঘ শৈলশিলাগুলো পর্বতশ্রেণীর মত সমুদ্র তলে অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ- আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিলা’র নাম উল্লেখ করা যায়।

৯. সামুদ্রিক দ্বীপ (ocean island): সামুদ্রিক শৈলশিরার শীর্ষ ভূ-ভাগ এবং গভীর সমুদ্র সমতল থেকে উত্থিত আগ্নেয়গিরির শীর্ষ ভূ-ভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠে সামুদ্রিক দ্বীপ হিসেবে অবস্থান করে। এগুলোর পার্শ্বদেশ যথেষ্ট খাড়াই হয়ে থাকে। প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে এরূপ সামুদ্রিক দ্বীপ দেখা যায়।


তথ্যসূত্র:
১. রহমান, মোহাম্মদ আরিফুর, প্রাকৃতিক ভূগোল, ২০১৭-২০১৮, কবির পাবলিকেশন্স, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৫০৯-৫১৩।
২. Singh, Savindra, Physical Geography, 2009, Prayag Pustak Bhawan, Allahabad, Page 331-345.


সংকলক: মো: শাহীন আলম


 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *