হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর দরগাহ: সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য

হযরত শাহ পরাণ, সিলেট, দরগাহ, সুফি ঐতিহ্য, ডালিম গাছের জনশ্রুতি, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান

সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর দরগাহ। সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এ দরগাহটি শুধু ধর্মীয় গুরুত্বের দিক থেকেই নয়, সিলেট অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও সুফি-ঐতিহ্যের ইতিহাসের সাথেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, হযরত শাহ পরাণ (র.) ছিলেন হযরত শাহজালাল (র.)-এর ভাগ্নে এবং সিলেটে আগত ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

অবস্থান

হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর দরগাহ সিলেট শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশে খাদিমনগর এলাকায় একটি ছোট টিলার উপর অবস্থিত। প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এ স্থানটি ধর্মীয় পর্যটন ও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর পরিচয়

প্রচলিত মতে, হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর প্রকৃত নাম ছিল ফারহাদ। তবে তিনি ইতিহাস ও লোকপরম্পরায় ‘শাহ পরাণ’ নামেই অধিক পরিচিত।

তিনি ছিলেন হযরত শাহজালাল (র.)-এর বোনের ছেলে। চতুর্দশ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (র.)-এর নেতৃত্বে সিলেট অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের যে ঐতিহাসিক উদ্যোগ গড়ে ওঠে, শাহ পরাণ (র.) সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।

দরগাহ প্রাঙ্গণ ও স্থাপত্য

দরগাহ শরিফটি একটি উঁচু টিলার উপর অবস্থিত। টিলার উপরে মাজারে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। দরগাহ প্রাঙ্গণে একটি বৃহৎ মসজিদও রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।

মাজারের পাশে অবস্থিত একটি প্রাচীন ডালিম বা আনার গাছ স্থানীয় লোকবিশ্বাসের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত বলে জানা যায় (?)। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর ব্যবহৃত মেসওয়াক বা লাঠি থেকে এ গাছের উৎপত্তি হয়েছিল। যদিও এটি মূলত লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তির অংশ, তবু দরগাহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

খাদিমনগরের প্রাকৃতিক পরিবেশে হযরত শাহ পরাণ (র.) দীর্ঘ সময় ইবাদত-বন্দেগি ও সাধনায় অতিবাহিত করেছিলেন বলে স্থানীয় ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়। এ কারণে স্থানটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সুফি-সাধনার স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবেও পরিচিত।

উরস ও ধর্মীয় আচার

প্রতি বছর স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর বার্ষিক উরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, অনুসারী ও জিয়ারতকারী এখানে সমবেত হন। উরসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আলোচনা, দোয়া, মিলাদ ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর দরগাহ সিলেটের সুফি-ঐতিহ্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং স্থানীয় লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। হযরত শাহজালাল (র.) ও তাঁর সঙ্গী আউলিয়াদের সাথে সম্পর্কিত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ দরগাহ সিলেটের ধর্মীয় পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয়।


তথ্যসূত্র

১. অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ ও উত্তরাংশ)।
২. এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলাপিডিয়া — ‘শাহ পরাণ (র.)’ ও সিলেট বিজয়-সম্পর্কিত নিবন্ধ।
৩. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, সিলেট জেলা প্রশাসন — ‘দর্শনীয় স্থান: হযরত শাহ পরাণ (র.)-এর মাজার’।
৪. দেওয়ান নূরুল আনওয়ার হোসেন চৌধুরী, সুফিসাধনা ও সিলেটে ইসলাম।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL