সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ : কক্সবাজারের প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপত্য

সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ, মসজিদ, কক্সবাজার,

কক্সবাজারের ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি ‘বিজিবি ক্যাম্প মসজিদ’ নামেও পরিচিত। এটি কক্সবাজার পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের চৌধুরী পাড়ায় অবস্থিত। মসজিদটির ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪৩১৯° উত্তর অক্ষাংশ ও ৯২.০০২৮১° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। মসজিদটির উত্তরে একটি বৃহৎ দিঘি, পূর্ব ও পশ্চিম পাশে কবরস্থান এবং দক্ষিণ দিকে চাষাবাদের জমি রয়েছে। এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

আয়তাকার ভূমিপরিকল্পনায় নির্মিত সাচী চৌধুরী জামে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৯ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ২৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। স্থাপনাটির স্থাপত্যে ঐতিহ্যবাহী মসজিদ নির্মাণশৈলীর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। মসজিদের মূল কাঠামোর উপর একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় গম্বুজ রয়েছে এবং এর দুই পাশে আরও দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজ স্থাপিত হয়েছে। তবে অভ্যন্তর থেকে ছোট গম্বুজ দুটি দৃশ্যমান নয়। গম্বুজগুলোর শীর্ষদেশে পদ্ম-কলস নকশা অলংকৃত, যা মসজিদের বহিরাঙ্গনে নান্দনিক বৈশিষ্ট্য সংযোজন করেছে।

মসজিদের চার কোণে একটি করে অষ্টভুজাকার স্তম্ভ রয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভের শীর্ষে পদ্ম-কলস অলংকরণযুক্ত ও ছোট অনুগম্বুজ বা টারেট রয়েছে। এসব কোণীয় অনুগম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এর উল্লম্ব বিন্যাসে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে। মসজিদের প্রধান প্রবেশপথটি পূর্ব দেয়ালের মধ্যভাগে অবস্থিত এবং এটি খিলানাকৃতির। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে জানালা রয়েছে। অভ্যন্তরের পশ্চিম দেয়ালের মধ্যভাগে একটি মিহরাব স্থাপিত রয়েছে, যা মসজিদের কিবলামুখী বিন্যাস নির্দেশ করে।

সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ, কক্সবাজার, কক্সবাজারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক মসজিদ, প্রাচীন মসজিদ, বাংলাদেশের মসজিদ, ইসলামিক স্থাপত্য, মুসলিম স্থাপত্য, প্রত্নতত্ত্ব, ঐতিহ্য, Heritage, Cox's Bazar, Mosque, Bangladesh Heritage
সাচী চৌধুরী জামে মসজিদের গ্রাউন্ডপ্লান।

মসজিদটির দেয়াল তুলনামূলকভাবে পুরু। পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৩ ফুট। দেয়ালের এ অধিক পুরুত্ব স্থাপনাটির প্রাচীন নির্মাণপ্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজের অভ্যন্তরভাগে লতাপাতা ও পুষ্পভিত্তিক অলংকরণ রয়েছে, যা এর স্থাপত্যে নান্দনিক ও শৈল্পিক মাত্রা যোগ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে মসজিদটির মূল স্থাপত্যে কিছু পরিবর্তন ও আধুনিক সংযোজন ঘটেছে। মসজিদটির পূর্ব ও উত্তর দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যার ফলে মূল স্থাপনার ঐ দুই পাশের কিছু অংশ বর্তমানে আংশিকভাবে আচ্ছাদিত। অভ্যন্তরীণ দেয়াল ও মেঝেতে আধুনিক টাইলস স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মেরামত কাজের অংশ হিসেবে মসজিদের বহির্ভাগ ও অভ্যন্তরে বিভিন্ন রঙের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এসব আধুনিক সংযোজনের ফলে মসজিদটির প্রাচীন নির্মাণশৈলীর কিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমানে আগের তুলনায় কম দৃশ্যমান হলেও মূল কাঠামোর বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সাচী চৌধুরী নামে স্থানীয় একজন জমিদার মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর চতুর্থ বংশধর কামরুল হুদা চৌধুরীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ৩৫০–৪০০ বছর আগে জমিদার সাচী চৌধুরী এ মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে মসজিদের দেয়াল বা স্থাপত্যের অন্য কোনো অংশে নির্মাণকাল, নির্মাতা কিংবা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস-সংক্রান্ত কোনো উৎকীর্ণ শিলালিপি পাওয়া যায়নি। ফলে মসজিদটির নির্মাণকাল নির্ধারণে বর্তমানে স্থানীয় মৌখিক ঐতিহ্য ও বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত তথ্যই প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য, পুরু দেয়াল, কেন্দ্রীয় বৃহৎ গম্বুজ, পার্শ্ববর্তী ছোট গম্বুজ, অষ্টভুজাকার কোণীয় স্তম্ভ, অনুগম্বুজ এবং পদ্ম-কলস অলংকরণ — সব মিলিয়ে সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ কক্সবাজার অঞ্চলের ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যদিও আধুনিক সম্প্রসারণ ও সংস্কারের ফলে এর মূল স্থাপত্যের কিছু অংশ পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও বিদ্যমান কাঠামোটি স্থানীয় স্থাপত্য-ঐতিহ্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং আঞ্চলিক জমিদারি সংস্কৃতির একটি মূল্যবান সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষ করে নির্মাণকাল-সংক্রান্ত স্থানীয় জনশ্রুতি যদি প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়, তাহলে মসজিদটির ইতিহাস ও কালনির্ণয় সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।


ছবি: সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ, কক্সবাজার


তথ্যসূত্র: কক্সবাজার জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদন ২০১৯–২০২১, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জুলাই ২০২২, ঢাকা, পৃ. ১৫–৩৩।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL