পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায় কি শুধু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের?

Ancient terracotta plaques with carvings, Ancient ruins surrounded by greenery, Ananda Vihara, Ananda Raja Palace, Buddhist Monastery Bangladesh, Ancient Buddhist Architecture, Avalokitesvara Bronze Image, Buddhist Archaeology, Terracotta Plaques, Copperplate Inscription, Ancient Monastic Complex, Ananda Vihara, Buddhist Monastery, Archaeology, Ancient Bengal, Avalokitesvara, Buddhist Heritage, Terracotta Art, Monastic Architecture, পুরাকীর্তি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ আইন, হেরিটেজ সাইট, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, রাজউক, স্থানীয় সরকার আইন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন, প্রশাসনিক কাঠামো ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের আলোকে একটি পর্যালোচনা

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো এ দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রাচীন নগর, দুর্গ, প্রাসাদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ, সমাধি, জমিদারবাড়ি, ঐতিহাসিক জলাধার, প্রত্নবস্তু এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের অতীতের দলিল। এগুলো কেবল পুরোনো ইট-পাথরের কাঠামো নয়; বরং একটি সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সাক্ষ্য।

এ ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়— দেশের সব পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায় কি কেবল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের?

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উত্তরটি সরলভাবে ‘হ্যাঁ’ নয়। বরং প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের আইনগত সুরক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকলেও ঐতিহ্যবাহী স্থান, ভবন, ভূমি, পরিবেশ, নগর কাঠামো ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার সাথে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে কার্যকর ঐতিহ্য সংরক্ষণ বাস্তবে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

১. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আইনগত অবস্থান

বাংলাদেশে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের মূল আইন হলো The Antiquities Act, 1968 (Act No. XIV of 1968)। আইনটি ‘antiquity’ বা পুরাকীর্তি’র পরিধি বেশ বিস্তৃতভাবে নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রাচীন মানবসৃষ্ট স্থাপনা ও বস্তু ছাড়াও ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, সামরিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তু ও স্থান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এমনকি বিশেষ মূল্যসম্পন্ন কোনো নগর-স্থান, সড়ক, ভবনসমষ্টি বা জনচত্বরকেও সরকার গেজেটের মাধ্যমে স্থাবর পুরাকীর্তি (immovable antiquity) হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।

এ আইনের অধীনে সরকার কোনো পুরাকীর্তিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি (protected antiquity) হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। আইনে প্রত্নসম্পদের সংরক্ষণ, পরিদর্শন, সুরক্ষা, প্রবেশাধিকার, বিক্রয় ও প্রত্নবস্তুর হেফাজতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে। কোনো মালিকবিহীন পুরাকীর্তির অস্তিত্ব সম্পর্কে Director General of Archaeology অবহিত হলে তার হেফাজত, সংরক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাও আইনে দেয়া হয়েছে।

অতএব, সংরক্ষিত পুরাকীর্তির ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ, গবেষণা, খনন, নথিভুক্তকরণ ও প্রত্নবস্তু ব্যবস্থাপনায় এটি রাষ্ট্রের প্রধান ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। তবে এখানেই পুরো বিষয়টির সমাপ্তি নয়।

২. ‘পুরাকীর্তি’ এবং ‘ঐতিহ্য’—দুটি কি একই বিষয়?

ঐতিহ্য সংরক্ষণের আলোচনায় একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।

প্রত্নতত্ত্ব আইন মূলত আইনে সংজ্ঞায়িত ও ঘোষিত antiquity বা পুরাকীর্তির উপর বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করে। তবে একটি দেশের ঐতিহ্য তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— কোনো শতবর্ষী ঐতিহাসিক ভবন, পুরোনো বাজার, ঐতিহাসিক রাস্তা, জমিদারবাড়ি, দীঘি, পুরোনো নগরপাড়া, ঔপনিবেশিক স্থাপনা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূ-দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপ (landscape) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় নাও থাকতে পারে। তবে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্য অস্বীকার করা যায় না।

এখানেই প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ (archaeological conservation) এবং বৃহত্তর ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা (heritage management) – এর মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

৩. স্থানীয় সরকারের আইনগত ভূমিকা

ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায়, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এ।

পৌরসভা আইন, ২০০৯-এর দ্বিতীয় তফসিল, পৌরসভার বিস্তারিত কার্যাবলীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধীন ধারা ৫৯-এ পৌরসভার বিভিন্ন ঐচ্ছিক কার্যাবলির মধ্যে পৌর এলাকার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থান সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই ধারায় জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা এবং নগর ভ্রমণের ব্যবস্থার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথাও রয়েছে।

অপরদিকে নগর ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকার আইনি ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একটি বিশ্লেষণে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলের সংস্কৃতির ধারা ২৬.৭-এর অধীনে ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থান বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা পরিষদ আইন, ২০০০এর প্রথম তফসিলের দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত ঐচ্ছিক কার্যাবলীর মধ্যে স্থানীয় এলাকার “ঐতিহাসিক এবং আদি বৈশিষ্ট্যসমূহ সংরক্ষণ” অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সাথে জাদুঘর ও আর্ট-গ্যালারি স্থাপন এবং সংস্কৃতি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা একটি শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত হলে তার সংরক্ষণ শুধু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিষয় নয়; স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষেরও এখানে ভূমিকা রয়েছে।

৪. নগর পরিকল্পনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

আধুনিক নগরায়নের সবচেয়ে বড় চাপের মুখে রয়েছে শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। নতুন ভবন নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক ব্যবহার, উচ্চ ভবন নির্মাণ কিংবা অপরিকল্পিত সংস্কার অনেক সময় ঐতিহাসিক স্থাপনার অস্তিত্ব ও পারিপার্শ্বিক চরিত্রকে হুমকির মুখে ফেলে।

ঢাকার ক্ষেত্রে রাজউকের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও বিধিমালায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও এলাকার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ এবং পরবর্তী পরিকল্পনা কাঠামোর অধীনে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও heritage area-এর ক্ষেত্রে নির্মাণ ও পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শিক্ষা হলো — ঐতিহ্য সংরক্ষণকে যদি নগর পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, তাহলে শুধু মূল ভবন সংরক্ষণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কারণ ঐতিহ্য শুধু একটি ভবন নয়; অনেক সময় ভবনটির চারপাশের রাস্তা, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান, প্রতিবেশী স্থাপনা এবং সামগ্রিক নগর বিন্যাসও তার ঐতিহাসিক মূল্য বহন করে।

৫. ভূমি প্রশাসনের ভূমিকা

অনেক প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক স্থান সরকারি জমি, খাস জমি কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীন ভূমিতে অবস্থিত। ফলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের সাথে ভূমির মালিকানা, রেকর্ড, সীমানা, দখল এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা সরাসরি যুক্ত।

কোনো প্রত্নস্থল সংরক্ষিত ঘোষণা করা হলেও যদি তার সীমানা নিয়ে জটিলতা থাকে, অবৈধ দখল হয় অথবা জমির ব্যবহার পরিবর্তিত হয়, তাহলে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ভূমি প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।

এখানে দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন — প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ও সংরক্ষণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ; আর ভূমি প্রশাসন ভূমির আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৬. পরিবেশ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী ভূ-দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপ (landscape)

ঐতিহ্য সংরক্ষণকে কেবল স্থাপত্য সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যায়। বাংলাদেশের বহু প্রত্নস্থলের সাথে যুক্ত রয়েছে দীঘি, পুকুর, নদী, খাল, টিলা, বৃক্ষরাজি কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান। এসব উপাদান ধ্বংস হলে স্থাপনার ঐতিহাসিক পরিবেশও পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ। আইনটি সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের প্রধান আইন নয়; তবে পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ভূ-দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপ (landscape) রক্ষায় এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

সুতরাং পরিবেশ অধিদপ্তরকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত ঐতিহ্যবাহী ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনা (heritage landscape management) – এর অংশীদার হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

৭. পর্যটন খাতের ভূমিকা

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে পর্যটনের উদ্দেশ্য শুধু দর্শনার্থী বৃদ্ধি নয়; ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে তার টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড আইন, ২০১০ বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প ও সেবার সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

এখানে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের পার্থক্য পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মূল কাজ প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা; অপরদিকে পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যকে পর্যটন সম্পদ হিসেবে দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন, প্রচার ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত। তাই একটি প্রত্নস্থল বা পুরাকীর্তিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ প্রথম, পর্যটন দ্বিতীয় (conservation first, tourism second) নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

৮. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাজেট ও জনবল: বাস্তব সীমাবদ্ধতা

আইনি দায়িত্বের পাশাপাশি বাস্তব সক্ষমতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি স্থানে নিয়মিত সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, গবেষণা, নথিভুক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিপুল জনবল ও অর্থ প্রয়োজন।

তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মূলত একটি বিশেষায়িত কারিগরি ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি প্রত্নস্থল বা ঐতিহাসিক স্থানের স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশি নিরাপত্তা, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন অবকাঠামোর সব দায়িত্ব একই প্রতিষ্ঠানের উপর চাপিয়ে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ সক্ষমতাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ দায়িত্ব কার্যকর করা প্রয়োজন।

৯. তাহলে দায় কার?

আইনি বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার — দায় এবং এখতিয়ারকে এক করে দেখা উচিত নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপর নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ-সংক্রান্ত বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তবে একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার জমি, রাস্তা, আশপাশের ভবন, পরিবেশ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা কিংবা স্থানীয় জনসম্পৃক্ততার বিষয়গুলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই দায়িত্বকে এভাবে দেখা যেতে পারে:

 

ক্ষেত্র

প্রধান/গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান

ভূমিকা

 প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ  প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর  গবেষণা, খনন, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা
 পুরাকীর্তি ঘোষণা  সরকার/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ  আইনি ঘোষণা ও সুরক্ষা
 ভূমি ব্যবস্থাপনা  ভূমি প্রশাসন  রেকর্ড, সীমানা, দখল ও ভূমি ব্যবস্থাপনা
 স্থানীয় ঐতিহাসিক স্থান  পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন  স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা
 নগর ঐতিহ্য  উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  পরিকল্পনা ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ
 পরিবেশ  পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ  পরিবেশগত সুরক্ষা
 পর্যটন  পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান  টেকসই পর্যটন ও প্রচার
 গবেষণা ও শিক্ষা  বিশ্ববিদ্যালয়/গবেষণা প্রতিষ্ঠান  গবেষণা, নথিভুক্তকরণ ও ঐতিহ্য শিক্ষা
 স্থানীয় সম্পৃক্ততা  স্থানীয় জনগণ/নাগরিক সমাজ  স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও অংশগ্রহণ

 

এটি কোনো আইনগতভাবে নির্ধারিত একক দায়িত্বের তালিকা নয়; বরং বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিতে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টনের একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো।

১০. প্রয়োজন একটি জাতীয় ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো (heritage management framework)

বাংলাদেশে ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হতে পারে একটি সমন্বিত জাতীয় ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো (national heritage management framework)

এ কাঠামোর আওতায়—

১. দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা (inventory) তৈরি;

২. প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থাপত্যিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য পৃথকভাবে শ্রেণিবিন্যাস;

৩. প্রতিটি ঐতিহ্যের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ;

৪. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা;

৫. Heritage Impact Assessment (HIA)-এর মাধ্যমে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ঐতিহ্যের প্রভাব মূল্যায়ন;

৬. স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অংশীদার করা;

৭. বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সহযোগিতা;

৮. ডিজিটাল inventory, GIS mapping এবং নিয়মিত condition assessment;

৯. ঐতিহ্য পর্যটন থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ সংরক্ষণে পুনর্বিনিয়োগ;

১০. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) ও CSR-এর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

১১. আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার

পুরাকীর্তি ধ্বংস হলে প্রায়ই প্রশ্ন উঠে — “প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কী করছিল?”

প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কারণ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দেশের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের প্রধান বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। তবে একই সাথে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন — যে সম্পদটি যে এলাকার ভূমি, নগর, পরিবেশ ও স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ, সেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো কী ভূমিকা পালন করেছে?

একটি ঐতিহাসিক ভবন ভাঙা ঠেকাতে শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভূমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস।

অর্থাৎ, ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্বকে ‘একটি দপ্তরের কাজ’ হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি অংশই দেখা হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভূমিকা কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য। বিশেষ করে আইনে সংজ্ঞায়িত ও সংরক্ষিত পুরাকীর্তির ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। Antiquities Act, 1968-এর কাঠামো এ দায়িত্বের একটি সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি প্রদান করে।

তবে একই সাথে এটিও সত্য যে, দেশের বৃহত্তর ঐতিহ্যভাণ্ডার শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহাসিক স্থান, নগর কাঠামো, ভূমি, পরিবেশ, পর্যটন এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিসরের সাথে ঐতিহ্য সংরক্ষণ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। স্থানীয় সরকার ও  স্থানীয় নগর আইনেও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থান সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে; নগর পরিকল্পনা কাঠামোতেও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

সুতরাং, প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় — “পুরাকীর্তি রক্ষার দায় কি শুধু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের?”

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত — “প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশেষায়িত দায়িত্বের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের দায়িত্ব কীভাবে সমন্বিত করা যায়?”

কারণ পুরাকীর্তি কোনো একক দপ্তরের সম্পত্তি নয়। এগুলো রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সম্পদ, জাতির স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের অর্পিত আমানত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষণের নেতৃত্ব দিতে পারে; তবে ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে অংশীদার হতে হবে।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL