পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি: ভাটি অঞ্চলের ইতিহাসের এক প্রাচীন স্মারক

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি। তিন শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এ স্থাপনাটি ভাটি অঞ্চলের জমিদারি প্রথা, সামাজিক ইতিহাস ও তৎকালীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। একসময় জমিদারি প্রশাসন, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এ বাড়িটি আজ সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অবস্থান
পাইলগাঁও জমিদার বাড়িটি সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৯ নম্বর পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামে অবস্থিত। জমিদার বাড়িটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কুশিয়ারা (কালনী) নদী। নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অবস্থান একে ভাটি অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবাহী স্থানে পরিণত করেছে।
জমিদার বাড়ির আয়তন ও স্থাপত্য
প্রায় ৫.৫ একর ভূমির উ পর বিস্তৃত পাইলগাঁও জমিদার বাড়িটি একসময় ছিল একটি বিশাল জমিদারি কমপ্লেক্স। স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্র অনুযায়ী, বাড়িটির বয়স ৩০০ বছরেরও বেশি।
জমিদার বাড়ির চত্বরে ছিল সুবিশাল রাজপ্রাসাদ, কাছারি ঘর, পূজামণ্ডপ, নাচঘর, গোপন কুঠুরি এবং বিশালাকার দীঘি। এসব স্থাপনা জমিদার পরিবারের আবাসিক জীবন, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাথে যুক্ত ছিল।
ভবনের নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে প্রাচীন ইট, চুন-সুরকি ও লোহার উপকরণ। ভবনের ছাদে ব্যবহৃত লোহার পাত এবং প্রাচীন নির্মাণশৈলীর বিভিন্ন অলংকরণ এখনও এর অতীত স্থাপত্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের ক্ষয় ও দীর্ঘদিনের অযত্নে স্থাপনাটির অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও অবশিষ্ট কাঠামো থেকে এর একসময়ের বিশালত্ব ও ঐশ্বর্যের ধারণা পাওয়া যায়।
পাইলগাঁও জমিদার বংশের ইতিহাস
পাইলগাঁও জমিদার বংশের ইতিহাসের সাথে রাঢ় অঞ্চলের একটি পরিবারের আগমন ও বসতির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, মঙ্গলকোট থেকে আগত গৌতম গোত্রীয় কানাইলাল ধর পাইলগাঁও এলাকায় গৃহজামাতা হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরদের মধ্যে বালক দাস এবং উমানন্দ ধর, যিনি ‘বিনোদ রায়’ নামেও পরিচিত ছিলেন, উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন।
পরবর্তীকালে বিনোদ রায়ের সময় পরিবারের সামাজিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির সম্রাট মুহাম্মদ শাহের আমলে তিনি ‘চৌধুরী’ পদবি বা সনদ লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে পরিবারটির জমিদারি পরিচয় আরও সুদৃঢ় হয়।
বিনোদ রায়ের উত্তরসূরি মাধব রাম পাইলগাঁও গ্রামে একটি বৃহৎ দীঘি খনন করেন। দীঘিটি বর্তমানে ‘মাধব রামের তালাব’ নামে পরিচিত বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ব্রজনাথ চৌধুরী জমিদারির সীমানা ও প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করেন।
ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই পুত্র ছিলেন রসময় চৌধুরী ও সুখময় চৌধুরী। তাঁদের সময়ে পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। স্থানীয়ভাবে জমিদারবাড়িটি একসময় রসময় চৌধুরীর বাড়ি হিসেবেও পরিচিত ছিল।
ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী: জমিদার ও সমাজসেবক
পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের ইতিহাসে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি শুধু জমিদার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সিলেট বিভাগের সভাপতি ছিলেন এবং তৎকালীন আসাম আইন পরিষদের সদস্য (MLA) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদানের উল্লেখ রয়েছে। সিলেটের চৌহাট্টায় অবস্থিত সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে তাঁর বিশেষ ভূমিকার কথা বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।
এছাড়া ১৯১৯ সালে পাইলগাঁও ব্রজনাথ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাথেও তাঁর নাম যুক্ত। জানা যায়, তাঁর কাকা সুখময় চৌধুরীর উদ্যোগে এবং ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
জমিদারি প্রথার অবসান
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের ইতিহাসেও বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সদস্যদের একটি অংশ ভারতে চলে যান বলে জানা যায়। পরবর্তীতে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতারও অবসান ঘটে।
পরিবারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘদিনের অযত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়ির বিভিন্ন স্থাপনা ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে পড়ে। প্রাসাদ, কাছারি ঘরসহ অন্যান্য স্থাপনার অনেক অংশ বর্তমানে ক্ষয়প্রাপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমান অবস্থা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বর্তমানে পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি তার অতীত জৌলুস অনেকটাই হারিয়েছে। তবুও এর প্রাচীন স্থাপত্য, দীঘি, জমিদারি কমপ্লেক্সের অবশিষ্টাংশ এবং স্থানীয় ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা স্মৃতি এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত করেছে।
পাইলগাঁও জমিদার বাড়ির গুরুত্ব কেবল একটি পুরোনো প্রাসাদ হিসেবে নয়। এটি সিলেট ও ভাটি অঞ্চলের জমিদারি ব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামো, শিক্ষা, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক জীবনের ইতিহাসের সাথে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। একই সাথে এর স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ঐতিহ্য পর্যটনের জন্যও সম্ভাবনাময়।
জমিদার বাড়িটিতে যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, ঐতিহাসিক গবেষণা, স্থাপত্য নথিভুক্তকরণ এবং সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে পাইলগাঁও জমিদার বাড়িকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত ঐতিহ্য পর্যটনের আওতায় আনা গেলে এ ঐতিহাসিক স্থানটি সুনামগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও বিকশিত হতে পারে।
শেষকথা
কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি আজ অতীতের একটি নীরব সাক্ষী। এর প্রাচীন ইট-পাথর, দীঘি, প্রাসাদ ও স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের সাথে জড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। জমিদারি ব্যবস্থার উত্থান, বিস্তার ও বিলুপ্তির পাশাপাশি শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেরও স্মৃতি বহন করে এ ঐতিহাসিক স্থাপনা।
সময়ের ক্ষয়ে পাইলগাঁও জমিদার বাড়ির অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি। বরং যথাযথ গবেষণা, সংরক্ষণ ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এ প্রাচীন স্থাপনা ভাটি অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র
১. সুনামগঞ্জ জেলা তথ্য বাতায়ন, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন — পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি, পর্যটন স্পট বিষয়ক তথ্য।
২. উইকিপিডিয়া — পাইলগাঁও জমিদারবাড়ী।
৩. Offroad Bangladesh — Pailgaon Zamindar Bari Travel Guide & History।
৪. দৈনিক ইত্তেফাক — পাইলগাঁও জমিদার বাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্যবিষয়ক প্রতিবেদন।
৫. The Asian Age — পাইলগাঁও জমিদার বাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক প্রতিবেদন।
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL