মশালচি: মশালবাহক থেকে রান্নাঘরের সহায়ক

masalci, mashalci, মশালচি,

মশালচি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম শাসনামল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের গৃহস্থালিতে একটি পরিচিত সেবক-পদ। প্রধান কাজ ছিল মশাল বহন করে রাতের অন্ধকারে পথ দেখানো। কালক্রমে, বিশেষত ঔপনিবেশিক যুগের গৃহস্থালিতে, মশালচিরা থালাবাসন পরিষ্কারসহ রান্নাঘরের নানা সহায়ক কাজেও যুক্ত হন।

‘মশালচি’ শব্দের উৎপত্তি

‘মশালচি’ শব্দটি ফারসির মাধ্যমে উপমহাদেশে এসেছে। এর প্রথম অংশ ‘মশাল’ আরবি মাশ‘আল (মশাল) থেকে আগত। ‘-চি’ প্রত্যয়টি তুর্কি ভাষা থেকে ফারসিতে ঢুকেছে এবং কোনো কাজ বা পেশার সাথে যুক্ত ব্যক্তিকে বোঝায়। বাংলায় প্রচলিত ‘বাবুর্চি’ ও ‘তোপচি’ শব্দেও এ প্রত্যয় আছে। সুতরাং মশালচির আক্ষরিক অর্থ ‘মশালবাহক’। উর্দু অভিধানেও শব্দটির মূল অর্থ মশালবাহক বা মশাল জ্বালানোর ব্যক্তি।

মশালচির আদি কাজ

বিদ্যুতের প্রচলনের আগে রাতের আলোর উৎস ছিল মশাল, প্রদীপ ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর বাতি। রাজদরবার, অভিজাত পরিবার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাতের চলাচলে মশালচিরা সামনে বা পাশে মশাল ধরে পথ আলোকিত করতেন। মশাল জ্বালানো ও জ্বালানি প্রস্তুত রাখাও তাঁদের দায়িত্ব ছিল। আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায়ও তাঁদের ভূমিকা ছিল।

পেশার পরিবর্তন: আলো থেকে রান্নাঘর

ঔপনিবেশিক ভারতের গৃহস্থালির বিবরণে মশালচিকে মশালবাহকের পাশাপাশি রান্নাঘরের সহায়ক হিসেবেও পাওয়া যায়। ইঙ্গ-ভারতীয় অভিধান Hobson-Jobson (প্রথম প্রকাশ ১৮৮৬, সম্প্রসারিত সংস্করণ ১৯০৩) অনুযায়ী শব্দটির প্রযুক্তিগত অর্থ মশালবাহক, তবে ব্রিটিশ ভারতে এটি বেশি ব্যবহৃত হতো এক ধরনের নিম্নপদস্থ গৃহভৃত্য বোঝাতে। আগে তাঁর কাজ ছিল মশাল বহন, পরে তিনি বাতির দেখাশোনা ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ করতেন। অভিধান তাঁকে পুরোনো ইংরেজিতে ‘scullion’ (রান্নাঘরের নিম্নস্তরের কর্মী) বলেছে।

গৃহস্থালিতে তাঁদের কাজের মধ্যে ছিল থালা-বাসন ও হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা এবং ছোটখাটো কাজে সহায়তা করা। এ দ্বিমুখী ভূমিকা সম্ভবত এ কারণে তৈরি হয়েছিল যে মশালের কাজ ছিল মূলত সন্ধ্যা ও রাতে, ফলে দিনের বেলায় তাঁদের অন্য কাজে লাগানো হতো। পরবর্তীকালে কেরোসিনের বাতি ও বিদ্যুতের বিস্তারে মশাল বহনের প্রয়োজন কমে গেলে রান্নাঘরের কাজটিই তাঁদের প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। (এটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, যা সরাসরি প্রমাণিত তথ্য নয়)

গৃহস্থালির কাজের বিভাজনে মশালচির অবস্থান

বড় বাড়ি ও অভিজাত গৃহস্থালিতে কাজ ভাগ করা থাকত। বাবুর্চি রান্না করতেন, খানসামা খাবার পরিবেশন ও ভোজের তদারকিসহ গৃহস্থালির নানা ব্যবস্থাপনা সামলাতেন এবং ভিস্তি পানি সরবরাহ করতেন। এঁদের তুলনায় মশালচির কাজ ছিল সহায়ক ও কায়িক শ্রমনির্ভর, এবং সামাজিক মর্যাদাও ছিল নিচের স্তরে। তবে সব পরিবারে দায়িত্ব এক রকম ছিল না। গৃহস্থালির আকার, আর্থিক সামর্থ্য, সময় ও অঞ্চলভেদে কাজের পরিধি বদলাত।

বর্তমান অবস্থা

আধুনিক আলোকব্যবস্থার ফলে মশালবাহক হিসেবে মশালচির পেশা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। হিন্দি ও উর্দুতে ‘মশালচি’ শব্দটি এখনও কিছু ক্ষেত্রে রান্নাঘরের সহায়ক বা থালাবাসন পরিষ্কারের কর্মী অর্থে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক হোটেল-রেস্তোরাঁর ‘কিচেন হেল্পার’ বা ‘ডিশওয়াশার’ পদের সাথে এর কাজের মিল আছে, যদিও ঐতিহাসিক মশালচির দায়িত্বের পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত।

শেষকথা

মশালচির ইতিহাস শুধু একটি পেশার বিলুপ্তির গল্প নয়; এতে প্রযুক্তির পরিবর্তন, ঔপনিবেশিক গৃহস্থালি ব্যবস্থা এবং শ্রমের সামাজিক বিভাজনের ছাপও দেখা যায়। একসময় রাতের অন্ধকারে আলো বহনকারী মানুষটি পরে রান্নাঘরের সহায়ক হিসেবে পরিচিত হন। পেশাটির পুরোনো রূপ হারিয়ে গেলেও ‘মশালচি’ শব্দটি অতীতের কর্মজীবন ও সমাজের এক স্মারক হয়ে টিকে আছে।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL