ভিস্তিওয়ালা: হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যবাহী পেশা

ভিস্তিওয়ালা, ভিস্তিওয়ালার ইতিহাস, ভিস্তি পেশা, মশক, চামড়ার মশক, হারিয়ে যাওয়া পেশা, বিলুপ্ত পেশা, প্রাচীন বাংলার পেশা, পুরান ঢাকার ইতিহাস, বাংলাদেশের ঐতিহ্য, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পেশা, পানি সরবরাহের ইতিহাস, প্রাচীন নগরজীবন, বাংলার সামাজিক ইতিহাস, Bisti, Bheestie, Water Carrier History, Traditional Occupations of Bengal, Lost Professions of India

একসময় বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের শহর ও জনপদে পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন ভিস্তিওয়ালারা। বাড়ি বাড়ি, দোকানপাট, অভিজাত বাসভবন কিংবা পথচারীদের জন্য নির্ধারিত পানির স্থানে পানি বা জল পৌঁছে দেয়াই ছিল তাঁদের প্রধান কাজ। আধুনিক পানির সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে এ পেশা ছিল নগরজীবনের একটি পরিচিত অংশ।

মশক: পানি বহনের বিশেষ থলে/ব্যাগ

ভিস্তিওয়ালাদের প্রধান উপকরণ ছিল ছাগল বা ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি একধরনের পানি বহনের থলে, যা ‘মশক’ বা ‘মশাক’ নামে পরিচিত। থলেটি এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে এর ভেতরে পানি ধরে রাখা যায়। মশক কাঁধে নিয়ে কিংবা শরীরের সাথে ঝুলিয়ে তাঁরা বিভিন্ন স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দিতেন।

কী ছিল ভিস্তিওয়ালাদের প্রধান কাজ?

বর্তমান সময়ের মতো সর্বত্র নলকূপ, পানির ট্যাপ কিংবা আধুনিক পাইপলাইনের ব্যবস্থা না থাকায় পানির জন্য মানুষকে কূপ, পুকুর, দিঘি ও অন্যান্য জলাধারের ওপর নির্ভর করতে হতো। ভিস্তিওয়ালারা এসব উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন। এ ছাড়া দোকানপাট, বাজার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অভিজাত পরিবারের বাসভবনেও তাঁরা পানি সরবরাহ করতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরমের দিনে তৃষ্ণার্ত পথচারীদের পানির ব্যবস্থা করা এবং ধুলাবালি কমাতে রাস্তায় পানি ছিটিয়ে দেয়াও তাঁদের কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পুরান ঢাকার জীবনে ভিস্তিওয়ালাদের ভূমিকা

বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নগরজীবনে ভিস্তিওয়ালাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ঢাকার নবাব ও বিত্তশালী পরিবারের বাসভবন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরেও তাঁদের পানি সরবরাহের প্রয়োজন হতো। এ ছাড়া জনসাধারণের পানি পানের জন্য নির্মিত কিছু জলসেবাকেন্দ্রেও তাঁরা পানি পৌঁছে দিতেন। আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে তাঁদের শ্রম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘ভিস্তি’ নামের উৎপত্তি কোথা থেকে?

‘ভিস্তি’ শব্দটির উৎস ফারসি ভাষার বেহেশতি বা বেহেশ্তি শব্দের সাথে সম্পর্কিত বলে প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। এর সাথে স্বর্গীয় স্বস্তি বা কল্যাণের ধারণা যুক্ত। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দিয়ে স্বস্তি দেয়ার কারণে এ পেশাজীবীদের এমন নামে ডাকা হতো বলে মনে করা হয়।

বাংলা সাহিত্যেও রয়েছে ভিস্তিওয়ালাদের উপস্থিতি

ভিস্তিওয়ালা ও তাঁদের ব্যবহৃত মশক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন রচনায় স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জুতা আবিষ্কার কবিতায় ভিস্তির উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের এ উপস্থিতি প্রমাণ করে, একসময় পেশাটি শুধু জীবিকার মাধ্যমই ছিল না; বরং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির পরিচিত অনুষঙ্গও ছিল।

কেন হারিয়ে গেল ভিস্তিওয়ালাদের পেশা?

বিংশ (২০শ) শতাব্দীতে শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং গ্রামাঞ্চলে নলকূপের বিস্তার ঘটতে থাকায় ভিস্তিওয়ালাদের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমে যায়। ধীরে ধীরে পানি বহনের আধুনিক ব্যবস্থা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পেশাটিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে। ফলে একসময় জনজীবনের পরিচিত এ পেশা ক্রমেই হারিয়ে যায়।

আজ ভিস্তিওয়ালাদের পেশা মূলত অতীতের নগরজীবন, শ্রমের ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্যের একটি স্মারক। তাঁদের ব্যবহৃত চামড়ার মশক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক নাগরিক সুবিধার বিস্তারের আগে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে কত বিচিত্র পেশার মানুষ নিরলস পরিশ্রম করতেন।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL