বাড়িউরা প্রাচীনপুল: জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেতনতার অপরিহার্যতা

বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ কিংবা শাসনব্যবস্থার ইতিহাস নয়; এটি একই সাথে সেতু, সড়ক, মসজিদ, মন্দির, বিহার, দুর্গ, দিঘি ও জনপদের ইতিহাস। এসব স্থাপত্য আমাদের অতীতের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের বাস্তব সাক্ষ্য বহন করে। তাই প্রতিটি সংরক্ষিত প্রত্নস্থাপনা জাতির অমূল্য সম্পদ। এগুলোর ক্ষতি মানে শুধু একটি স্থাপনার ক্ষয় নয়, বরং আমাদের ইতিহাসের একটি অধ্যায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
বাড়িউরা প্রাচীনপুল: স্থাপত্য ও ইতিহাস
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার বাড়িউরা প্রাচীনপুল এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন, যা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত জাতীয় পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগে (আনুমানিক ১৭ শতাব্দীতে) ইস্ট বেঙ্গল বা সংলগ্ন অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে এ ধরনের ইটনির্মিত সেতুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
নদী, খাল ও জলাভূমিবহুল বাংলায় স্থায়ী যোগাযোগ নিশ্চিত করতে যে প্রকৌশল দক্ষতা প্রয়োজন ছিল, বাড়িউরা প্রাচীনপুল তারই একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এর নির্মাণশৈলী, ইটের গাঁথুনি, খিলান এবং কৌশলগত অবস্থান মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্য ও প্রকৌশল জ্ঞানের স্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে।
অননুমোদিত ব্যবহার ও লোকবিশ্বাসের চাপ
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়— এ সংরক্ষিত প্রত্নস্থাপনাটির একটি অংশকে কিছু মানুষ ইবাদতখানা বা মান্নত করার স্থান হিসেবে ব্যবহার করছেন।
-
কেউ মনোবাসনা পূরণের আশায় খাবার বিতরণ করছেন,
-
কেউ আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন, এবং
-
আবার কোথাও কোথাও ছোট ছোট বেদি নির্মাণ করা হয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে এ ধরনের ব্যবহার স্থানীয়ভাবে একটি অলিখিত প্রথায় রূপ নিচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি— প্রত্নস্থাপনা কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, যদি না তার ঐতিহাসিক পরিচয় সেটিই হয়। একটি ঐতিহাসিক সেতুকে অলৌকিক শক্তির কেন্দ্র বা মান্নতের স্থানে পরিণত করা তার প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভুল ইতিহাস উপস্থাপন করে। ইতিহাসের পরিবর্তে লোকবিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলে গবেষণা, শিক্ষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ— সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শারীরিক ক্ষতি ও সংরক্ষণ বিজ্ঞানের ঝুঁকি
এসব কর্মকাণ্ড কেবল প্রত্নস্থাপনার ভাবমূর্তিই নষ্ট করে না; এর শারীরিক ও গাঠনিক ক্ষতিও ঘটায়:
১. ধোঁয়া ও তাপ: আগরবাতির ধোঁয়া ও মোমবাতির তাপ শতাব্দীর প্রাচীন ইট ও চুন-সুরকির গঠনকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২. আর্দ্রতা ও ক্ষয়: খাবারের অবশিষ্টাংশ থেকে পোকামাকড়, শ্যাওলা ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়, যা ক্ষয়প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
৩. কাঠামোগত হুমকি: অননুমোদিতভাবে বেদি নির্মাণ বা মাটি খনন প্রত্নস্তর ও মূল কাঠামোর স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে।
সংরক্ষণ বিজ্ঞানের (Conservation Science) দৃষ্টিতে এগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ রক্ষার জন্য ‘পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮’ (পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে সংশোধিত আইন ও ১৯৮৬ সালের বিধিমালাসহ) কার্যকর রয়েছে। এ আইনের উদ্দেশ্য হলো সংরক্ষিত পুরাকীর্তির মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং যেকোনো অননুমোদিত নির্মাণ, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন প্রতিরোধ করা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ছাড়া সংরক্ষিত স্থাপনায় কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী পরিবর্তন করা আইনসম্মত নয়। ফলে বেদি নির্মাণ, আগুন জ্বালানো বা স্থাপনাটিকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বিদ্যমান সংরক্ষণনীতির সরাসরি সাংঘর্ষিক।
উত্তরণের উপায় ও সমন্বিত সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা
এ সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ না জেনেই এসব কাজ করেন। তাই প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে বোঝাতে হবে— ঐতিহ্য সংরক্ষণ কোনো ধর্মের বিরোধিতা নয়; বরং এটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব।
বাড়িউরা প্রাচীনপুলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে:
-
তথ্যবোর্ড স্থাপন: প্রত্নস্থাপনার সামনে বিস্তারিত ইতিহাস সম্বলিত বাংলা ও ইংরেজি সাইনবোর্ড স্থাপন।
-
সীমানা নির্ধারণ: সংরক্ষিত এলাকার স্পষ্ট সীমানা নির্দিষ্ট করে দেয়া।
-
তদারকি: নিয়মিত তদারকি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিশ্চিত করা।
-
সচেতনতামূলক কর্মসূচি: স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজে ঐতিহ্যবিষয়ক সেশন আয়োজন।
-
ভলান্টিয়ার গ্রুপ: স্থানীয় তরুণদের নিয়ে Heritage Volunteer Group গঠন।
-
ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা: স্মার্টফোনে ইতিহাস জানার জন্য কিউআর (QR) কোডভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা চালু করা।
-
প্রচারণা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কন্টেন্ট নিয়মিত প্রকাশ করা।
শেষ কথা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করা হয়। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে একটি প্রত্নস্থাপনা তাদের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ, তখন তারাই সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় রক্ষকে পরিণত হয়।
বাড়িউরা প্রাচীনপুল কেবল একটি প্রাচীন সেতু নয়; এটি আমাদের অতীতের সাথে বর্তমানের সংযোগ। এ সংযোগ যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার বা অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি সম্মান বজায় রেখেই সংরক্ষিত প্রত্নস্থাপনাকে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক পরিচয়ে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কারণ ঐতিহ্য রক্ষা মানেই জাতির স্মৃতি রক্ষা; আর জাতির স্মৃতি রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
✍️ লেখক : মো. শাহীন আলম
Follow Us on Our YouTube channel : GEONATCUL