জৈন্তাপুরের ঐতিহাসিক পান্থশালা: ঢুপি মঠের সাথে যুক্ত এক স্থাপত্যঐতিহ্য

সিলেটের জৈন্তাপুরের ঐতিহাসিক পান্থশালা, জৈন্তাপুর, পান্থশালা, ইরাবতী পান্থশালা, ঢুপির সরাইখানা, জৈন্তিয়া রাজ্য, সিলেট, বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নঐতিহ্য, ঢুপি মঠ, জৈন্তাপুর পর্যটন, Sylhet Tourism

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারীঘাট – ঢুপি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রত্নঐতিহ্যের মধ্যে একটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত স্থাপনা হলো প্রাচীন পান্থশালা বা সরাইখানা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ইরাবতী পান্থশালা’, ‘সারীঘাটের পান্থশালা’ কিংবা ‘ঢুপির সরাইখানা’ নামে পরিচিত। তবে এর নাম, নির্মাণকাল ও ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন জনশ্রুতি ও প্রকাশিত বর্ণনায় কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। তাই ইতিহাস ও লোকপ্রচলিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

 

জৈন্তিয়া রাজ্যের সাথে পান্থশালার সম্পর্ক

জৈন্তাপুর ছিল ঐতিহাসিক জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ (Rama Singh II)-এর শাসনামলে এ অঞ্চলে বেশ কিছু ধর্মীয় ও স্থাপত্যকীর্তি নির্মিত হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢুপি পাহাড়ে নির্মিত ধর্মীয় স্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট অতিথি ও তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য নিচের সমতল এলাকায় একটি পান্থশালা বা বিশ্রামাগার গড়ে তোলা হয়েছিল।

পান্থশালাটিকে তাই একক কোনো বিচ্ছিন্ন স্থাপনা হিসেবে না দেখে ঢুপি মঠ ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনা-সমষ্টির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। স্থানীয় ঐতিহ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে এটিকে রাজকীয় পুণ্যার্থী ও অন্যান্য অতিথিদের ব্যবহারের জন্য নির্মিত পান্থশালা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্মাণকাল: ১৭৯৭ না ১৭৯৮?

পান্থশালাটির নির্মাণসাল নিয়ে প্রকাশিত সূত্রে সামান্য মতভেদ রয়েছে। কোথাও ১৭৯৭ সাল, আবার কোথাও ১৭৯৮ সাল উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৯৮ সালের সাথে ঢুপি মঠে ‘রামেশ্বর শিব’ প্রতিষ্ঠার তথ্যটি তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

সুতরাং পান্থশালাটিকে নির্দিষ্টভাবে ১৭৯৭ সালের স্থাপনা হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার আগে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের নথি বা সমকালীন প্রামাণ্য দলিল যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত এটিকে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, রাজা দ্বিতীয় রামসিংহের আমলে নির্মিত স্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করাই বেশি তথ্যনিরাপদ।

জৈন্তাপুরের ঢুপি মঠ ও পান্থশালা

পান্থশালাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝার জন্য পাশের ঢুপি মঠের ইতিহাস জানা জরুরি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ ঢুপি পাহাড়ে একটি সুউচ্চ শিবমন্দির নির্মাণ করেন এবং ১৭৯৮ সালে সেখানে ‘রামেশ্বর শিব’ প্রতিষ্ঠা করেন। মঠের সেবার জন্য জমি দানের কথাও তাম্রলিপিতে পাওয়া যায় বলে উল্লেখ রয়েছে।

এ ধর্মীয় কেন্দ্রকে ঘিরে আগত পুণ্যার্থী, রাজপরিবারের অতিথি এবং অন্যান্য দর্শনার্থীদের সাময়িক অবস্থানের প্রয়োজন থেকেই পান্থশালাটির ব্যবহার গড়ে উঠেছিল বলে স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনায় ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এটি শুধু একটি বিশ্রামাগার নয়; বরং জৈন্তিয়া রাজ্যের ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামোর একটি অংশ হিসেবেও বিবেচনাযোগ্য।

‘ইরাবতী পান্থশালা’ নামটি কতটা ঐতিহাসিক?

বর্তমানে স্থাপনাটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘ইরাবতী পান্থশালা’ নামে। বিভিন্ন সংবাদ ও ভ্রমণবিষয়ক লেখাতেও এ নাম ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে ‘ইরাবতী’ নামে কোনো জৈন্তিয়া রাজকুমারী এবং তাঁর জন্যই পান্থশালাটি নির্মিত হয়েছিল — এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি। একইভাবে ‘ইরাবতী’ নামটি পরবর্তীকালের ইরা দেবী নামের বিকৃত রূপ — এ ব্যাখ্যাও প্রামাণ্য সূত্রে নিশ্চিত করা যায় না।

অতএব, ‘ইরাবতী পান্থশালা’কে সরকারি বা প্রামাণ্য ঐতিহাসিক নাম হিসেবে না ধরে একটি প্রচলিত স্থানীয় নাম হিসেবে উল্লেখ করা অধিক যুক্তিযুক্ত। ‘পান্থশালা’, ‘সরাইখানা’ বা ‘ঢুপির সরাইখানা’ — এ পরিচয়গুলো স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ব্যবহার সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি তথ্যবহ।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

স্থাপনাটি আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এর স্থাপত্যে স্থানীয় নির্মাণরীতির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। ইটের গাঁথুনি, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং দেয়ালের অলংকরণে লতাপাতা ও জ্যামিতিক মোটিফের ব্যবহার এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এটিকে সরাসরি ‘মোগল’, ‘বঙ্গীয় দোচালা’ কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থাপত্যশৈলীর অন্তর্ভুক্ত বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। বরং অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের স্থানীয় ও রাজকীয় নির্মাণরীতির একটি মিশ্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এর স্থাপত্যকে দেখা অধিক উপযুক্ত।

সময়ের সাথে ভূমির উচ্চতা পরিবর্তন, পলি ও মাটি জমা এবং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে ভবনটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে ভূমির/সড়ক লেভেলের নিচে বা নিম্নভূমির সাথে মিশে গেছে।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প ও পরবর্তী পরিবর্তন

জৈন্তাপুরের ঢুপি মঠ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপত্যসমষ্টি ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে। বিশেষ করে ঢুপি মঠের শিবমন্দিরের চূড়া ও পাথরের বৃষমূর্তি ধ্বংসের কথা পাওয়া যায়।

পান্থশালাটির বর্তমান অবস্থার সাথে এ দীর্ঘ ঐতিহাসিক ক্ষয়, পরিবেশগত পরিবর্তন ও পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনার ঘাটতি সম্পর্কিত হতে পারে। তবে স্থাপনাটির কোন অংশ কোন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা পরিবর্তিত হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য জরিপ প্রয়োজন।

কোথায় অবস্থিত?

পান্থশালাটি সিলেট–তামাবিল/জাফলং মহাসড়কের পাশে, সারী নদী পার হয়ে জৈন্তাপুরের দিকে যাওয়ার পথে ঢুপি এলাকার কাছে অবস্থিত। এর কাছেই ঐতিহাসিক ঢুপি মঠ। সারীঘাট অতিক্রম করার পর এ প্রাচীন স্থাপনাটি দেখা যায়।

সংরক্ষণ ও গুরুত্ব

জৈন্তাপুরের ঐতিহাসিক পান্থশালা শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের ধর্মীয়, সামাজিক ও যাতায়াত-সংস্কৃতির ইতিহাসের সাথে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে স্থাপনাটিকে ‘ঢুপির সরাইখানা’ হিসেবে উল্লেখ করে এর সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে।

স্থাপনাটির সঠিক ইতিহাস নির্ধারণের জন্য পুরোনো দলিল, তাম্রলিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, স্থাপত্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস — সবগুলো উৎসকে সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সাথে এর বর্তমান ভৌত অবস্থা নথিবদ্ধ করে যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়ন করা জরুরি।

শেষকথা

সারীঘাট – ঢুপি অঞ্চলের এ প্রাচীন পান্থশালা জৈন্তিয়া রাজ্যের হারিয়ে যেতে বসা স্থাপত্যঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রচলিত ‘ইরাবতী পান্থশালা’ নামটি এর জনপ্রিয় পরিচয় হলেও এর ইতিহাসকে শুধু রাজকুমারী ইরাবতীর কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। বরং রাজা দ্বিতীয় রামসিংহের আমলে ঢুপি মঠকেন্দ্রিক ধর্মীয় ও রাজকীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক বিশ্রামাগার হিসেবে এর গুরুত্বকে মূল্যায়ন করা অধিক বস্তুনিষ্ঠ।

এ পান্থশালা, ঢুপি মঠ এবং আশপাশের প্রত্ননিদর্শনগুলোকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে জৈন্তাপুরের হারিয়ে যাওয়া জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যকে আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।​


তথ্যসূত্র
​১. বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর (department of archaeology, bangladesh): সিলেট জেলার সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকা ও প্রত্নতাত্ত্বিক গ্যাজেট।
২. জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস ও স্মারকগ্রন্থ: জৈন্তার প্রাচীন রাজবংশ, রাম সিংহ (১৭৯৭) ও ঢুপি মঠ সংলগ্ন সরাইখানার দালিলিক ইতিহাস।
৩. স্থাননাম ও লোকসংস্কৃতি গবেষণা নিবন্ধ: সিলেটের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ঐতিহাসিক ও জনশ্রুতি বিশ্লেষণ।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL