ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও স্মৃতির ধারক: বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে অবস্থিত বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ স্থানীয় ইতিহাস, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক জীবনের সাথে যুক্ত এ মসজিদ তার তিন গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপত্য, চুন-সুরকির নির্মাণ এবং রঙিন সিরামিক বা চীনামাটির ভাঙা টুকরোর অলংকরণের কারণে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রচলিত হয়েছে। বিশেষত একে মুঘল আমলের স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতা দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক স্থানীয় ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি আনুমানিক ১৯১৬ সালের দিকে মাওলানা শফিকুল হকের উদ্যোগে নির্মিত বলে জানা যায়। ফলে এটিকে মুঘল আমলের নির্মাণ বলা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এ মসজিদের গুরুত্ব তাই শুধু বয়সে নয়; বরং এর সাথে যুক্ত স্থানীয় ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থাপত্যরীতি এবং গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের মধ্যেই এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।
ঐতিহাসিক পটভূমি
বর্তমান বিয়ানীবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে পঞ্চখণ্ড পরগনা নামে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলের ইতিহাস বহু শতাব্দীর প্রাচীন। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হলো নিধনপুর তাম্রশাসন।
সপ্তম শতকের কামরূপের (বর্তমান আসামের) রাজা ভাস্করবর্মনের সাথে সম্পর্কিত নিধনপুর তাম্রশাসন ১৯১২ সালে বর্তমান বিয়ানীবাজারের নিধনপুরে আবিষ্কৃত হয় বলে জানা যায়। এতে দুই শতাধিক বৈদিক ব্রাহ্মণের ভূমিদানের তথ্য পাওয়া যায়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে বর্তমান বিয়ানীবাজার-পঞ্চখণ্ড অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভূমি-প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
অতএব, বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ যে ভূখণ্ডে গড়ে উঠেছে, তার ঐতিহাসিক পরিচয় কেবল আধুনিক সময়ের নয়; বরং এই অঞ্চলের অতীত বহুস্তরীয় ও দীর্ঘকালব্যাপী।
বাহাদুরপুর ও পাল বংশের স্থানীয় ঐতিহ্য
বাহাদুরপুরের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় বর্ণনায় পাল বংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস ও স্থানীয় বংশপরম্পরা অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো গ্রন্থ। পরবর্তী স্থানীয় লেখালেখিতেও পঞ্চখণ্ডের পাল পরিবারের ইতিহাসের সাথে বাহাদুরপুরের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক স্থানীয় বিবরণে বলা হয়েছে, পাল বংশের প্রতাপ চন্দ্র পাল পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে পছন্দ খাঁ নামে পরিচিত হন এবং তাঁর বংশধররা পরবর্তী সময়ে বাহাদুরপুর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তবে এ ধর্মান্তর ও বংশপরম্পরার প্রতিটি ধাপের সমর্থনে স্বাধীন সমসাময়িক প্রাথমিক দলিল সহজলভ্য নয়। ফলে বিষয়টিকে স্থানীয় ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে অধিক সর্তক থাকাই যুক্তিযুক্ত। কারণ স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস অনেক সময় একটি স্থানের সাংস্কৃতিক স্মৃতি বহন করে, তবে তা সবসময় লিখিত প্রাথমিক দলিলের সমতুল্য নয়।
মাওলানা শফিকুল হক ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদের ইতিহাসের সাথে মাওলানা শফিকুল হকের নাম সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক প্রকাশিত স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, শফিকুল হক ১৯০৬ অব্দে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টাইটেল ও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। নিজ এলাকায় ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি একটি মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আনুমানিক ১৯১৬ অব্দের দিকে বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ নির্মিত হয় বলে জানা যায়।
স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, নির্মাণের সময় মসজিদটির স্থাপত্যে চুন-চুরকি এবং রঙিন সিরামিক তৈজসপত্রের ভাঙা অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদ সে সময় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বলেও স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
নির্মাণকাল নিয়ে তথ্যগত সংশোধন
মসজিদটির ইতিহাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের বিষয় হলো নির্মাণকাল। কোনো কোনো তথ্যসূত্রে বাংলা ১৩৩৫, হিজরি ১৩৪৯ এবং ১৯২৮ অব্দকে মসজিদটির নির্মাণ সমাপ্তির সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকার ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে মসজিদটির নির্মাণকাল আনুমানিক ১৯১৬ অব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই সাথে মসজিদটিকে মুঘল আমলের বলে প্রচলিত দাবিকে সংশোধন করা হয়েছে।
১৯১৬ অব্দে মেনে নিলে মসজিদটি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপনা। তাই এটিকে মুঘল আমলের মসজিদ বলা উচিত নয়। তবে স্থাপত্যে যদি মুঘল বা পূর্ববর্তী ইসলামি স্থাপত্যের কোনো রীতিগত প্রভাব থাকে, সেটিকে আলাদাভাবে স্থাপত্য-প্রভাব হিসেবে আলোচনা করা যেতে পারে। নির্মাণকাল এবং স্থাপত্যরীতির উৎস — দুটি একই বিষয় নয়।
আর যদি মসজিদের দেয়ালে ১৯২৮ অব্দের কোনো শিলালিপি থেকে থাকে, তবে তার অর্থ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সেটি নির্মাণকাল, সংস্কারের সময়, সম্প্রসারণের সময় বা অন্য কোনো স্মারক-তথ্য নির্দেশ করতে পারে। শিলালিপির পাঠ ও আলোকচিত্র যাচাই ছাড়া ১৯২৮ সালকেও নির্মাণকাল হিসেবে নিশ্চিত করা সমীচীন নয়।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য: তিন গম্বুজের বিন্যাস
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তিন গম্বুজবিশিষ্ট ছাদবিন্যাস। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ স্থাপত্যে তিন গম্বুজ একটি বহুল ব্যবহৃত রীতি। তবে বাহাদুরপুর মসজিদের বিশেষত্ব নিহিত এর গম্বুজের সাথে সম্মুখভাগ, ক্ষুদ্র বুরুজ এবং অলংকরণের সমন্বয়ে। তিনটি গম্বুজ মসজিদের মূল নামাজঘরের উপর একটি ছন্দময় স্থাপত্যিক ভারসাম্য তৈরি করেছে। এর ফলে ভবনটির সম্মুখভাগে একটি সুস্পষ্ট কেন্দ্রীয়তা ও আনুপাতিক সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষুদ্র বুরুজ ও অলংকরণ
মসজিদের কোণ ও পার্শ্ববর্তী অংশে ছোট ছোট বুরুজ বা টারেটসদৃশ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো শুধু কাঠামোগত নয়, বরং অলংকারমূলক ভূমিকা পালন করেছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ স্থাপত্যে কোণার বুরুজ একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। বাহাদুরপুর মসজিদে এগুলোর ব্যবহার ভবনটির উল্লম্বতা বাড়িয়েছে এবং গম্বুজের সাথে দৃশ্যগত ভারসাম্য তৈরি করেছে।
চিনিটিকরি বা সিরামিক অলংকরণ
মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো রঙিন সিরামিক বা চীনামাটির ভাঙা টুকরো দিয়ে দেয়ালেরর অলংকরণ। নির্মাণে চুন-চুরকি এবং ভাঙা সিরামিক তৈজসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের অলংকরণকে চিনিটিকরি নামে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন রঙের টুকরোকে জ্যামিতিক, ফুলেল বা অলংকারধর্মী বিন্যাসে বসিয়ে দেয়াল ও স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশকে সাজানো হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — এটিকে আধুনিক অর্থে মোজাইক বলার পাশাপাশি স্থানীয় সিরামিক-খণ্ড অলংকরণ হিসেবে বর্ণনা করা বেশি নির্ভুল। কারণ ব্যবহৃত উপকরণ, নির্মাণপ্রযুক্তি এবং নকশার প্রকৃতি সরেজমিন স্থাপত্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
চুন-চুরকি নির্মাণ
ঐতিহ্যবাহী বাংলার স্থাপত্যে চুন-সুরকি বা চুন-চুরকি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণপ্রযুক্তি। সিমেন্টের ব্যাপক ব্যবহারের আগের সময়ে ইটের গুঁড়া, চুন ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণ দিয়ে শক্তিশালী নির্মাণ-বন্ধন তৈরি করা হতো। বাহাদুরপুর মসজিদের নির্মাণেও এ ঐতিহ্যবাহী উপকরণের ব্যবহার সম্পর্কে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এ নির্মাণপ্রযুক্তি মসজিদটির ঐতিহাসিক চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবনের বয়স নির্ধারণের পাশাপাশি এর মূল নির্মাণ উপকরণ সংরক্ষণ করাও ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কাজের অন্যতম প্রধান বিষয়।
সম্মুখভাগ ও প্রবেশপথ
মসজিদের সম্মুখভাগে একাধিক খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং সামনের বারান্দা রয়েছে। খিলান, গম্বুজ ও পার্শ্ববর্তী বুরুজের সম্মিলিত বিন্যাস মসজিদের বাহ্যিক অবয়বকে স্বতন্ত্র করেছে।
সম্মুখভাগের অলংকরণে ব্যবহৃত রঙিন সিরামিক টুকরোগুলো স্থাপত্যের একঘেয়েমি দূর করে এবং আলোর পরিবর্তনের সাথে ভবনের পৃষ্ঠে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যমানতা সৃষ্টি করে। এখানে স্থাপত্যের সৌন্দর্য কেবল গম্বুজ বা আকারে নয়; বরং ক্ষুদ্র অলংকরণ ও সামগ্রিক স্থাপত্যিক অনুপাতের সমন্বয়েই এর নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে।
মসজিদ ও জলাধারের সম্পর্ক
মসজিদের পার্শ্ববর্তী পুকুর বা দিঘি এ স্থানের সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার বহু ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় স্থাপনার সাথে জলাধারের সম্পর্ক দেখা যায়। জলাধার ধর্মীয় ব্যবহারের পাশাপাশি স্থাপত্যের পরিবেশগত সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করত। মসজিদের স্থাপত্য, পুকুর, সবুজ পরিবেশ এবং পার্শ্ববর্তী বসতবাড়ি — সব মিলিয়ে একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপ গড়ে উঠেছে। অতএব, মসজিদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু মূল ভবন নয়, এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও ঐতিহাসিক জলাধারকেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক ভূমিকা
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদের ইতিহাস ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাথে ইসলামি শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগও যুক্ত ছিল। মাওলানা শফিকুল হকের শিক্ষাজীবন ও ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগের সাথে মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি একই ধারায় বিবেচিত হয়েছে।
বাংলার গ্রামীণ সমাজে ঐতিহাসিকভাবে জামে মসজিদ শুধু নামাজের স্থান ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, পরামর্শ, জনসমাবেশ এবং স্থানীয় সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বাহাদুরপুর মসজিদকে একটি জীবন্ত ঐতিহ্য (living heritage) হিসেবে দেখা যায় — যেখানে স্থাপত্য ঐতিহ্যের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবহার এখনও অব্যাহত রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও সংরক্ষণগত গুরুত্ব
মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন তালিকাভূক্ত পুরাকীর্তি এবং অধিদপ্তরের উদ্যোগে এর সংস্কারকাজ পরিচালিত হয়। বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, মূল নির্মাণ উপকরণ — চুন-চুরকি, ইট ও ঐতিহ্যবাহী বন্ধন উপাদান যথাসম্ভব সংরক্ষণ করা।
দ্বিতীয়ত, সিরামিক বা চিনিটিকরি অলংকরণের মূল নকশা ও উপকরণ রক্ষা করা। আধুনিক টাইলস দিয়ে পুরোনো অলংকরণ প্রতিস্থাপন করলে ভবনের ঐতিহাসিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তৃতীয়ত, গম্বুজ, কার্নিস, খিলান ও বুরুজের মূল আকৃতি অক্ষুণ্ন রাখা।
চতুর্থত, মসজিদের সাথে যুক্ত পুকুর, খোলা জায়গা ও আশপাশের ঐতিহাসিক পরিবেশকে সংরক্ষণের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা।
পঞ্চমত, সংস্কারের আগে ও পরে বিস্তারিত স্থাপত্য জরিপ, আলোকচিত্র, মাপজোক এবং উপকরণ বিশ্লেষণের নথি সংরক্ষণ করা। এ ধরনের নথি ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে তথ্যের নির্ভুলতার গুরুত্ব
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো — ঐতিহ্যবিষয়ক তথ্য প্রকাশের আগে তারিখ ও উৎস যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
একটি স্থাপনা যদি ১৯১৬ অব্দে নির্মিত হয়ে থাকে, তাকে মুঘল আমলের স্থাপনা বলা হলে তার প্রকৃত ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। বরং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে স্থানীয় মুসলিম সমাজ কীভাবে ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণ করেছে, স্থানীয় কারিগররা কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করেছেন এবং পুরোনো ইসলামি স্থাপত্যরীতির কোন কোন বৈশিষ্ট্য পরবর্তী সময়ে টিকে ছিল — এসব প্রশ্নই তখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে।
অর্থাৎ, মসজিদটির গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য তাকে মুঘল আমলের বলে দাবি করার প্রয়োজন নেই। শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো একটি স্থানীয় স্থাপত্যনিদর্শন হিসেবেই এর নিজস্ব ঐতিহাসিক মূল্য যথেষ্ট।
শেষকথা
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ বিয়ানীবাজারের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আনুমানিক ১৯১৬ অব্দে নির্মিত এ তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে যেমন স্থানীয় মানুষের জীবনের সাথে যুক্ত, তেমনি এর চুন-চুরকি নির্মাণ, সিরামিক খণ্ডের অলংকরণ, খিলান, গম্বুজ, বুরুজ এবং পারিপার্শ্বিক জলাধার একে স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র নিদর্শনে পরিণত করেছে।
এর সাথে যুক্ত মাওলানা শফিকুল হকের শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ, স্থানীয় বংশপরম্পরার স্মৃতি এবং পঞ্চখণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস মসজিদটির গুরুত্বকে আরও বিস্তৃত করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মসজিদটির ইতিহাসকে মুঘল আমলের সাথে যুক্ত করার প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে বিশ শতকের গোড়ার দিকের স্থানীয় ইসলামি স্থাপত্য ও সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সাম্প্রতিক স্থানীয় ঐতিহাসিক সংশোধনও এ দিকেই ইঙ্গিত করে।
বাহাদুরপুর পুরানবাড়ি জামে মসজিদ তাই শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি একটি অঞ্চলের ধর্মীয় জীবন, স্থানীয় সমাজ, স্থাপত্যরুচি, কারিগরি ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির জীবন্ত দলিল। এর যথাযথ সংরক্ষণ শুধু একটি ভবন রক্ষা নয় — বরং সিলেটের বিয়ানীবাজারের বহুমাত্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তথ্যসূত্র
১. চৌধুরী তত্ত্বনিধি, অচ্যুতচরণ। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত। পূর্বাংশ/উত্তরাংশ। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস, বংশপরম্পরা ও স্থাননাম বিষয়ে প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ। ডিজিটাল সংস্করণ: উইকিসংকলন।
২. আগামী প্রজন্ম। সৈয়দ মুনজের হোসেন বাবু, “অবয়বে শতবর্ষী মসজিদ, প্রতিবিম্বে তার হাজারের ইতিহাস”, ১৮ জুন ২০২৬। মসজিদের নির্মাণকাল, মাওলানা শফিকুল হক, স্থানীয় ইতিহাস, স্থাপত্য ও ২০২৩ সালের সংস্কার সম্পর্কে তথ্য।
৩. পঞ্চখণ্ড আই। “রোটারি বর্ষে রেকর্ড ১৪২ প্রকল্প বাস্তবায়ন; প্রচ্ছদের মসজিদ নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্যের সংশোধন”, ১৫ জুন ২০২৬। মসজিদের নির্মাণকাল আনুমানিক ১৯১৬ এবং মুঘল আমলের স্থাপনা হিসেবে প্রচলিত তথ্য সংশোধন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক সূত্র।
৪. National Mission on Monuments and Antiquities (India), Nidhanpur Copperplate Inscription। নিধনপুর তাম্রশাসনের আবিষ্কার, অবস্থান ও ঐতিহাসিক বিবরণ।
৫. Epigraphia Indica এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নিধনপুর তাম্রশাসন—সপ্তম শতকের কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের ভূমিদানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL