কুটিলা মুড়ার ধ্বংসাবশেষ – ময়নামতির প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স

কুটিলা মুড়ার ধ্বংসাবশেষ বাংলাদেশের অন্যতম স্বতন্ত্র বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। এটি কুমিল্লা শহরের নিকটবর্তী লালমাই–ময়নামতি পাহাড়শ্রেণিতে অবস্থিত। এর অস্বাভাবিক স্থাপত্য বিন্যাস ও কাঠামোগত নকশা বাংলাদেশের অন্যান্য বৌদ্ধ নিদর্শন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রত্নস্থলগুলোর তুলনায় বেশ আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এখানে তিনটি বৃত্তাকার স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা একই কমপ্লেক্সের মধ্যে বিন্যস্ত। এ স্তূপগুলোর সামনে আয়তাকার সমাবেশ কক্ষ বা হলঘর রয়েছে। এছাড়াও এখানে বহু ছোট আকারের ভোটিভ স্তূপ পাওয়া গেছে, যা ভক্তরা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন। এ বিন্যাস থেকে ধারণা করা যায় যে, কুটিলা মুড়া কেবল একটি পবিত্র স্মৃতিস্তম্ভই নয়, বরং ধর্মীয় সমাবেশ ও আচার-অনুষ্ঠানের জন্যও ব্যবহৃত হতো।
ত্রি-রত্নের প্রতীক
এ স্থানের তিনটি প্রধান স্তূপ বৌদ্ধ ধর্মের ত্রি-রত্ন (Tri-Ratna) বা তিনটি মহামূল্যবান আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এগুলো হলো—
- বুদ্ধ – বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক;
- ধর্ম (ধম্ম) – বুদ্ধের শিক্ষা ও উপদেশ; এবং
- সংঘ – ভিক্ষু ও অনুসারী সম্প্রদায়।
এ তিনটি উপাদান বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য।
ধর্মচক্র আকৃতির স্থাপত্য
কুটিলা মুড়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের একটি হলো – এর কেন্দ্রীয় স্তূপের ভিত্তি, যা ধর্মচক্র (Dharma-chakra) বা ধর্মের চাকার আকৃতিতে নির্মিত। বৌদ্ধ ধর্মে – ধর্মচক্র বুদ্ধের শিক্ষা ও ধর্ম প্রচারের প্রতীক।
এ কাঠামোর মাঝখানে একটি গভীর গর্ত বা শ্যাফট রয়েছে, যা চাকার কেন্দ্র বা হাবকে নির্দেশ করে। সেখান থেকে আটটি দিক বরাবর বক্স-আকৃতির কক্ষ বা প্রকোষ্ঠ তৈরি হয়েছে, যা ধর্মচক্রের আটটি স্পোকের প্রতীক।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার
এ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- ক্ষুদ্র পোড়ামাটির প্রত্নবস্তু ও মাটির তৈরি ভোটিভ স্তূপ;
- লিপিযুক্ত মাটির ফলক;
- ভাস্কর্যের ভগ্নাংশ; এবং
- নরম ধূসর শেল পাথরে নির্মিত সূক্ষ্ম বৌদ্ধ মূর্তি।
এ প্রত্নবস্তুগুলো থেকে বোঝা যায় যে, এ স্থানটি একসময় গভীর ধর্মীয় ভক্তি এবং সমৃদ্ধ শিল্পকলা চর্চার কেন্দ্র ছিল।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এ অঞ্চলে আবিষ্কৃত পাঁচটি শিলালিপিতে ত্রি-রত্ন-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত উপাসনালয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা দেবপর্বত (Devaparvata) অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত। এ তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, কুটিলা মুড়া প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ ধর্মীয় ভূদৃশ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
বর্তমান অবস্থা
প্রায় ষষ্ঠ থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত এ স্থাপনা আজও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে বিদ্যমান। কুটিলা মুড়ার ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
📚 তথ্যসূত্র: লালমাই–ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাচীন নদীপথ: বিহার থেকে সমুদ্রবাণিজ্য (৪র্থ–১৩শ শতাব্দী)
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL