উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ: সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ। হবিগঞ্জ জেলার রাজিউড়া ইউনিয়নের উচাইল (শংকরপাশা) গ্রামে অবস্থিত এ প্রাচীন মসজিদ স্থানীয়ভাবে ‘লাল মসজিদ’, ‘টিলা মসজিদ’ কিংবা ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতি, প্রাচীন ইটের নির্মাণশৈলী, টেরাকোটা অলংকরণ এবং স্থানীয় লোকবিশ্বাস — সব মিলিয়ে মসজিদটি বাংলাদেশের মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
ইতিহাস ও নির্মাণকাল
শংকরপাশা শাহী মসজিদের ইতিহাস স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও জনশ্রুতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কথিত আছে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেট বিজয়ের পর তাঁর সফরসঙ্গীদের অন্যতম এবং তরফ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত হজরত শাহ মজলিশ আমিন (রহ.) এ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। তাঁর উদ্যোগে এখানে প্রাথমিকভাবে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।
পরবর্তীকালে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে মসজিদটির পাকা ইমারত নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। হোসেন শাহ ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত বাংলার সুলতান ছিলেন। মসজিদটির সাথে সম্পর্কিত প্রাচীন শিলালিপির ভিত্তিতে এর নির্মাণকাল ষোড়শ শতাব্দীর সূচনালগ্নের সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাল আনুমানিক ১৫১৩ সাল।
এ সময়টি বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুলতানি আমলে স্থানীয় নির্মাণ উপকরণ, ইটের অলংকরণ এবং বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ইসলামী স্থাপত্যরীতির সাথে সমন্বিত হয়ে একটি স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি করেছিল। শংকরপাশা শাহী মসজিদ সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
অবস্থান ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
মসজিদটি সমতল ভূমি থেকে কিছুটা উঁচু একটি প্রাকৃতিক টিলার উপর অবস্থিত। প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথেও একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক সম্পর্ক তৈরি করেছে।
মসজিদের মূল প্রার্থনা কক্ষটি প্রায় বর্গাকার। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। মূল ভবনের সম্মুখভাগে একটি বারান্দা রয়েছে। স্থাপনাটির নির্মাণে পোড়ামাটির ইট ব্যবহৃত হয়েছে, যা সুলতানি আমলের বাংলার স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান।
মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ এর গম্বুজ বিন্যাস। মূল প্রার্থনা কক্ষের উপর রয়েছে একটি বড় গম্বুজ এবং সামনের বারান্দার উপর রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট তিনটি গম্বুজ। ফলে পুরো স্থাপনাটি মোট চারটি গম্বুজবিশিষ্ট। ভবনের বিভিন্ন অংশে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ বা অলংকৃত স্তম্ভও রয়েছে, যা স্থাপনাটির বহিরঙ্গকে আরও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।
মসজিদের দেয়াল অত্যন্ত পুরু। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট এবং পশ্চিম দিকের কিবলা দেয়াল প্রায় দশ ফুট পুরু বলে উল্লেখ করা হয় (?)। এত পুরু দেয়াল তৎকালীন নির্মাণপ্রযুক্তি ও স্থাপত্যগত নিরাপত্তাবোধের পরিচয় বহন করে।
টেরাকোটা ও অলংকরণ
শংকরপাশা শাহী মসজিদের স্থাপত্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর অলংকরণ। পোড়ামাটির ইটের গায়ে বিভিন্ন নকশা, ফুলের মোটিফ, বাঁকানো কার্নিশ এবং খিলানযুক্ত প্রবেশপথের ব্যবহার স্থাপনাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
বাংলার প্রাচীন মসজিদ স্থাপত্যে পাথরের তুলনায় ইট ছিল সহজলভ্য ও ব্যবহারযোগ্য নির্মাণ উপকরণ। ফলে ইটের গায়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা এবং টেরাকোটা অলংকরণের মাধ্যমে স্থাপত্যকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার একটি বিশেষ ধারা গড়ে ওঠে। শংকরপাশা মসজিদে সেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মসজিদের বহির্ভাগে আলাদা প্লাস্টারের ব্যবহার নেই। পোড়ামাটির ইট ও অলংকরণই স্থাপনাটির বহিরঙ্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই স্থানীয়ভাবে এটি ‘লাল মসজিদ’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
মাজার ও প্রাচীন দীঘি
মসজিদের পাশেই রয়েছে হজরত শাহ মজলিশ আমিন (রহ.)-এর মাজার। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকে মসজিদ ও মাজারের এ নৈকট্য স্থানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
মসজিদের দক্ষিণ দিকে রয়েছে একটি বৃহৎ প্রাচীন দীঘি। প্রাচীন স্থাপনার সাথে জলাধারের অবস্থান তৎকালীন জনবসতি ও ধর্মীয় স্থাপনা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। মসজিদ, মাজার, দীঘি এবং উঁচু ভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামগ্রিক পরিবেশটি স্থানটির ঐতিহাসিক চরিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
‘গায়েবি মসজিদ’ নামের পেছনের জনশ্রুতি
শংকরপাশা শাহী মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বেশ কিছু আকর্ষণীয় জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘গায়েবি মসজিদ’-এর কাহিনি।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, কোনো এক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় পর সেখানে আবার বসতি গড়ে উঠলে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় মসজিদ ও সংলগ্ন মাজারের সন্ধান পাওয়া যায়। দৃশ্যমান নির্মাণপ্রক্রিয়া বা কারিগরদের কোনো স্মৃতি স্থানীয় মানুষের কাছে না থাকায় মসজিদটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
তবে এ কাহিনিকে ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতি হিসেবে দেখা উচিত। এ ধরনের জনশ্রুতি একটি প্রত্নস্থানের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
শংকরপাশা শাহী মসজিদ শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে মসজিদটি জামে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় মুসল্লিরা এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন এবং জুমার নামাজেও অংশগ্রহণ করেন।
একই সাথে এটি ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রত্নঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহী মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। প্রাচীন মসজিদের স্থাপত্য, মাজার, দীঘি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ — সবকিছু মিলিয়ে স্থানটি একটি সমন্বিত ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এগুলো দেশের সামাজিক ইতিহাস, স্থাপত্যের বিবর্তন এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল। শংকরপাশা শাহী মসজিদ সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
এ ধরনের স্থাপনার সংরক্ষণে শুধু ভবনের কাঠামো রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। মসজিদকে ঘিরে থাকা মাজার, দীঘি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, লোককথা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ সাইনেজ, ঐতিহাসিক তথ্যপ্যানেল, ডিজিটাল গাইড ও যথাযথ পর্যটন ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
শেষকথা
হবিগঞ্জের উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ বাংলার মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সুলতানি আমলের নির্মাণরীতি, পুরু ইটের দেয়াল, গম্বুজ, বুরুজ, টেরাকোটা অলংকরণ এবং প্রাচীন পরিবেশ — সবকিছু মিলে এটি বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান সম্পদ।
অন্যদিকে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামকে ঘিরে প্রচলিত জনশ্রুতি স্থানটির সাথে স্থানীয় মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গভীর সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। তাই শংকরপাশা শাহী মসজিদকে কেবল একটি প্রাচীন মসজিদ হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও স্থানীয় স্মৃতির সম্মিলিত প্রত্নঐতিহ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্যের ইতিহাসে এ মসজিদের যথাযথ গবেষণা, সংরক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ত ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সুলতানি বাংলার এ গুরুত্বপূর্ণ স্মারক আরও অর্থবহভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাপিডিয়া, শংকরপাশা মসজিদ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
২. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, শংকরপাশা জামে মসজিদ, রাজিউড়া ইউনিয়ন, হবিগঞ্জ সদর।
৩. শংকরপাশা শাহী মসজিদ, উইকিপিডিয়া।
৪. দৈনিক প্রথম আলো, হবিগঞ্জের শঙ্করপাশা শাহি মসজিদ, মে ২০২৩।
৫. দৈনিক ইত্তেফাক, হবিগঞ্জের শংকরপাশা শাহী মসজিদ, মে ২০২৩।
৬. দৈনিক সমকাল ও ইনকিলাব-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও আর্কাইভ।
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL