সিলেটের লামাবাজার গম্ভীর সিংয়ের তিন মন্দির: ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্য

তিন মন্দির, সিলেট, sylhet, সিলেটের লামাবাজারে রাজা গম্ভীর সিংয়ের তিন ঐতিহাসিক মন্দির

সিলেটের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে মণিপুরী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক। বিশেষত সিলেট নগরীর লামাবাজারে অবস্থিত তিন মন্দির কমপ্লেক্স মণিপুরী রাজপরিবারের সিলেট-অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। মণিপুরের ইতিহাসে ১৮১৯ সালে বার্মিজ বাহিনী মণিপুর আক্রমণ করে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজ্যটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এ রাজনৈতিক সংকটের ফলে রাজকুমার গম্ভীর সিংসহ মণিপুরের রাজপরিবারের সদস্যদের একাংশ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাজ্যের বাইরে সিলেট অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হন। সে সময় অঞ্চলটি ছিল অপেক্ষাকৃত নির্জন ও বনাঞ্চলপূর্ণ। সেখানে বসতি স্থাপন করে তাঁরা রাজপরিবারের আবাসস্থল ও ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করেন। ফলে রাজবাড়ির পাশাপাশি মন্দির নির্মাণও ছিল এ বসতির একটি স্বাভাবিক অংশ।

লামাবাজারের ‘তিন মন্দির’

মণিপুরী রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থিত তিনটি মন্দির। উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত মন্দিরগুলো একটি উঁচু, দক্ষিণমুখী ইটনির্মিত সাধারণ বেদির উপর স্থাপিত। বেদিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১৫.৫ মিটার। তিনটি মন্দিরের বিন্যাস, নির্মাণশৈলী এবং ধর্মীয় ব্যবহার মণিপুরী রাজপরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

১. প্রধান মন্দির: লাইনিংথৌ নংছাবা/রাধাগোবিন্দ মন্দির
তিনটি মন্দিরের মধ্যে প্রধান মন্দিরটি আকারে বৃহত্তম এবং স্থাপত্যগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় মন্দিরটির সাথে  লাইনিংথৌ নংছাবা এবং পরবর্তী বৈষ্ণব ঐতিহ্যের রাধাগোবিন্দ উপাসনার সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরটির উচ্চতা আনুমানিক ১৮.৫ মিটার; প্রস্থ প্রায় ৬.৪ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ মিটার। স্থাপনাটি মূলত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত — ভিত্তি, গর্ভগৃহ এবং উপরের উঁচু শঙ্কু বা পিরামিডাকৃতির ছাদ। মন্দিরের ছাদটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রায় ৭৫ ডিগ্রি ঢালযুক্ত এ ছাদ স্থাপনাটিকে উল্লম্ব ও সুউচ্চ আকৃতি দিয়েছে। নির্মাণে ইটের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী সুরকি ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। সুরকি সাধারণত ইটের গুঁড়া, চুন, জৈব উপাদান ও অন্যান্য উপকরণের সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হতো এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে এটি শক্তিশালী নির্মাণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

২. দ্বিতীয় মন্দির: ইুমজাও লাইরেম্বী মন্দির
প্রধান মন্দিরের পাশে অবস্থিত দ্বিতীয় মন্দিরটি মণিপুরী ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। ইুমজাও লাইরেম্বী মৈতেই সংস্কৃতিতে গৃহ ও পারিবারিক জীবনের সাথে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ দেবীসত্তা। রাজপরিবারের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এ ধরনের দেব-দেবীর উপাসনার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
পরবর্তী সময়ে মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের সাথে রাধাগোবিন্দ ও জগন্নাথের মতো বৈষ্ণব দেবতার উপাসনাও রাজপরিবারের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মির্জাজাঙ্গালের মন্দিরসমূহ সেই ধর্মীয় পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের একটি প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মন্দিরটির স্থাপত্যে ইটনির্মিত দেয়াল, খাঁজকাটা অলংকরণ এবং অলংকারধর্মী নকশার উপস্থিতি এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে প্রাচীন অলংকরণের কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও স্থাপনাটির ঐতিহাসিক চরিত্র এখনও সুস্পষ্ট।

৩. তৃতীয় মন্দির: ক্ষুদ্র মঠ বা দেউলশৈলীর মন্দির
তৃতীয় মন্দিরটি অন্য দুটি মন্দিরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট। এটি মূল বেদিপ্রাঙ্গণের এক পাশে অবস্থিত এবং ইটনির্মিত ক্ষুদ্র দেউল বা মঠশৈলীর স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এ মন্দিরের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। মণিপুরী ঐতিহ্যের স্থানীয় দেবতা এবং হিন্দু ধর্মীয় দেব-দেবীর উপাসনার সাথে এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে নংছাবা বা শিব-সম্পর্কিত উপাসনার স্মারক হিসেবে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

তিনটি মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান মণিপুরী রাজপরিবারের ধর্মীয় জীবনের বহুমাত্রিকতাকে তুলে ধরে। মৈতেই ঐতিহ্য, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পরবর্তী বৈষ্ণব প্রভাব — এ বিভিন্ন ধারার সমন্বয় মন্দির কমপ্লেক্সটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

শেষকথা
সিলেটের লামাবাজারের তিন মন্দির বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য সীমান্ত-পারাপারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর সাথে যেমন মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস ও রাজা গম্ভীর সিংয়ের সংগ্রামের সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি সিলেটের মাটিতে মণিপুরী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিকড় গড়ে ওঠার ইতিহাসও এর সাথে জড়িত।
রাজবাড়ীর অধিকাংশ স্থাপত্য বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তিন মন্দির এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজও অতীতের সেই অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষ্য। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এ মন্দির কমপ্লেক্সকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশ–মণিপুর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যস্থল হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।


তথ্যসূত্র
১. জাতীয় তথ্য বাতায়ন (সিলেট জেলা পুরাকীর্তি ও পর্যটন): মির্জাজাঙ্গাল মণিপুরী রাজবাড়ী ও পুরাকীর্তি নিবন্ধ, জেলা প্রশাসন, সিলেট।
২. উইকিপিডিয়া (ইংরেজি & বাংলা): Meitei monuments in Bangladesh (Manipuri Rajbari & Gambhir Singh Temple Complex) এবং তিন মন্দির (রাজা গম্ভীর সিং-এর মন্দির)।
৩. E-Pao Academic Directory (Art and Culture): Mutua Bahadur Art Collection on Meitei Settlements in Bangladesh & Myanmar.
৪. Cheitharol Kumbaba (Court Chronicle of the Kings of Manipur): রাজা গম্ভীর সিং-এর সিলেট অবস্থান ও ১৮১৯-১৮২৬ সালের সামরিক ইতিহাস বিষয়ক বিবরণ।
৫. Parratt, Saroj Nalini Arambam (2005): The Court Chronicle of the Kings of Manipur, Routledge, London.


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL