মায়া সভ্যতার অজানা বিজ্ঞানী: ১,২৫০ বছর পর মিলল সন্ধান!

Maya, Maya Civilization, Maya Civilization, Maya Archaeology, Sak Tahn Waax, Xultun, Guatemala Archaeology, Ancient Astronomy, Maya Calendar, Maya Glyphs, Ancient Science, Archaeological Discovery, Maya Mathematics, Mesoamerican Civilization, Ancient History, Historical Discovery, Antiquity Journal, Venus Cycle, Mars Cycle, Pre-Columbian Civilization, Ancient Scholars, Scientific History, মায়া সভ্যতা, মায়া জ্যোতির্বিজ্ঞান, মায়া গণিত, শাক তাহন ওআশ, Sak Tahn Waax, খুলতুন, Xultun, প্রত্নতত্ত্ব, প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, প্রাচীন সভ্যতা, মায়া ক্যালেন্ডার, প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান, গুয়াতেমালা, বিশ্ব ইতিহাস, প্রাচীন বিজ্ঞান, ঐতিহাসিক আবিষ্কার, Antiquity Journal, Maya Glyphs, Maya Astronomy, Ancient Mathematics

মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার প্রায়ই অতীতের অজানা অধ্যায় উন্মোচন করে। সম্প্রতি মায়া (maya) সভ্যতা নিয়ে এমনই এক যুগান্তকারী আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সাময়িকী Antiquity-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রাচীন মায়া সভ্যতার একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদের সম্ভাব্য পরিচয় সামনে এসেছে। এর ফলে প্রায় ১,২৫০ বছর ধরে ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক জ্ঞানীর নাম আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

​খুলতুনের দেয়ালে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানের পাঠশালা

​গুয়াতেমালার ঘন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত প্রাচীন মায়া নগরী খুলতুন (Xultun)-এ প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি ছোট কক্ষ আবিষ্কার করেন। প্রথম দেখায় এটি সাধারণ একটি ঘর মনে হলেও, এর দেয়ালজুড়ে আঁকা ছিল অসংখ্য সংখ্যা, ক্যালেন্ডার, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব এবং মায়া লিপি।

​গবেষকদের মতে, এটি ছিল মায়া পণ্ডিতদের একটি কর্মশালা বা শিক্ষাকক্ষ, যেখানে তাঁরা মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ, সময় গণনা এবং ক্যালেন্ডারের জটিল হিসাব দেয়ালে লিখে পরীক্ষা করতেন। আধুনিক যুগের গবেষণাগারের বোর্ড বা শ্রেণিকক্ষের হোয়াইটবোর্ডের মতোই এটি ছিল তাঁদের চিন্তা ও গবেষণার খসড়া তৈরির স্থান।

​জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতে বিস্ময়কর দক্ষতা

​আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি ও লিপি বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকেরা ক্ষয়প্রাপ্ত লেখাগুলোর পাঠোদ্ধার করেন। সেখানে শুক্র (venus) ও মঙ্গল (mars) গ্রহের আবর্তনকাল এবং মায়া ক্যালেন্ডারের সমন্বয় নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল গাণিতিক হিসাব পাওয়া যায়।

​এ তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, অষ্টম শতাব্দীর মায়া পণ্ডিতরা কেবল আকাশ পর্যবেক্ষণই করতেন না, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করার অসাধারণ দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন।

​রহস্যময় স্বাক্ষর—‘শাক তাহন ওআশ’

​সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ছিল একটি গাণিতিক সূত্রের শেষে লেখা একটি বাক্য—

​“che-he-na Sak Tahn Waax”

​গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর অর্থ প্রায় “এমনটাই বলেন শাক তাহন ওআশ”

​এই বাক্যটি গবেষকদের ধারণা দেয় যে, ‘শাক তাহন ওআশ (Sak Tahn Waax)’ সম্ভবত সেই গাণিতিক হিসাবের রচয়িতা, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতের নাম। মায়া ভাষায় তাঁর নামের অর্থ “সাদা বুকওয়ালা খেঁকশিয়াল” (White-chested Fox)

​গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, তিনি আনুমানিক ৭৮১ অব্দে জীবিত ছিলেন এবং রাজদরবারের সাথে যুক্ত একজন উচ্চশিক্ষিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী বা গণিতবিদ ছিলেন।

কেন এই আবিষ্কার ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ?

​এতদিন পর্যন্ত মায়া সভ্যতার শিলালিপিতে রাজা, রানি, সামরিক বিজয় কিংবা শিল্পীদের নাম পাওয়া গেলেও, তাঁদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেছনের ব্যক্তিদের পরিচয় প্রায় সম্পূর্ণ অজানা ছিল।

  • ব্যতিক্রমী আবিষ্কার: এ গবেষণা প্রথমবারের মতো এমন একজন ব্যক্তির সম্ভাব্য পরিচয় তুলে ধরেছে, যিনি মায়া সভ্যতার জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতচর্চার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
  • ভবিষ্যত সম্ভাবনা: তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি শক্তিশালী গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা হলেও ভবিষ্যতে নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

মানব সভ্যতার জন্য এর তাৎপর্য

​এ আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাস কেবল গ্রিস, ভারত বা চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকার প্রাচীন মায়া সভ্যতাও জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও ক্যালেন্ডার বিজ্ঞানে অসাধারণ অবদান রেখেছিল।

​যেমন- আমরা আর্যভট্ট, পিথাগোরাস কিংবা টলেমির নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, তেমনি ভবিষ্যতে ‘শাক তাহন ওআশ’ নামটিও মায়া সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও সুপরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

গুয়াতেমালার খুলতুন নগরীর একটি ছোট ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত কয়েকটি ক্ষয়প্রাপ্ত লিপি আজ মানব ইতিহাসে নতুন আলোর দিশা দেখিয়েছে। প্রায় ১,২৫০ বছর আগের এক অজানা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সম্ভাব্য পরিচয় সামনে এনে এ গবেষণা শুধু মায়া সভ্যতাকেই নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়নি, বরং প্রমাণ করেছে— জ্ঞান, বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বকে জানার মানুষের আগ্রহ সব যুগেই সমান গভীর ছিল। ইতিহাসের নীরব দেয়ালও কখনও কখনও এমন গল্প বলে, যা বদলে দেয় আমাদের অতীতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।


✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম


Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL


The Maya civilization