সংস্কৃতি এবং সভ্যতা | Culture and Civilization

সংস্কৃতি (culture): সংস্কৃতি শব্দের আভিধানিক অর্থ কৃষ্টি বা উৎকর্ষ। অর্থাৎ অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান-বুদ্ধি, রীতি-নীতি প্রভৃতির উৎকর্ষ কিংবা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন। সমাজের সদস্য হিসেবে যে কোন স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবন জীবিকার উপায়, ধর্মীয় রীতি-নীতি, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা প্রভৃতির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি বা উৎকর্ষের প্রকাশ পায়, তাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি যেমন নিত্য দিনের জীবন যাপনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত তেমনি জীবন উপভোগের ব্যবস্থার সাথেও সম্পর্কিত। সংস্কৃতি হল সমাজে টিকে থাকার কৌশলের অনুশীলনের মাধ্যমে উৎকর্ষ সাধন। পৃথিবীতে একমাত্র সংস্কৃতিবান প্রাণী হল মানুষ। মানুষের টিকে থাকার কৌশলগুলোর অনুশীলন ভৌগোলিক, সামাজিক, জৈবিক প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল। পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত কৌশলগুলো উত্তরপুরুষগণ অনুশীলন করে অধিক উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করে। তাই সময়ের পালাক্রমে মানুষ আরো উন্নত কিছু কৌশল সৃষ্টি করে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে থাকে।

নৃ-বিজ্ঞানী টেইলরের মতে, Culture is “that complex whole which includes knowledge, belief, art, morals, law, custom and any other capabilities acquired by man as a member of society.” অর্থ সংস্কৃতি হল সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, আদর্শ, আইন, প্রথা এবং অন্য যে কোন যোগ্যতা প্রভৃতির এক যৌগিক সমন্বয়।

সভ্যতা (civilization): সংস্কৃতির বাহ্যিক প্রকাশই হল সভ্যতা। সভ্যতা সংস্কৃতিরই অংশ। সভ্যতা হল সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তির প্রকাশ। মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন- মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবন জীবিকার উপায়, ধর্মীয় রীতি-নীতি, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, নাট্যশালা প্রভৃতির মাধ্যমে সভ্যতা পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়। সংস্কৃতি বিকাশের প্রথম পর্যায় থেকে সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। নগর বিকাশের মাধ্যমে সংস্কৃতি বিকাশের সবচেয়ে উন্নত সমন্বয় দেখা যায়। তাই নগর বিকাশকে সভ্যতার সূচনা বলেও ধরা হয়।

বাংলা ‘সভ্যতা’ শব্দের ইংরেজি ‘civilization’ শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘civilis’ থেকে এসেছে। যার বাংলা অর্থ নগরে বসবাসরত ব্যক্তি। যখন কোন একটি স্থানের মানুষ সভ্য হয়, তখন তারা কোন ছোট গোত্র কিংবা যৌথ পরিবারের মত বসবাস করে না। বরং নগরের মত একটি বড় পরিসরে সংগঠিত হয়ে একত্রে বসবাস করে। মানুষের সংগঠিত বসবাসের ক্রমোন্নত স্তর হল সভ্যতা। এ স্তরে নিজস্ব জীবনব্যবস্থা, আত্মরক্ষার পদ্ধতি, কৃষিব্যবস্থা, সাধারণ ভাষা, ধর্ম, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারপদ্ধতি প্রভৃতি সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো বিদ্যমান থাকে।

ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের মতে, ‘আমরা যা করি, তাই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের যা আছে, তাই আমাদের সভ্যতা।’

অর্থাৎ, সংস্কৃতি হল মানুষের সামাজিক জীবন প্রণালি এবং সভ্যতা হল সে জীবন প্রণালির বাহ্যিক রূপ। সকল সমাজেরই নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। তবে খুব কম সমাজ রয়েছে, যাদের নিজস্ব সভ্যতা আছে। সভ্যতা বিকাশের পূর্ব শর্ত হল সংস্কৃতি। আর সভ্যতা সংস্কৃতি বিকাশের ধাপগুলো উপস্থাপন করে। সংস্কৃতির জন্ম ও টিকে থাকার মাধ্যমে একটি সভ্যতা পূর্ণতা লাভ করে এবং বিকশিত হয়। অবশেষে পরিপূর্ণ এবং বিকশিত একটি সভ্যতার মাঝে কেবল মানুষ, সংস্কৃতি ও অবকাঠামো বা নানা নিদর্শনকে বাহ্যিক রূপে দেখতে পাওয়া যায়।


সহায়িকা: ১. বাকী, আবদুল, ভুবনকোষ, সুজনেষী প্রকাশনী: ঢাকা, ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৭৭ ও ২৭৯।


লেখক: মো. শাহীন আলম


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *