লালমাই–ময়নামতি ও সমতট : বাংলার প্রাচীন বৌদ্ধ কেন্দ্র (৪র্থ–১৩শ শতাব্দী)

লালমাই–ময়নামতি পাহাড়িয়া এলাকাটি প্রাচীন সমতট নামক অঞ্চলের অংশ ছিল, যার অর্থ “সমতল উপকূলীয় ভূমি”। এ এলাকাটি প্রায় ৪র্থ থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর ছিল। সমতট অঞ্চলটি মেঘনা নদীর পূর্ব পারের অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত এবং হরিকেল অঞ্চলের সন্নিকটে অবস্থিত ছিল, যা মোটামুটি বর্তমান চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের অন্তর্গত।
লালমাই–ময়নামতি ও সমতটের বর্তমান অবস্থান।
সমতটের প্রাচীনতম পরিচিতির উল্লেখ পাওয়া যায় গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের (৪র্থ শতাব্দী) এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে, যেখানে সমতটকে দেবপর্বত ও কামরূপের (বর্তমান আসাম–মেঘালয়, ভারত) পাশে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে সমতটের উল্লেখ বিভিন্ন সাহিত্য ও শিলালিপিগত উৎসে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
সমতট মহাযান বৌদ্ধ শিক্ষা ও সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এর এ খ্যাতির প্রতিফলন দেখা যায় ৭ম শতাব্দীতে আগত বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু হিউয়েন সাং এবং একই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ভিক্ষু শেং-চি-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে। এ অঞ্চলের রাজবংশীয় ইতিহাস বিভিন্ন রাজবংশের বা শাসকগোষ্ঠীর জারিকৃত অসংখ্য তাম্রলিপির মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, যাদের অধিকাংশই বৌদ্ধধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।
এ রাজবংশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গুপ্ত বংশ (প্রায় ৪র্থ–৬ষ্ঠ শতাব্দী), নাথ বংশ (৭ম শতাব্দীর প্রথমার্ধ), রাত বংশ (৭ম শতাব্দী), খড়্গ বংশ (৭ম শতাব্দীর শেষভাগ–৮ম শতাব্দী), প্রাথমিক দেব বংশ (৮ম শতাব্দীর শেষভাগ–৯ম শতাব্দী), চন্দ্র বংশ (৯ম শতাব্দীর শেষভাগ–১১শ শতাব্দী), বর্মণ বংশ (১১শ শতাব্দীর শেষভাগ–১২শ শতাব্দী) এবং পরবর্তী দেব বংশ (প্রায় ১৩শ শতাব্দী)।
শিলালিপিগত প্রমাণে এ লালমাই–ময়নামতিকে “দেবপর্বত”, অর্থাৎ “দেবতাদের পাহাড়”— নামে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা চন্দ্র ও দেব বংশের সময় রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসব লিপিতে আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন— বনভূমি, নদী এবং বসতি — যা একটি সমৃদ্ধ পরিবেশের চিত্র তুলে ধরে। এ পরিবেশ ৭ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর মধ্যে মহাযান বৌদ্ধধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রারম্ভিক মধ্যযুগ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়াও ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে এ অঞ্চলের সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম যুক্ত রয়েছে, যেমন— লালম্ভী বান (“লাল মাটির উপর অবস্থিত বন”), পট্টিখের নগরী এবং লৌহিত্য নদী — যা প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী ব্যবস্থার সাথে শনাক্ত করা হয় — এছাড়াও আরও বহু স্থানের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়।
📚 তথ্যসূত্র: লালমাই–ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাচীন নদীপথ: বিহার থেকে সমুদ্রবাণিজ্য (৪র্থ–১৩শ শতাব্দী)
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL