সিলেট সদরের ইতিহাস ও স্থাপত্য: সুলতানী, মুঘল ও ব্রিটিশ আমল

Nawabia Central Jame Mosque, Sylhet, সিলেটের নবাবিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম জেলা সিলেট। সিলেট জেলাধীন সিলেট সদর উপজেলা বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকা, যেখানে বিভিন্ন যুগের বহু পুরাকীর্তি আজও বিদ্যমান। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান  অনুযায়ী এখানে বেশ কিছু সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল চিহ্নিত হয়েছে, যা ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। এসব স্থাপনার মধ্যে মসজিদ, মন্দির, মাজার, জমিদার বাড়ি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা উল্লেখযোগ্য। প্রাক-মুসলিম যুগে (১২শ শতাব্দীর পূর্বে) এ অঞ্চলে হিন্দু শাসকদের অধীনে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মীয় স্থাপত্যিক কাঠামোর বিকাশ ঘটে। এসব কাঠামোতে চারচালা ছাদ এবং আঞ্চলিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব লক্ষ করা যায়।

১৪শ শতাব্দীতে সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের (শাসনকাল আনুমানিক ১৩০১–১৩২২ অব্দ) সময় হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেটে আগমন করার মধ্য দিয়ে গৌড় গোবিন্দের শাসনের অবসান ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটে মুসলিম শাসনের সূচনা হয় এবং ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করে। শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর অনুসারী আউলিয়াদের মাধ্যমে অসংখ্য মসজিদ ও মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও এ অঞ্চলের ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুলতানী আমলের (১৩০০–১৫৭৬ অব্দ) স্থাপত্যে ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহার এবং কার্যকারিতা প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়।

পরবর্তীতে মুঘল আমলে (১৬শ –১৮শ শতাব্দী), বিশেষ করে সম্রাট আকবর (১৫৫৬–১৬০৫ অব্দ) ও তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনামলে সিলেটে প্রশাসনিক ও স্থাপত্যিক উন্নয়ন ঘটে। এ সময় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং অলংকৃত মিহরাব নির্মাণে মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট হয়। সিলেটের নবাবিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় এ ধারা লক্ষ্য করা যায়।

ব্রিটিশ শাসনামলে (১৮শ –২০শ শতাব্দী) সিলেট সদরে জমিদার বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক নগর অবকাঠামোর বিকাশ ঘটে। এ সময় ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব দেখা যায়। আধুনিক যুগে (১৯৪৭-এর পর) অনেক স্থাপনা সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে, তবে এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নগরায়ণ, অবহেলা ও অনিয়ন্ত্রিত মেরামত/সংস্কার পুরাকীর্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব আইন অনুযায়ী সিলেট সদর উপজেলা টিকে থাকা কতিপয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণযোগ্য এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষায় এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। শিব বাড়ী তিন মন্দিরসহ কিছু স্থাপনা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সরকারের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এ উপজেলার এ বহুমাত্রিক ঐতিহ্যসমূহ এ অঞ্চলের ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব।


ছবি: নবাবিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *