কাঠ কীভাবে পাথরে পরিণত হয়? কাঠের জীবাশ্মের রহস্য
একটি গাছের কাঠ লক্ষ লক্ষ বছর পরেও কি কাঠের মতো দেখতে থাকতে পারে — অথচ সেটি আসলে পাথর?
প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় এমনটাই সম্ভব। এ প্রাকৃতিক নিদর্শনকে বলা হয় কাঠের জীবাশ্ম (petrified wood বা fossilized wood)।

দেখতে অনেক সময় একেবারে সাধারণ কাঠের মতো হলেও হাতে নিলে বোঝা যায় — এটি কাঠ নয়, বরং পাথরের মতো শক্ত একটি বস্তু। এর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাঠের গায়ের প্রাকৃতিক নকশা, বৃদ্ধির বলয় এমনকি কোষের সূক্ষ্ম কাঠামোর অনেকটাই সংরক্ষিত থাকতে পারে।
কাঠ কীভাবে পাথরে পরিণত হয়?
কাঠের জীবাশ্ম তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর এবং দীর্ঘমেয়াদি। সাধারণত কোনো গাছ বা কাঠের অংশ নদী, হ্রদ ও বন্যার পলি ও কাদা মাটির কিংবা আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে দ্রুত চাপা পড়লে এ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে —
১. মাটির নিচে চাপা পড়া
কাঠটি দ্রুত পলল, কাদা বা আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে। এতে বাতাস ও অক্সিজেনের সংস্পর্শ কমে যায়। ফলে কাঠ সহজে পচে যাওয়ার সুযোগ পায় না।
২. খনিজসমৃদ্ধ পানির প্রবেশ
সময়ের সাথে ভূগর্ভস্থ পানি কাঠের ভিতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র ও কোষের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে এবং প্রবাহিত হয়। এ পানিতে সিলিকা, ক্যালসাইট, লৌহজাত যৌগসহ বিভিন্ন খনিজ দ্রবীভূত থাকতে পারে।
৩. খনিজ দিয়ে কাঠের কোষ পূরণ
পানির সাথে আসা খনিজগুলো ধীরে ধীরে কাঠের কোষ ও ফাঁকা অংশে জমা হতে থাকে। একই সময়ে কাঠের জৈব উপাদান ক্ষয় হতে থাকে।
৪. অবশেষে তৈরি হয় ‘পাথুরে কাঠ’
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এ প্রক্রিয়া চলার পর কাঠের জৈব উপাদানের বড় অংশ খনিজ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ফলে ধীরে ধীরে কাঠটি শক্ত পাথুরে পদার্থে পরিণত হয়। তবে এর মূল কাঠামোর অনেক চিহ্ন রয়ে যেতে পারে।
এ কারণেই একটি কাঠের জীবাশ্ম দেখলে তার মধ্যে গাছের বৃদ্ধির বলয় বা কাঠের প্রাকৃতিক নকশা পর্যন্ত দেখা যায়।
এত রঙের হয় কেন?
কাঠের জীবাশ্মের সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ এর বৈচিত্র্যময় রং। কোন খনিজ কাঠের মধ্যে প্রবেশ করেছে, তার ওপর রং অনেকটাই নির্ভর করে।
সিলিকা/কোয়ার্টজ: সাদা বা ধূসর
লোহাজাত খনিজ: লাল, বাদামি, কমলা বা হলুদ
ম্যাঙ্গানিজ: গোলাপি বা বেগুনি
তামাজাত খনিজ: সবুজ বা নীলচে
কার্বন: কালো বা গাঢ় ধূসর
তাই একই অঞ্চলে পাওয়া দুটি কাঠের জীবাশ্মের রং ও নকশাও সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, বিজ্ঞানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ
কাঠের জীবাশ্ম শুধু সংগ্রহযোগ্য একটি আকর্ষণীয় বস্তু নয়। পৃথিবীর অতীত সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীদের কাছেও এর গুরুত্ব রয়েছে। প্রাচীন কাঠের গঠন ও বৃদ্ধির বলয় বিশ্লেষণ করে অতীতের পরিবেশ, উদ্ভিদজগত ও জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সাথে প্রাচীন বনভূমি এবং উদ্ভিদের বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। যে ভূতাত্ত্বিক স্তরে কোনো জীবাশ্ম কাঠ পাওয়া যায়, সেই স্তরের ইতিহাস ও বয়স সম্পর্কেও গবেষণায় এটি সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশেও কি কাঠের জীবাশ্ম পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক স্তরে কাঠজাতীয় জীবাশ্ম বা পেট্রিফাইড উড পাওয়ার তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লার ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়, সিলেট এবং গাজীপুরের ভাওয়াল গড় — এসব অঞ্চলের নাম বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক ও জীবাশ্মসংক্রান্ত আলোচনায় উঠে আসে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কাঠের জীবাশ্মের বয়স বা উৎপত্তি নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট নমুনা ও ভূতাত্ত্বিক স্তর বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
কাঠের জীবাশ্ম দিয়ে কী তৈরি হয়?
গবেষণা ও সংগ্রহের পাশাপাশি পালিশ করা কাঠের জীবাশ্ম শোপিস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক নকশা ও রঙের কারণে এটি দিয়ে ভাস্কর্য, অলংকার, টেবিলটপ এবং বিভিন্ন ধরনের গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করা হয়।
শেষ কথা
কাঠের জীবাশ্ম আসলে প্রকৃতির তৈরি এক ধরনের পাথরের স্মৃতিফলক। একসময় যে গাছটি জীবন্ত ছিল, সময়ের বিশাল স্রোত পেরিয়ে তার কাঠামো আজও পাথরের মধ্যে সংরক্ষিত থাকতে পারে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাটির নিচে চাপা পড়া একটি গাছ কীভাবে আজ আমাদের হাতে পাথর হয়ে ফিরে আসে — এ রহস্যই কাঠের জীবাশ্মকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ছবি: ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়ে প্রাপ্ত কাঠের জীবাশ্ম (গাছের জীবাশ্ম), ময়নামতি জাদুঘর, কুমিল্লা, বাংলাদেশ
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL