নিরক্ষীয়, ভূ-মধ্যসাগরীয় ও মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল

আমাদের এ পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। তাই এর জলবায়ুও বৈচিত্র্যময়। এ জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদান, যেমন- তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর আদ্রতা, জলীয়বাষ্প ইত্যাদির স্থানভেদে ভিন্নতার কারণে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু সৃষ্টি হয়। কোন অঞ্চলের জলবায়ুর উপাদানগুলো একই ধরনের হলে, তখন ঐ অঞ্চলকে জলবায়ু অঞ্চল বলে। অঞ্চলভেদে জলবায়ুগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন – নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল, ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল, মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল, প্রভৃতি। নিম্নে নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল, ভূ-মধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল এবং মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল নিয়ে আলোচনা করা হলো:

নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল (equatorial climate region): পৃথিবীর নিরক্ষরেখা হতে উত্তর-দক্ষিণ দিকে আনুমানিক ৫ – ১০ ডিগ্রী অক্ষাংশের মধ্যে প্রায় ৯৬৫ কি.মি. অঞ্চল নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত। কিন্তু ঋতুভেদে কোনো কোনো স্থানে এ জলবায়ু অঞ্চলের বিস্তৃতি সামান্য উত্তর-দক্ষিণে সরে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর অববাহিকায়, আফ্রিকার জায়ারে অববাহিকা, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল হলো এ জলবায়ুর আওতাভুক্ত প্রধান অঞ্চলসমূহ। এছাড়াও ব্রাজিলের উত্তরাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, গায়ানা ও সুরিনামের উপকূলভাগ, ভেনেজুয়েলার অংশবিশেষ ও কলম্বিয়ার দক্ষিণাংশ, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ও শ্রীলঙ্কা নিরক্ষীয় জলবায়ুর আওতাভুক্ত। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় এবং আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল (ITCZ) দ্বারা এ অঞ্চলের জলবায়ু প্রভাবিত হয়ে থাকে।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল (mediterranean climate region): পৃথিবীর উপক্রান্তীয় অঞ্চলে মহাদেশীয় ভূভাগের পশ্চিম প্রান্তে যে জলবায়ু দেখা যায়, তাকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বলে। মহাদেশীয় ভূভাগের পশ্চিম প্রান্তে ৩০ – ৪০ ডিগ্রী উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যবর্তী স্থানে যে জলবায়ু দেখা যায় তাকে পশ্চিম উপকূলবর্তী উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু বলে। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশসমূহে এ শ্রেণির জলবায়ু দেখা যায়, যে কারণে এ জলবায়ুকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বলে।

মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল (monsoon climate region): মৌসুমি শব্দটি আরবি ‘মাওসিম’ শব্দ থেকে এসেছে। মাওসিম শব্দের অর্থ মৌসুম বা মরসুম, যার অর্থ হলো ঋতু। তাই বলা যায় ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যে বায়ুর দিক পরিবর্তন হয় তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। এ বায়ু যেসব দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় সেসব দেশের জলবায়ুকে মৌসুমি জলবায়ু বলে। কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি বৃত্তদ্বয়ের মধ্যে অবস্থিত বলে এ ধরনের অঞ্চলকে ক্রান্তীয় মৌসুমি অঞ্চল নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত ১৫ – ৩০ ডিগ্রী উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে মহাদেশসমূহের পূর্ব প্রান্তে মৌসুমি জলবায়ু দেখা যায়। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, মালেশিয়ার অধিকাংশ স্থান ও দক্ষিণ চীন ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অন্তর্গত। তাছাড়া মাদাগাস্কার দ্বীপ, পূর্ব আফ্রিকার উপকূল অঞ্চল, পূর্ব আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান সাগর ও মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলবর্তী দেশসমূহ, ব্রাজিলের পূর্বাংশ, পশ্চিম ও পশ্চিম-পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কিয়দংশ, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ও মাঞ্চুরিয়ার অংশবিশেষে মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। [ইশরাত জাহান মিম]


সহায়িকা: মজুমদার, তাপস কুমার, ভূগোল, (২০২৩), লেকচার পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৩৪, ২৩৭, ২৪০।


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *