সাংস্কৃতিক উৎসস্থল, ব্যাপন ও সাংস্কৃতিক জগৎ

সাংস্কৃতিক উৎসস্থল [Cultural Hearth] বলতে সাধারণত যে কোন সাংস্কৃতিক জগৎ গড়ে উঠার মূল কেন্দ্রকে বুঝায়। একটি সাংস্কৃতিক উৎসস্থল বা কালচারাল হার্থ হল একটি “হার্টল্যান্ড” (heartland), একটি উৎস এলাকা, উদ্ভাবন কেন্দ্র, একটি প্রধান সংস্কৃতি উৎপত্তির স্থান। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানে কোন একটি মানব গোষ্ঠী তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক ভূ-দৃশ্য (cultural landscape) গড়ে তোলে। ভৌগোলিক স্থানের যে বিন্দু বা কেন্দ্র থেকে সর্বপ্রথম সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক ভূ-দৃশ্য গড়ে তোলা হয় বা উৎপত্তি হয়, সে বিন্দু বা কেন্দ্রটিকে সাংস্কৃতিক উৎসস্থল বলে। আমেরিকান ভূগোলবিদ Carl O. Sauer সাংস্কৃতিক ভূ-দৃশ্যের উৎপত্তির স্থানকে সাংস্কৃতিক উৎসস্থল (cultural hearth) বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মত অনুসারে, সাংস্কৃতিক উৎসস্থল হল এক একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সাংস্কৃতিক জগৎ গড়ে উঠার প্রাণ কেন্দ্র। উদাহরণস্বরূপ – পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সাংস্কৃতিক উৎসস্থল হিসেবে মেসোআমেরিকা (mesoamerica), আন্দিজ আমেরিকা (andean america), মেসোপটেমিয়া (mesopotamia), সিন্দু নদী উপত্যকা (indus river valley), গঙ্গা নদী উপত্যকা (ganges river valley), পশ্চিম আফ্রিকা (west africa), নীলনদ উপত্যকা (nile river valley), হুয়াং নদী উপত্যকা (huang river valley), প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যায়। মূলতঃ সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাঅবস্থানগুলো হল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সাংস্কৃতিক উৎসস্থল। 

সাংস্কৃতিক উৎসস্থল

সাংস্কৃতিক ব্যাপন [Cultural Diffusion] বলতে সাধারণত সাংস্কৃতিক উৎসস্থল থেকে সংস্কৃতির নানা উপাদান চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়াকে বুঝায়। অর্থাৎ একটি সংস্কৃতি যখন কোন একটি স্থানে উদ্ভব হয়, তখন ঐ সংস্কৃতিটির বিভিন্ন উপাদান অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে; সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের এরূপ ছড়িয়ে পড়ার অবস্থাটিকেই সাংস্কৃতিক ব্যাপন বলা হয়। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত নানা উপায়ে মানুষ তাদের সংস্কৃতি একে অপরের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে চলেছে। বর্তমান যুগে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে কোন কিছুকে আর কুক্ষিগত করে রাখা যায় না। মানুষ খুব স্বল্প সময়ে এবং খুব সহজে সংস্কৃতি এক স্থান বা দেশ থেকে অন্য স্থান বা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারে।  

সাংস্কৃতিক জগৎ [Cultural Realm] বলতে সাধারণত মানব গোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রলক্ষণের সমরূপতা বিশিষ্ট একটি অঞ্চলকে বুঝায়। এখানে, ভাষা, কৃষ্টি, জীবনধারা, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, রীতি-নীতি, খেলাধুলা, ধর্ম, জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রভৃতিকে সংস্কৃতির প্রলক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ একটি ভৌগোলিক পরিসরে মানব গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রলক্ষণের মধ্যে সমরূপতা থাকে। প্রলক্ষণের সমরূপতা বিশিষ্ট এক একটি অঞ্চলকে মূলতঃ এক একটি সাংস্কৃতিক জগৎ বলা হয়। যেমন – ভারতীয় সাংস্কৃতিক জগৎ, ইসলামীয় সাংস্কৃতিক জগৎ, আফ্রিকান সাংস্কৃতিক জগৎ, ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক জগৎ, আরবীয় সাংস্কৃতিক জগৎ, প্রভৃতি। তবে  সাংস্কৃতিক জগতের এ ধরনের বিভাজন রেখা টানা একটি জটিল বিষয় এবং কোন চূড়ান্ত বিষয় নয়। এ ধরনের বিভাজন নিয়ে সাংস্কৃতিক গবেষকদের মাঝে মতপার্থক্যও রয়েছে। [মো: শাহীন আলম]


Cultural Hearth, Cultural Diffusion ‍and Cultural Realm


সহায়িকা:
১. বাকী, আবদুল, ২০১৩, ভুবনকোষ, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা।
২. Culture A body of beliefs, material traits, and social forms that together constitute the distinct tradition of a group


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *