জৈন্তাপুরের শাহ সাইজীর মোকাম: স্থাপত্য, ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

শাহ সাইজীর মোকাম (মাজার) সিলেট জেলাধীন জৈন্তাপুর উপজেলার জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ভিত্রিঘেল (ববরকন্দ) গ্রামে অবস্থিত। এটি স্থানীয় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বিদ্যানিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আনুমানিক ১০০ মিটার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থানগত ভূ-স্থানাঙ্ক ২৫.১২১৩৬২০° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২.১১৮৩০০০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ বৈশিষ্ট্য :
শাহ সাইজীর মোকাম আয়তাকার ভূমি–নকশায় নির্মিত একটি ছোট আকারের স্থাপনা। এটি পাতলা জাফরি ইট এবং চুন–সুরকির মসলার গাঁথুনীতে নির্মিত। স্থাপনাটির নির্মাণরীতিতে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। দক্ষিণমুখী একটি প্রবেশদ্বারসহ স্থাপনাটি পরিকল্পিতভাবে নির্মিত। মাজারটির পূর্ব–পশ্চিমে দৈর্ঘ্য ৪.৮৫ মিটার এবং উত্তর–দক্ষিণে প্রস্থ ৩.৪৫ মিটার; দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৬৫ সেন্টিমিটার।
দক্ষিণ পাশে অবস্থিত প্রবেশদ্বারটির উচ্চতা ১.৫ মিটার এবং প্রস্থ ৭৩ সেন্টিমিটার। প্রবেশপথের দুই পাশে অগভীর বহুপত্র খিলান নকশা রয়ছে, যা মুঘল স্থাপত্যের অলংকরণধর্মী বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। পূর্ব দেয়ালে চৌকো জাফরি সংযুক্ত একটি খিরকি বা ছোট খোলা অংশ রয়েছে, যা বায়ু চলাচল ও আলোর জন্য ব্যবহৃত হতো। সমতল ভূমি থেকে ছাদের শীর্ষ পর্যন্ত মাজারটির মোট উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। অভ্যন্তরীণ ছাদটি ভল্টেড বা খিলানাকৃতির, আর বাহিরের অংশটি নৌকার ছইয়ের মতো বাঁকানো আকৃতিতে নির্মিত।
মাজারের অভ্যন্তরে উত্তর–দক্ষিণে পাশাপাশি তিনটি কবর অবস্থিত। এছাড়া স্থাপনাটির পশ্চিম পাশে বাহিরে মাজার সংলগ্ন কয়েক ধাপবিশিষ্ট পাকা নির্মাণের উপর দুটি উন্মুক্ত কবর রয়েছে। স্থাপনাটিতে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ হলো— দৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ১৩ সেন্টিমিটার এবং পুরুত্ব ৪ সেন্টিমিটার, যা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে ব্যবহৃত পাতলা ইটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য :
স্থাপত্যরীতি, নির্মাণসামগ্রী এবং ইটের পরিমাপ বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা যায় যে, মাজারটি সম্ভবত মধ্যযুগীয় বা মুঘল আমলে নির্মিত। সিলেট অঞ্চল মধ্যযুগে সুফি সাধক, দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকদের আগমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। শাহ সাইজীর মোকামও সম্ভবত সেই ধারার কোনো ধর্মপ্রাণ সাধক বা সম্মানিত ব্যক্তির স্মৃতির সাথে সম্পর্কিত।
মাজারের অভ্যন্তরে পাশাপাশি একাধিক কবর এবং সংলগ্ন উন্মুক্ত কবরসমূহের উপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে, এটি কেবল একক সমাধি নয়; বরং একই পরিবারের বা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের সমাধিক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। মাজারটির নামকরণ, কবরের বিন্যাস এবং স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করা যায় যে, এটি সম্ভবত শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো মুসলিম ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের স্মৃতির সাথে সম্পর্কিত।
বর্তমানে মাজারটির উপর বিভিন্ন প্রকার পরগাছা জন্মে স্থাপনাটি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্বের বিচারে এটি একটি মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন; তাই যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
✍️ লেখক: মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel: GEONATCUL