পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তর | Interior of the Earth

সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তর বর্তমান রূপ ছিল না। সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় পৃথিবী ছিল একটি জ্বলন্ত বাষ্পপিণ্ড। কোটি কোটি বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তাপ বিকিরণের করে প্রথমে বাষ্পময় অবস্থা থেকে শীতল এবং ঘনীভূত হয়ে তরলে রূপ নেয়। জানা যায় যে, পৃথিবী গঠনকারী বিভিন্ন উপাদানের তাপ বিকিরণ এবং ঘনীভবনের মাত্রা এক নয়। এ কারণে তরল অবস্থায় পৃথিবী গঠনকারী এ উপাদানগুলোর মধ্যে স্থান বিনিময় হয়। লৌহ, নিকেল প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত ভারী উপাদানগুলো ক্রমে পিণ্ডের কেন্দ্রে (পৃথিবীর কেন্দ্রে) সঞ্চিত হয়। আর অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদানগুলো উপরের দিকে ভেসে উঠে। যার ফলস্বরূপ উপাদানগুলোর ঘনত্বের তারতম্য অনুসারে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কয়েকটি স্তরের জন্ম হয়। এ স্তরগুলোকে ভূবিজ্ঞানী বা ভূতত্ত্ববিদগণ বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন। নিচে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তর সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হল :

পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তর

চিত্র: পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তর।

১. কেন্দ্রমণ্ডল (Centrosphere) : পৃথিবীর অভ্যন্তরের কেন্দ্রের স্তর বা মণ্ডলকে (sphere) কেন্দ্রমণ্ডল বলা হয়। এ স্তর বা মণ্ডলটি লৌহ, নিকেল, কোবাল্ট প্রভৃতি ভারী পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। ভূ-বিজ্ঞানীগণ এ স্তরটিকে নিফে (Nife) নামে অভিহিত করেছেন। কারণ এ স্তরটিতে অত্যন্ত ভারী বিভিন্ন ধাতব উপাদানগুলোর মধ্যে নিকেল (Ni) ও লোহা (Fe) পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রের চারিদিকে প্রায় ৩,৪৭১ কিলোমিটার বিস্তৃত এ স্তরটি বহিঃকেন্দ্র (বাহিরের অংশ/outer part) ও অন্তকেন্দ্র (ভিতরের অংশ/inner part) নামক ২টি অংশে বিভক্ত। কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে ভূকম্পন ‘P’ তরঙ্গ ধীর গতিতে অগ্রসর হয়, কিন্তু ভূকম্পন ‘S’ তরঙ্গ বহিঃকেন্দ্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। ভূকম্পন্ন তরঙ্গের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ভূবিজ্ঞানীগণ প্রমাণ করেন যে, পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃকেন্দ্রটি তরল অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ২,২৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত এ বহিঃকেন্দ্রটিতে তরল লোহা খুবই ঘনীভূত অবস্থায় রয়েছে। কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃকেন্দ্রটির ঘনত্ব প্রায় ১২.৩ থেকে ১৩.৩ মধ্যে। ধারণা করা হয় যে, কেন্দ্রমণ্ডলের অন্তকেন্দ্রটি কঠিন অবস্থায় রয়েছে। অন্তকেন্দ্রটিও প্রধানত লোহা এবং নিকেল দিয়ে গঠিত। কেন্দ্রমণ্ডলের অন্তকেন্দ্রটির গভীরতা প্রায় ১,২২১ কি. মি. এবং ঘনত্ব প্রায় ১৩.৬ । গুরুমণ্ডলের (barysphere) ঠিক নিচ থেকে এ মণ্ডলটি প্রায় ৩,৪৮৬ কিলোমিটার পুরু।

২. গুরুমন্ডল (Barysphere) : পৃথিবীর অভ্যন্তরের মাঝের স্তর বা মণ্ডলকে (sphere) গুরুমণ্ডল বলা হয়। এ মণ্ডলটি কেন্দ্রমণ্ডলের চারিদিকে প্রায় ২,৮৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত। লোহা মিশ্রিত অপেক্ষাকৃত হালকা শিলা ঘনীভূত হয়ে এ মন্ডলের সৃষ্টি হয়েছে। গঠনকারী উপাদানগুলোর গুরুত্বের তারতম্য অনুসারে এ মণ্ডলটিকে উপরের অংশ (upper part) এবং নিম্নের অংশ (lower part) নামক ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। গুরুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলো ক্রমেই উপরের দিকে হালকা হয়েছে। গুরুমণ্ডলের নিম্নের অংশটি ২,১৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং ঘনত্ব ৫.৫ থেকে ১০। অপরদিকে গুরুমণ্ডলের উপরের অংশটি ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং ঘনত্ব ৪.৩। ভূ-বিজ্ঞানীগণ এ স্তরটিকে সিমা (Sima) নামে অভিহিত করেছেন। কারণ সমগ্র গুরুমণ্ডলে উপাদানগুলোর মধ্যে সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেশিয়ামের (Mg) প্রাধান্য বেশি। এ মণ্ডলটি খুবই উত্তপ্ত। তবে চারিদিকের প্রচণ্ড চাপের প্রভাবে এ মণ্ডলটির উপাদানগুলো তরল ও কঠিনের মধ্যবর্তী কর্দমাক্ত অবস্থায় রয়েছে। গুরুমন্ডলের উপরের অংশটি প্রধানত ব্যাসল্ট জাতীয় উপাদান দিয়ে গঠিত। আর এ কারণে এ অংশটিকে ‘ব্যাসল্ট অঞ্চল’ (Basalt zone) বলা হয়।

৩. অশ্মমণ্ডল (Lithosphere) : পৃথিবীর সবচেয়ে উপরের স্তর বা মণ্ডলকে অশ্মমণ্ডল বলা হয়। অশ্মমণ্ডলের অপর নাম শিলামণ্ডল। অশ্মমণ্ডলে নিচ থেকে উপরের দিকে ক্রমেই ভারী থেকে হালকা শিলা রয়েছে। অশ্মমণ্ডলই হল পৃথিবীর প্রকৃত কঠিন বহিরাবরণ। ভূ-বিজ্ঞানীগণ এ স্তরটিকে সিয়াল (Sial) নামে অভিহিত করেছেন। কারণ এ স্তরের গঠনকারী উপাদানগুলোর মধ্যে সিলিকন (Si) ও এ্যলুমিনিয়ামের (AI) ভাগ বেশি। এ স্তরটি মহাদেশীয় অঞ্চলের নিচে বেশি বিস্তৃত এবং মহাসাগরের নিচে তুলনামূল কম এবং গড় বিস্তৃতি ১৭০ কিলোমিটার। মূলত: ভূত্বক বা ভূপৃষ্ঠ অশ্মমন্ডলের বা শিলামন্ডলের অন্তর্গত। ভূত্বক সাধারণত অক্সিজেন, সিলিকন, এ্যালুমিনিয়াম, লৌহ, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম প্রভৃতি উপাদান দিয়ে গঠিত। ভূত্বক ১৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে ভূত্বক গড়ে ৩০ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত মনে করা হয়।

সুতরাং, কেন্দ্রমণ্ডলের কেন্দ্র থেকে অশ্মমণ্ডলের ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ বিভিন্ন উপাদান নিয়ে গঠিত একটি জটিল প্রক্রিয়া। আর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৃথিবীর মোট বিস্তৃতি প্রায় ৬,৩৭১ কিলোমিটার। উপর্যুক্ত তথ্য-উপাত্তগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তরগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা মাত্র। তবে ভূবিজ্ঞানীগণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন ও স্তরগুলো সম্পর্কে আরও জানার ও বুঝায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন। [মো: শাহীন আলম]


সহায়িকা: 
১. মাহমুদ. কাজী আবুল, ভূগোল কম্প্রিহেনসিভ, ২০০৩, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা।
২. বাকী, আবদুল, ভুবনকোষ,২০১৩, সুজনেষু প্রকাশনী, ঢাকা।


Figure drawn by: Md. Shahin Alam


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *