পাঙ্খা পুলার: ব্রিটিশ আমলের বিস্মৃত শ্রমজীবী

একসময় ঘরের পাখা চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হতো না, প্রয়োজন হতো একজন মানুষের শ্রম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একদল শ্রমিক ছিলেন, যাঁদের কাজ ছিল দড়ি টেনে বিশাল কাপড়ের পাখা দোলানো। তাঁরা পরিচিত ছিলেন পাঙ্খা পুলার (punkah puller) নামে। আজ সুইচ চাপলেই আমরা বাতাস পাই। অথচ একসময় সেই স্বস্তির জন্য একজন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দড়ি টানতে হতো। তাঁদের বিস্মৃত ইতিহাস ঔপনিবেশিক সমাজের শ্রমব্যবস্থা, শ্রেণিবৈষম্য এবং একজনের আরামের জন্য আরেকজনের পরিশ্রমের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
কারা ছিলেন পাঙ্খা পুলার
পাঙ্খা পুলার ছিলেন সেই শ্রমিক, যাঁরা হাতে চালিত বড় ঝোলানো পাখা পরিচালনা করতেন। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আসার আগে গরম থেকে স্বস্তি পেতে এ ধরনের পাখা ব্যবহার করা হতো। ব্রিটিশ কর্মকর্তা, ইউরোপীয় পরিবার, সরকারি দপ্তর ও বিত্তশালীদের বাড়িতে পাঙ্খার ব্যবহার বিশেষভাবে দেখা যেত। গরমের দিনে ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচলের জন্যই পাঙ্খা পুলারদের নিয়োগ করা হতো।
কীভাবে চলত এই পাখা
পাঙ্খা সাধারণত কাঠের ফ্রেমের ওপর কাপড় টানিয়ে তৈরি করা হতো। ছাদ থেকে ঝোলানো এ পাখার সাথে যুক্ত থাকত একটি দীর্ঘ দড়ি। দড়িটি দেয়ালের পাশ দিয়ে বা অন্য কোনো উপযুক্ত পথে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো, যেখান থেকে শ্রমিক সহজে টানতে পারেন। তিনি নিয়মিত দড়ি টানতেন ও ছেড়ে দিতেন, ফলে পাখাটি সামনে-পেছনে দুলে ঘরে বাতাস ছড়াত।
কল্পনা করা যাক, একটি বড় ঘরে কয়েকজন মানুষ বসে আছেন আর তাঁদের মাথার ওপর বিশাল পাখা দুলছে। সেই পাখার পেছনে কোনো বৈদ্যুতিক মোটর নেই। ঘরের বাইরে বা আড়ালে বসে একজন শ্রমিক নিরন্তর দড়ি টেনে চলেছেন।
দিনের কাজ, রাতের দায়িত্ব
এ দায়িত্ব শুধু দিনের বেলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কোনো কোনো বাড়িতে রাতেও কাজ করতে হতো। গৃহকর্তা বা অতিথিরা যখন বিশ্রাম নিতেন, তখনও পাখা চালু রাখতে শ্রমিককে দড়ি টেনে যেতে হতো। দীর্ঘ সময় একই কাজ করলে ক্লান্তি আসাই স্বাভাবিক, আর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে কাজটি আরও কঠিন হয়ে উঠত। বিভিন্ন ঔপনিবেশিক বিবরণে গৃহকর্মী ও অধস্তন শ্রমিকদের কঠোর কর্মপরিবেশের চিত্র পাওয়া যায়। তবে সব পাঙ্খা পুলারের কর্মঘণ্টা, মজুরি বা শাস্তির ধরন একই ছিল, এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
শ্রম ও বৈষম্যের দলিল
পাঙ্খা পুলারদের ইতিহাস কেবল একটি পুরোনো পাখা চালানোর পদ্ধতির ইতিহাস নয়। এটি ঔপনিবেশিক সমাজে শ্রমের বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্য বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। একজন যেখানে আরাম করে বসে থাকতেন, সেখানে আরেকজনকে সেই আরাম নিশ্চিত করতে গায়ে খেটে কাজ করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবস্থান ছিল গৃহকর্তার ব্যক্তিগত পরিসরের বাইরে। তাঁদের শ্রম প্রয়োজনীয় হলেও বিশ্রাম, মজুরি ও মর্যাদার প্রশ্নটি তেমন গুরুত্ব পেত না। অভিজাত জীবনযাত্রার পেছনে প্রায়ই এমন বহু শ্রমজীবী মানুষের অবদান ছিল, যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় খুব কমই জায়গা পেয়েছে।
কীভাবে হারিয়ে গেল এ পেশা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উপমহাদেশে বিদ্যুতের ব্যবহার ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। বৈদ্যুতিক পাখার প্রসারে হাতে চালিত পাঙ্খার প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসে। যে কাজে আগে একজন মানুষকে দীর্ঘ সময় দড়ি টানতে হতো, সেখানে একটি মোটরই যথেষ্ট হয়ে উঠল। এভাবে প্রযুক্তির পরিবর্তন পেশাটিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে। তবে বিদ্যুতের প্রাপ্যতা ও অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে সব অঞ্চলে পরিবর্তন একই সময়ে ঘটেনি।
শেষকথা
আজ আমরা পাখা চালাতে একটি সুইচ চাপি, অথচ একসময় সেই বাতাস তৈরি হতো মানুষের হাতের জোরে। এ পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির নয়, শ্রমের ধরন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রারও পরিবর্তনের ইতিহাস। পাঙ্খা পুলারদের কথা আমাদের শেখায়, ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু রাজা, শাসক, প্রাসাদ বা অভিজাতদের জীবন জানলেই চলে না। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাজ, অভিজ্ঞতা ও অবদানও সমান গুরুত্ব দিয়ে জানতে হয়। পাঙ্খা পুলার তাই কেবল একটি বিলুপ্ত পেশার নাম নয়, এটি ঔপনিবেশিক আমলের শ্রম, বৈষম্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক বিস্মৃত অধ্যায়।
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL