সামুদ্রিক তলানী। Marine Sediment

সামুদ্রিক অবক্ষেপ

সামুদ্রিক তলানী [Marine Sediment] বলতে সাধারণত সমুদ্রের জল বা পানি থেকে থিতাইয়ে সমুদ্রের তলদেশে সঞ্চিত পদার্থ বা অংশকে বুঝায়। অর্থাৎ পৃথিবী পৃষ্ঠের বিভিন্ন দেশ, মহাদেশ, দ্বীপ, দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি থেকে কাদা, পলি, বালি, কাঁকর, চুন, শিলাখন্ড প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের উপাদান বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, নদী প্রবাহ প্রভৃতির মাধ্যমে ক্ষয়ীভূত ও বাহিত হয়ে সাগর ও মহাসাগরের তলদেশে সঞ্চিত হয়। আবার সাগর ও মহাসাগরের জীবজন্তু ও  উদ্ভিদের মৃত দেহাবশেষও সমুদ্রের তলদেশে সঞ্চিত হয়। সমুদ্রের তলেদেশে সঞ্চিত এসব বস্তু বা পদার্থকে সামুদ্রিক তলানী বা সামুদ্রিক অবক্ষেপ বলে।

সামুদ্রিক তলানীর প্রকারভেদ [Type of Marine Sediment]: তলানীতে মিশ্রিত উপাদানের উপর ভিত্তি করে সামুদ্রিক তলানীকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা –

১। অজৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী [Marine Sediment of Inorganic Substance] ও

২। অজৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী [Marine Sediment of Organic Substance]।

১। অজৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী [Marine Sediment of Inorganic Substance]: বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে লৌহ, সিলিকন, নিকেল, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, এ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি খনিজবিশিষ্ট কাদা, পলি, বালি, কাঁকর, চুন, শিলাখন্ড প্রভৃতি বায়ুপ্রবাহ ও নদী স্রোত দ্বারা বাহিত হয়ে সমুদ্রের অগভীর তলদেশে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এসব পদার্থ বা দ্রব্যই অজৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী। সমুদ্রের অগভীর তলদেশে সঞ্চিত এসব অজৈব পদার্থকে ভূমিজ অবক্ষেপও (terrigenous deposits) বলা হয়। তবে এদের মধ্যে নীল কাদা (blue mud) পরিমাণে বেশি থাকতে দেখা যায়।

২। অজৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী [Marine Sediment of Organic Substance]: মাছ, শামুক, ঝিনুক প্ৰভৃতির মত সামুদ্রিক প্রাণী ও ডায়াটম-এর মত বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক উদ্ভিদের মৃত দেহাবশেষ সমুদ্রের তলদেশে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এসব পদার্থকে জৈব পদার্থের সামুদ্রিক তলানী বলে। সমুদ্রের বিভিন্ন অংশে, বিশেষত সমুদ্রের গভীর তলদেশে জৈব পদার্থ বেশি সঞ্চিত হয়। সমুদ্রের গভীর তলদেশে সঞ্চিত এসব পদার্থকে দূর সমুদ্র অবক্ষেপ (pelagic deposits) বলা হয়। 

পানির গভীরতা অনুসারে সামুদ্রিক তলানী বা অবক্ষেপকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

ক) অগভীর সমুদ্র তলানী [Shallow Marine Sediment] এবং

খ) গভীর সমুদ্র তলানী [Deep Marine Sediment]।

ক) অগভীর সমুদ্র তলানী [Shallow Marine Sediment]: ভূ-পৃষ্ঠের ক্ষয়প্রাপ্ত বিভিন্ন পদার্থ বায়ু প্রবাহ ও নদীর স্রোত দ্বারা বাহিত হয়ে সাগর ও মহাসাগরের অগভীর অংশে সঞ্চিত হয়। সমুদ্রের অগভীর অংশে ক্ষুদ্র শিলাখন্ড, কাঁকর প্রভৃতির মত অজৈব পদার্থের সাথে প্রবাল (coral), শেল ফিস (shell fish), সি অরচিন (sea urchins) প্রভৃতির মত জৈব পদার্থ স্বল্প পরিমাণে সঞ্চিত হয়ে থাকে। 

খ) গভীর সমুদ্র তলানী [Deep Marine Sediment]: সমুদ্রের মহীঢালের পর থেকে সমুদ্রের গভীর অংশের তলদেশে এবং অতি গভীর সমুদ্র খাতে সঞ্চিত পদার্থকে গভীর সমুদ্র তলানী বলা হয়। আবার গভীর সমুদ্র তলানীকে এ্যাবিস্যাল অবক্ষেপ (abyssal deposits) বলা হয়। গভীর সমুদ্রে সঞ্চিত অজৈব পদার্থগুলাের মধ্যে আগ্নেয়গিরির সূক্ষ্ম ধূলিকণাই প্রধান। তবে জৈব পদার্থ হল সমুদ্রের গভীর অংশের প্রধান সঞ্চিত পদার্থ। সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহাবশেষ  ধীরে ধীরে সমুদ্রের গভীরতম অংশে সঞ্চিত হয়। এ জৈব পদার্থগুলাে দেখতে তরল কাদার মত। তাই এপদার্থকে সমুদ্রকাদা (Ooze) বলে। গভীর সমুদ্রের এ জাতীয় জৈব তলানীকে Pelagic Ooze বলা হয়। গঠন ও উপাদান অনুসারে Pelagic Ooze-কে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

খ.১. চুনজাতীয় সমুদ্ৰকাদা [Calcareous Ooze]: যে সব সমুদ্রকাদা চুন জাতীয় পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে, তাদেরকে চুন জাতীয় সমুদ্ৰকাদা বলে। আবার গভীর সমুদ্রের তলদেশে টেরােপড এবং গ্লোবিজেরিনা নামক দুই প্রকারের চুন জাতীয় সমুদ্ৰকাদা দেখা যায়।

খ.২. বালুজাতীয় সমুদ্রকাদা [Siliceous Ooze]: সে সব সমুদ্রকাদার মধ্যে সূক্ষ্ম বালু ও কাদা জাতীয় উপাদান থাকে, তাদেরকে বালুজাতীয় সমুদ্রকাদা বলে। আবার গভীর সমুদ্রের তলদেশে রেডিওলারিয়ান ও ডায়াটম নামক দুই প্রকারের বালুজাতীয় সমুদ্রকাদা দেখা যায়। [মো: শাহীন আলম]


তথ্যসূত্র:
১. রহমান, মোহাম্মদ আরিফুর, প্রাকৃতিক ভূগোল, ২০১৭-২০১৮, কবির পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
২. Singh, Savindra, Physical Geography, 2009, Prayag Pustak Bhawan, Allahabad.
৩. en.wikipedia.org/wiki/Depositional_environment


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *