সিলেট জৈন্তাপুরের থুবাং বাগান বাড়ি মন্দির : মুঘল প্রভাবিত প্রত্নস্থাপনা

বাংলাদেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা অতীতের সমৃদ্ধ স্থাপত্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার থুবাং বাউরভাগ গ্রামে অবস্থিত “থুবাং বাগান বাড়ি মন্দির” তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ তবে প্রায় বিস্মৃত প্রত্নস্থাপনা। এর অষ্টভুজাকৃতি পরিকল্পনা, মুঘল প্রভাবিত নির্মাণরীতি এবং অলংকরণ এ স্থাপনাটিকে বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রদান করেছে।
অবস্থান ও ভৌগোলিক পরিচিতি
থুবাং বাগান বাড়ি মন্দির সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার দক্ষিণ চারিকাটা ইউনিয়নের থুবাং বাউরভাগ গ্রামে অবস্থিত। এটি থুবাং হাজী গিয়াস উদ্দিন মহিলা মাদরাসার দক্ষিণ–পূর্ব কোণে প্রায় ৫০০ মিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। মন্দিরটির ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক : অক্ষাংশ: ২৫°০৫’৫০.৫” উত্তর এবং দ্রাঘিমা: ৯২°০৯’১৬.৪” পূর্ব।
মন্দিরটির চারপাশে একসময় একটি বেষ্টনী প্রাচীর ছিল, যা বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। এছাড়া মন্দিরের উত্তর–দক্ষিণ দিকে একটি প্রাচীন পুকুর রয়েছে, যা বর্তমানে আংশিকভাবে ভরাট হয়ে গেছে।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণশৈলী
থুবাং বাগান বাড়ি মন্দিরটি অষ্টভুজাকৃতি ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত এবং এটি দক্ষিণমুখী। মন্দিরটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে পাতলা ইট এবং চুন–সুরকির মসলা, যা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
মন্দিরের গঠন ও পরিমাপ
- ভূমি থেকে মূল বেদীর উচ্চতা: প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার (সে.মি.)
- ভূমি থেকে চূড়া পর্যন্ত আনুমানিক উচ্চতা: প্রায় ১০–১২ মিটার
- প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য: ১৪৮ সেন্টিমিটার (সে.মি.)
- দেয়ালের পুরুত্ব: ৭১ সেন্টিমিটার (সে.মি.)
- প্রবেশদ্বারের উচ্চতা: ১৯০ সেন্টিমিটার (সে.মি.)
- প্রবেশদ্বারের প্রস্থ: ৮৯ সেন্টিমিটার (সে.মি.)
- মন্দিরের দেয়াল নির্মাণে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ: ১৯ সে.মি. × ১৫ সে.মি. × ৫ সে.মি. এবং ১৬ সে.মি. × ১২ সে.মি. × ৪ সে.মি.।

অলংকরণ ও কারুকার্য
মন্দিরটির স্থাপত্য অলংকরণে মুঘল শিল্পরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:
- অষ্টভুজের প্রতিটি কোণে ফুলদানি আকৃতির অলংকরণ;
- প্রতিটি বাহুতে আয়তাকার প্যানেলের মধ্যে খাঁজযুক্ত খিলান নকশা;
- পূর্ব ও পশ্চিম পাশে বায়ুঝরকা (ভেন্টিলেটর);
- চার কোণে একটি করে কর্ণার টারেট;
- খিলানের নিচে ফ্রিজ ও রেজিস্টার অলংকরণ; এবং
- ভল্টেড ছাদবিশিষ্ট নির্মাণশৈলী।
মন্দিরের পশ্চিম অংশে ফুল-খোদিত বর্তন আকৃতির (bowl shape) অলংকরণের চিহ্ন এখনও আংশিকভাবে শনাক্ত করা যায়।
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি
বর্তমানে মন্দিরটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। এর প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
- উপরের শিখর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছে;
- কার্ণিশ অংশ ভঙ্গ অবস্থায় রয়েছে;
- দেয়ালের অলংকরণ ক্ষয়প্রাপ্ত;
- ছাদের উপর বটগাছ ও পরগাছার বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়;
- অভ্যন্তরে আবর্জনা জমে রয়েছে; এবং
- সংস্কারের অভাব ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে স্থাপনাটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও নির্মাণকাল
মন্দিরটির নির্মাতা বা সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো লিখিত প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, ইটের গঠন এবং নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করে ধারণা করা যায় যে, এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত হয়েছিল।
মন্দিরটির অষ্টভুজ পরিকল্পনা, খিলান ব্যবহার এবং ইটের গাঁথুনি মধ্যযুগীয় মুঘল প্রভাবিত স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এটি একসময় ধর্মীয় উপাসনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
থুবাং বাগান বাড়ি মন্দির বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর অষ্টভুজাকৃতি নকশা, মুঘল প্রভাবিত নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব এটিকে গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনায় পরিণত করেছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে এ স্থাপনাটিকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
✍️ লেখক: মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel: GEONATCUL